kalerkantho


সোনা ও হীরা চোরাচালান ঠেকাতে শুরু হবে অভিযান

ওমর ফারুক ও সরোয়ার আলম   

২০ মে, ২০১৭ ০০:০০



সোনা ও হীরা চোরাচালান ঠেকাতে শুরু হবে অভিযান

ফাইল ছবি

দেশে সোনা ও হীরা চোরাচালান দিন দিন বাড়তে থাকায় তা ঠেকাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান শুরু করবে। এ লক্ষ্যে এরই মধ্যে সোনা ও হীরা চোরাকারবারিদের তালিকাও তৈরি করেছে র‌্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশ। র‌্যাবের তালিকায় নাম আছে ১৫০ চোরাকারবারির। আর গোয়েন্দা পুলিশের তালিকায় শতাধিক চোরাকারবারির নাম আছে। সেই তালিকা ধরে শিগগিরই অভিযান শুরু হবে। র‌্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

র‌্যাব ও পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, রাজনীতিক থেকে শুরু করে সন্ত্রাসীরা এসব চোরাকারবারে নাম লেখাচ্ছে। ফলে অনেকটা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে তারা। এ অবস্থায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের আইনের আওতায় আনার জন্য অভিযানে নামছে।

র‌্যাব ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সোনা ও হীরা চোরাকারবারিদের মধ্যে ১৫০ জনের একটি তালিকা তৈরি করেছে র‌্যাব। তালিকায় অনেক রাজনীতিকেরও নাম আছে।

চোরাকারবার ঠেকাতে র‌্যাবের একাধিক টিম বিমানবন্দর এলাকায় নজরদারি করছে। এ ছাড়া গোয়েন্দা পুলিশও শতাধিক সোনা চোরাকারবারির তালিকা করেছে।

জানা গেছে, একসময় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে চোরাচালান হলেও এখন চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দর দিয়েও ব্যাপক হারে সোনা চোরাচালান হচ্ছে। ওই চোরাকারবারিদের সহযোগিতা করছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও কাস্টমসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা। সোনা চোরাকারবারের সঙ্গে যুক্ত থাকায় এরই মধ্যে এনএসআইএয়ের ফিল্ড অফিসার আবদুল আজিজকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। এ ছাড়া বিমানের লোডার, ট্রাফিক, কেবিন ক্রু, সিভিল এভিয়েশনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী, ট্রলিম্যান, ক্লিনার সোনাপাচারের সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে। তাদের তালিকা করে বিশেষ অভিযানে নামতে যাচ্ছে পুলিশ ও র‌্যাব।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, চোরাকারবারিরা যখনই শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়ছে তখনই তারা বেছে নিচ্ছে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে। এ ছাড়া কিছু চোরাকারবারি সৌদি আরবেও চলে যায়। সেখান থেকে তারা বাংলাদেশে আসা শ্রমিকদের প্রলুব্ধ করে তাদের দিয়ে কিছু কিছু করে সোনা বিমানবন্দরের বাইরে পাঠায়। সম্প্রতি বিষয়টি নজরে এসেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। এরই মধ্যে এ ধরনের বেশ কিছু সোনা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে জব্দ করেছে এপিবিএন।

বিমানবন্দর এপিবিএনের এসপি রাশেদুল ইসলাম খান এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন এক থেকে দেড় কেজি সোনা জব্দ করছি। ’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সোনার বিষয়টি দেখার দায়িত্ব কাস্টমসের। কেউ ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে সোনা নিয়ে চলে যেতে চাইলে তাকে আমরা ধরি। ’

আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চোরাকারবারি যে-ই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। এরই মধ্যে আমরা একাধিক সোনা চোরাকারবারিকে গ্রেপ্তার করেছি। সোনা চোরাকারবারে জিরো টলারেন্স দেখাচ্ছি। তদন্তে কোনো গাফিলতি হচ্ছে না। সঠিকভাবে চার্জশিট দেওয়া হচ্ছে। যেসব মামলা তদন্তাধীন, সেগুলোর দ্রুত চার্জশিট দেওয়া হবে। সীমান্ত ও এয়ারপোর্টে প্রচুর নজরদারি আছে। ’

