kalerkantho


ঢাউস কমিটি করেও ‘স্বেচ্ছাবন্দি’ ছাত্রদল

রফিকুল ইসলাম   

২০ মে, ২০১৭ ০০:০০



ঢাউস কমিটি করেও ‘স্বেচ্ছাবন্দি’ ছাত্রদল

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতায় থাকাকালীন ২০০২ সালে গঠিত হয়েছিল পঞ্চগড় জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটি। এর আট বছর পর ২০১০ সালে হয় পূর্ণাঙ্গ কমিটি। নিজেদের সাংগঠনিক কোন্দলে ছয় মাসের মাথায় ওই কমিটিও স্থগিত করে দেওয়া হয়। আজও সেটি স্থবির হয়ে আছে। ফলে সংশ্লিষ্ট জেলায় অস্তিত্ববিলীনের মুখে পড়েছে সংগঠনটি।

২০০৩ সালের ১২ জুলাই দ্বিবার্ষিক সম্মেলনের মাধ্যমে গাজীপুর জেলা ছাত্রদলের কমিটি গঠন করা হয়। বিস্ময়কর হলো, ১৪ বছর ধরে সেই কমিটিই কার্যকর রয়েছে। এর দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের বয়স এখন পঞ্চাশোর্ধ। তবুও নতুন জেলা কমিটি গঠনের কোনো উদ্যোগ নেই।

শুধু এ দুটি জেলা নয়, সারা দেশে ছাত্রদলের ১০৫ ইউনিটের একটি কমিটিও বৈধ নয়। নিয়ম অনুযায়ী এ কমিটিগুলোর মেয়াদ দুই বছর। অথচ কোনোটি পার করেছে ১০-১২ বছর, কোনো কোনোটি ছয় থেকে আট বছর। ছাত্রলীগের দাপটে আর হামলায় তটস্থ ছাত্রদল। দীর্ঘ সময় ধরে ‘স্বেচ্ছাবন্দি’ এ সংগঠনটির অস্তিত্বই এখন বিলোপের পথে। জেলা কমিটি তো দূরের ব্যাপার, চোখে পড়ার মতো কোনো কর্মকাণ্ড নেই কেন্দ্রেরও। একদিকে কর্মীদের কোনো বৈধ পরিচয় নেই, অন্যদিকে হামলা-মামলায় স্থবির তৃণমূলের রাজনীতি।

ছাত্রদল সূত্র জানায়, ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষের পর গত ১০ বছরে তিনটি কেন্দ্রীয় কমিটি মেয়াদ পার করেছে। ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু ও আমিরুল ইসলাম খান আলীম, ২০০৫-০৯ আজিজুল বারী হেলাল ও শফিউল বারী বাবু, ২০১২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত আব্দুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েল ও হাবিবুর রশিদ হাবিব কমিটির দায়িত্ব পালন করেছেন। আর ২০১৪ থেকে এখন পর্যন্ত রাজিব-আকরাম কমিটি দায়িত্বে রয়েছে। এ কমিটির মেয়াদ গত বছরের ১৫ অক্টোবর পার হয়ে গেছে। সূত্র জানায়, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, দ্বন্দ্ব ও হামলা-মামলায় বেহাল হয়ে গেছে ছাত্রদল। যদিও যেকোনো ছাত্র সংগঠনের ইতিহাসে সবচেয়ে ‘ঢাউস’ (৭৩৬ সদস্যের) কমিটি গঠন করা হয়েছে। সচরাচর সংগঠনটির কোনো কর্মসূচিই দেখা যায় না। আবার কালেভদ্রে কর্মসূচি ঘোষণা করা হলেও নেতাকর্মীরা মাঠে নামে না। সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ও বিবৃতিনির্ভর হয়ে পড়েছে দেশের অন্যতম এ ছাত্র সংগঠনটি।

২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর রাজিব-আকরাম কমিটি গঠিত হয়। প্রথম দফায় এতে ১৫৩ জনকে পদ দেওয়া হলেও ২০১৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে স্থান পান ৭৩৬ জন। সংগঠনে বিদ্রোহ সামাল দিতে এবং সবার মনরক্ষায় এত সংখ্যক পদ পূরণ করা হয়েছে বলে ছাত্রদল সূত্রে জানা গেছে। তবে বড় সংগঠন গড়া হলেও গতি আসার বদলে  উল্টো আরো স্থবিরতা ভর করছে সংগঠনটিতে। নিজ নেতাকর্মীদের বিক্ষোভে বেসামাল ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। আংশিক কমিটি গঠনের সময় বিবাহিত, অছাত্র ও ব্যবসায়ীদের পদ দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগে প্রথম দফায় বিক্ষোভের মুখে পড়েন কেন্দ্রীয় নেতারা। এ অবস্থায় বিএনপি নেতাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। দ্বিতীয় দফায় কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার সময় গত বছর আবারও বিদ্রোহের মুখে পড়ে এ কমিটি। বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা পল্টন কার্যালয়ে আগুন দেয়। সেই থেকে কেন্দ্রীয় নেতারা আর কার্যালয়ের পথ মাড়ান না। নিজ নিজ এলাকার কর্মীদের নিয়ে আড্ডা মেরে সময় পার করছেন তাঁরা।

