kalerkantho


যোগ দিয়েই মনোনয়ন মিলবে না আ. লীগে

আজ দলের বর্ধিত সভা, গুচ্ছ নির্দেশনা

পার্থ সারথি দাস   

২০ মে, ২০১৭ ০০:০০



যোগ দিয়েই মনোনয়ন মিলবে না আ. লীগে

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দল ‘পরগাছামুক্ত’ রাখার বিশেষ উদ্যোগ নিচ্ছে আওয়ামী লীগ। অন্যান্য দল থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে মনোনয়ন পাওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। গত বছরের অক্টোবরে দলের জাতীয় সম্মেলনের পর আজ শনিবার গণভবনে দলের যে প্রথম বর্ধিত সভা হতে যাচ্ছে সে সভা থেকেই সদস্যপদ নবায়ন ও সদস্য সংগ্রহ অভিযান উদ্বোধন করবেন দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সদস্যপদ নবায়ন ও সদস্য সংগ্রহের মাধ্যমে পাওয়া চাঁদার মাধ্যমে তহবিলও গঠন করা হবে। দলের নির্বাচনী প্রস্তুতির বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হবে সভায়। আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতা জানান, আগামী নির্বাচনে অন্যান্য দল থেকে হঠাৎ আওয়ামী লীগের সদস্য হয়ে মনোনয়ন নেওয়ার পথ বন্ধ হচ্ছে। নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পাওয়ার আশায় এ ধরনের ‘অনুপ্রবেশ’ বন্ধ করার বিষয়ে ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্রীয় কমিটি কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে গত মাসে। আজকের সভায় জেলা থেকে আসা নেতাদের কাউকে প্রাথমিক সদস্যপদ দেওয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কমিটির কঠোর তদারকির বিষয়টি জানানো হবে। এ জন্য কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিতে বলা হবে। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হতে পারে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের কয়েক দিন আগে এক সাক্ষাৎকারে কালের কণ্ঠকে বলেন, দলে আর ‘পরগাছা’ রাখা হবে না। দল ‘পরগাছামুক্ত’ করা হবে। তিনি মনে করেন, সমস্যা আড়াল করে দলকে সুসংহত, সুসংগঠিত করা সম্ভব নয়। দলের অভ্যন্তরে কলহ-কোন্দল মেটানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।   

দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে যুবলীগ আয়োজিত আলোচনাসভায় ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘এবার অনুপ্রবেশকারী ঠেকানোর পরিকল্পনা নিয়েছি আমরা। আর এটি হবে নির্বাচনের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি, যাতে করে আমাদের মধ্যে কোনো প্যারাসাইট ঢুকতে না পারে, সে চেষ্টা করছি। ’

আওয়ামী লীগের দেওয়া কর্মসূচি অনুসারে, প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হবে আজ সকাল সাড়ে ১০টায়। সভায় সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। সভায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ, উপদেষ্টা পরিষদ, জাতীয় পরিষদ সদস্য, দলীয় মন্ত্রী ও জাতীয় সংসদ সদস্য, সব জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, দপ্তর ও উপদপ্তর সম্পাদক, প্রচার ও প্রকাশনা, উপ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদকরা উপস্থিত থাকবেন।

দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহ্মুদ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে জানান, দলের জাতীয় সম্মেলনের পর নিয়ম অনুসারে বর্ধিত সভা করতে হয়। সদস্যপদ নবায়ন ও সদস্য সংগ্রহ করার কর্মসূচিও নেওয়া হয়। সর্বশেষ ২০১২ সালে উদ্যোগ নেওয়া হলেও কিছুদিন চলার পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিভিন্ন কারণে সদস্য সংগ্রহ অভিযান অব্যাহত রাখা যায়নি। এবার নতুন উদ্যমে সদস্য সংগ্রহ অভিযান শুরু হচ্ছে। জেলা নেতাদের নির্দেশনা হবে, যাতে কোনোভাবেই ‘পরগাছা’ ঢোকানো না হয়। ‘পরগাছার’ কারণে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়ে থাকে।

জানা গেছে, ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সদস্য সংগ্রহ অভিযান শুরু করেছিল। প্রায় এক বছর ৫৫টি জেলায় সদস্য সংগ্রহ করার পর ওই উদ্যোগ নেতিয়ে পড়ে।