জানা যায়, বৈধভাবে একজন বিমানযাত্রী বিদেশ থেকে ১০ ভরি সোনা নিয়ে আসতে পারেন। প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৭০০ যাত্রী সোনা নিয়ে আসেন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। এ হিসাবে প্রতিদিন অন্তত ৫০ কেজি সোনা ঢোকে শুধু ওই বিমানবন্দর দিয়েই। সরকারের এ নিয়মের সুযোগ নিচ্ছে কোনো কোনো চোরাকারবারি। তারা যেসব দেশ থেকে শ্রমিক দেশে ফেরে সেখানে গিয়ে ১০ ভরির জায়গায় ১৫-২০ ভরি সোনা পাঠায় সাধারণ লোকের মাধ্যমে। প্রথম দিকে সেটিকে ভুল বলে মনে করা হতো। কিন্তু পরে দেখা গেছে এগুলো চোরাকারবারিদের কৌশল। এখন ১০ ভরির বেশি কারো কাছে পেলেই তাকে আটক করা হয়।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সোনা চোরাচালানের সঙ্গে বিমান থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংস্থার লোকজন, এমনকি অনেক রাঘব বোয়ালও জড়িত। এরই মধ্যে অনেক রাঘব বোয়ালকে গ্রেপ্তার করেছি। এমনকি বিমান পর্যন্ত জব্দ করেছি। কোনো দোকানে যদি পাচার হওয়া সোনা থাকে, তাহলে আমরা চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেব। আমরা বাসাবাড়িতে অভিযান চালিয়েও বিপুল সোনা উদ্ধার করেছি। ’

জানা গেছে পার্শ্ববর্তী দেশের চোরাকারবারিদের সঙ্গে এ দেশের সোনা চোরাকারবারিদের যোগাযোগ রয়েছে। তারা বিমানযোগে বাংলাদেশে সোনা এনে স্থলপথে সেটি পাঠায় পার্শ্ববর্তী দেশে। এ ক্ষেত্রে মানুষ ও গরুর পেটে ঢুকিয়ে সোনা পাঠানোরও প্রমাণ পেয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

বিজিবির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সীমান্ত এলাকা দিয়ে সোনা চোরাচালান যেটুকু হয় তা ক্যারিয়াররা করে। বিমানেই এসব সোনা এসে থাকে। ভারতে পাচার করার সময় মাঝেমধ্যে সীমান্তে কিছু সোনা ধরা পড়ে। ’

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর গত তিন বছরে এক হাজার ৫৮ কেজি সোনা আটক করেছে। এসব সোনার দাম ৫০০ কোটি টাকার বেশি। এ সময়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৩১ জনকে। তাদের কাছ থেকে সোনাপাচারের সঙ্গে জড়িত থাকা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও সিভিল এভিয়েশনের অসাধু কমকর্তা-কর্মচারীদের নাম জানা যায়। এ ছাড়া বিমানবন্দরের পরিচালনা সংস্থা একে ট্রেডার্সের কতিপয় কর্মচারীও এর সঙ্গে জড়িত বলে তথ্য পাওয়া যায়। অভিযোগ আছে, বিমানবন্দরের মানি এক্সচেঞ্জের লোকজনও এতে জড়িত।     

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, চোরাচালানিদের কাছে সবচেয়ে দামি রুট হচ্ছে দুবাই, জেদ্দা, রিয়াদ, দাম্মাম ও কুয়েত। এসব রুটে বিমানের নিজস্ব উড়োজাহাজ যাতায়াত করে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে জাহাজে বা বিমানে সোনার বার ও অলংকার পাচার হয়ে আসছে। এসব দেশে বাংলাদেশের একটি চক্রের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে।


মন্তব্য