আওয়ামী লীগের একাধিক নীতিনির্ধারকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলের কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমতি ছাড়া আওয়ামী লীগের কোনো শাখা বা জেলা ইউনিটে প্রাথমিক সদস্য না নেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। দীর্ঘদিন দল ক্ষমতায় থাকায় একপর্যায়ে অন্যান্য দল থেকে সুবিধাবাদীরা আওয়ামী লীগে ঢুকে পড়েছে বলে বিভিন্ন স্থানের দলীয় নেতাকর্মীরা অভিযোগ করে আসছিল। এ অবস্থায় দলে প্রাথমিক সদস্যপদ দেওয়ার ক্ষেত্রে এ কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে। সুযোগসন্ধানীদের দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ‘কাউয়া’, ‘হাইব্রিড’সহ বিভিন্ন বিশেষণে বিশেষিত করেছেন বিভিন্ন স্থানে দেওয়া বক্তৃতায়।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১২ এপ্রিল আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠক এবং এরপর অনুষ্ঠিত সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠকে দলে ‘সুবিধাবাদীদের অনুপ্রবেশ’ নিয়ে অভিযোগের সুরে কথা বলেন অনেক নেতা। দলের পুরনো নেতাদের মাধ্যমে বিভিন্ন জেলায় অনুপ্রবেশ ঘটেছে বলে অভিযোগ ওঠে। এর পরই প্রাথমিক সদস্যপদ দেওয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদনের বিষয়টি জুড়ে দেওয়া হয়। কেন্দ্রের অনুমোদন ছাড়া দলের কোনো পর্যায়ের নেতাকর্মীকে বহিষ্কার না করারও সিদ্ধান্ত হয়েছিল গত মার্চে।

আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বলেছেন, টানা প্রায় ৯ বছর ক্ষমতায় আছে দল। এ কারণে বিএনপি ও জামায়াত থেকে আওয়ামী লীগে যোগদানের অসংখ্য ঘটনায় দলের শীর্ষ নেতারা ক্ষুব্ধ। আওয়ামী লীগ সেজে জামায়াতের লোকজনও বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাস করছে, নিয়োগ বাণিজ্য করছে। এ ধরনের অভিযোগ নিয়মিতই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে আসছে। সুবিধাবাদীরা যাতে বড় এ দলটির ভাবমূর্তি নষ্ট করতে না পারে সে জন্য তৃণমূল পর্যায়ে এরই মধ্যে নির্দেশনাও পাঠানো হয়েছে। বিভিন্ন জেলায় আধিপত্য বিস্তারের জন্য দলের সংসদ সদস্য বা তাঁর প্রতিপক্ষ দল ভারী করতে অন্য দল থেকে অনুসারী টেনে আনছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

দলের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রাথমিক সদস্যপদ নেওয়ার ক্ষেত্রে সদস্যপ্রার্থীর উদ্দেশ্য কী, তা দেখা হবে। কোনো অনুপ্রবেশকারীকে আওয়ামী লীগার সাজতে দেওয়া হবে না। সদস্য সংগ্রহের পর কোনো সদস্যের বিষয়ে অভিযাগ উঠলে কেন্দ্রীয় কমিটি তদারক করবে। ’ তিনি জানান, দলের ৭৪টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে অধিকাংশ জেলা থেকেই বেশির ভাগ নেতা ঢাকায় গত রাতের মধ্যে পৌঁছেছেন। তাঁরা বর্ধিত সভায় অংশ নেবেন। তখন সদস্য সংগ্রহ ও লক্ষ্যমাত্রার বিষয়টি তাঁদের জানানো হবে।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এ কে এম এনামুল হক শামীম গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গণভবনে রাতে দলের সাধারণ সম্পাদককে নিয়ে আমরা সভার প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা পরিদর্শন করেছি। কাল (শনিবার) সকাল ৮টায় গণভবনে গেট খোলা হবে। ’ তিনি জানান, চট্টগ্রাম বিভাগের ১৬টি সাংগঠনিক কমিটির সব কটি থেকেই প্রতিনিধি অংশ নেবেন সভায়।

দেওয়া হবে নতুন ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্র : দলের সর্বশেষ জাতীয় সম্মেলনের প্রায় ছয় মাস পর আজকের বর্ধিত সভায় দলীয় নেতাদের হাতে নতুন ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্র তুলে দেওয়া হবে। নতুন ঘোষণাপত্র অনুসারে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার তৈরি হবে।

জানা গেছে, ২০০৯-২০১৪ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকাকালে জেলা কমিটির সব নেতা এবং উপজেলা কমিটির শীর্ষ নেতাদের নিয়ে আলাদা বৈঠক করেছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। এবার এ সভায় শুধু জেলার শীর্ষ নেতাদের ডাকা হয়েছে।

১০ জেলার অর্ধশতাধিক নেতা থাকছেন না : এদিকে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকায় আওয়ামী লীগের ১০টি সাংগঠনিক জেলার অর্ধশতাধিক নেতা সভায় উপস্থিত থাকতে পারবেন না। ওইসব জেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বর্ধিত সভায় আসার সুযোগ পেলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকায় ওই সব জেলা থেকে দপ্তর সম্পাদক, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, উপদপ্তর সম্পাদক, উপপ্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক পদের কেউ বর্ধিত সভায় থাকতে পারছেন না।

সাময়িক বহিষ্কারাদেশ থাকায় খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহেদুল ইসলাম এবং বান্দরবানের দলীয় সাধারণ সম্পাদক কাজী মুজিবুর রহমানকে সভায় আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকায় বর্ধিত সভায় আসতে পারবেন না চাঁদপুর জেলার দলীয় নেতারা। চাঁদপুর জেলা কমিটি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।


মন্তব্য