ছাত্র রাজনীতির কেন্দ্রস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো অবস্থান নেই ছাত্রদলের। ২০০৯ সালে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই ক্যাম্পাস ছাড়া সংগঠনটি। মাঝেমধ্যে নামকাওয়াস্তে কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়, কিন্তু পদধারী নেতারা রাজপথে নামেন না। ঘরে বসেই চলছে ছাত্রদলের রাজনীতি। কেউ কেউ অবশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয়। বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় নতুন কমিটির প্রত্যাশায় একটি অংশ এখন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার  অফিস ও সিনিয়র নেতাদের বাসায় ধরনা দিতে শুরু করেছে।

ছাত্রদল ছাত্রসংগঠন হলেও বরাবরই ‘অছাত্ররাই’ এর নেতৃত্ব দিয়েছেন। বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির কেউই নিয়মিত ছাত্র নন। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্ধ্যাকালীন বা এমফিল কোর্সে ভর্তি হয়ে ছাত্রত্ব ধরে রেখেছেন তাঁরা। ছাত্রদল সভাপতি রাজিব আহসান এসএসসি পাস করেন ১৯৯৩ সালে আর সিনিয়র সহসভাপতি মামুনুর রশিদ মামুন ১৯৯৪ সালে। সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান ১৯৯৩ ও সাংগঠনিক সম্পাদক ইসাহাক সরকার এসএসসি পাস করেছেন ১৯৯৩ সালে। প্রায় সবাই চল্লিশোর্ধ্ব। কেউ কেউ বিবাহিত, সন্তানও আছে। ‘বুড়োদের’ দিয়ে কমিটি গঠনের রেওয়াজের কারণে সংগঠনে গতি আসছে না, উঠে আসছে না তরুণ নেতৃত্বও।

নেতাকর্মীদের দীর্ঘদিনের দাবি, ছাত্রদলের দায়িত্ব দেওয়া হোক তরুণদের। কিন্তু সে দাবি কখনো পূরণ হয়নি। কারণ সিনিয়রদের বাদ দিয়ে কমিটি গঠন করতে হলে, তাঁদের মূলদল অথবা সহযোগী অন্যান্য সংগঠনে পদ দিতে হবে। কিন্তু বিএনপি সে কারিশমা দেখাতে বার বার ব্যর্থ হয়েছে। এ কারণে ছাত্রলীগও বলার সুযোগ পেয়েছে, ‘ছাত্রদলে কোনো ছাত্র নেই, সবাই বাবা, অছাত্র। কোনোভাবেই তাদের ক্যাম্পাসে ঢুকতে দেওয়া হবে না। ’ 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটিতে তরুণ ও নিয়মিত ছাত্রদের স্থান দেওয়া হয়েছে। তাঁরা নিয়মিত ক্যাম্পাসে আসেন। তবে সাংগঠনিক কোনো কাজ করেন না। যখনই শোনা যায় ছাত্রদল সদলবলে ক্যাম্পাসে আসবে, তখনই প্রতিটি প্রবেশ পথে পাহারা বসায় ছাত্রলীগ। ফলে বিতারিত হওয়ার পর একবারও ক্যাম্পাসে ঢোকার চেষ্টা করেননি ছাত্রদলের ঢাউস কমিটির নেতারা।

ছাত্রদল নেতাদের অভিযোগ, ছাত্রলীগ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে। কোথাও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নেই। ক্যাম্পাসে পেলেই ছাত্রদল নেতাকর্মীদের মারধর করা হয়। কোনো দাবি নিয়ে মিটিং মিছিল কিংবা সভা ডাকলে পুলিশও বাধা দেয়। হয়রানি করতে অযথা মামলাও দেওয়া হচ্ছে। একদিকে ছাত্রলীগের হামলা ও অন্যদিকে মামলার ভয়ে কেউ রাজপথে নামতে পারছে না। ছাত্র রাজনীতি বিকাশের স্বার্থে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

ছাত্রদলের দপ্তর সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর সংগঠনটি কার্যত ছাত্রদের অধিকার নিয়ে কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারেনি। শুধু দলীয় কিছু কর্মসূচি পালন করেছে। নেতারা বলেন, ‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে ঘেঁষতে দেওয়া হয় না আমাদের। ফলে তাঁদের সমস্যার ধরনও চিহ্নিত করতে পারিনি। এ কারণে কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করা যায়নি। সম্প্রতি কর্মমুখী শিক্ষা নিয়ে মাঠে নেমেছে ছাত্রদল। এরই মধ্যে ঢাবি ক্যাম্পাসে প্রচারণা চালানো হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের কাছে যাবে ছাত্রদল। তবে এর জন্য প্রয়োজন গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও সহাবস্থান। ’

ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক আব্দুস সাত্তার পাটোয়ারী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ছাত্রদল বাধা-বিপত্তির মধ্যেও রাজপথে থেকেছে। বিনা কারণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মামলা দিচ্ছে। একদিকে ছাত্রলীগের হামলা,  অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মামলায় বের হওয়াই কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেতাকর্মীরা গুম হয়ে যাচ্ছে। গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকলে ছাত্রদল স্বাভাবিক কর্মসূচি পালন করতে পারত। ’

ছাত্র-অধিকার নিয়ে কাজ করার বিষয়ে ছাত্রদল সভাপতি রাজিব আহসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে হামলা-মামলার কারণে আমাদের সংগঠন প্রকাশ্যে কিছু করতে পারেনি এটা ঠিক। তবে আমরা সব সময় ছাত্রদের অধিকারের পক্ষেই থেকেছি। ছাত্রদল প্রকাশ্যে কোনো কর্মসূচি পালন করতে চাইলে অনুমতি তো দূরের কথা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উল্টো ঝামেলা করছে। কৌশল হিসেবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন, কুমিল্লায় তনু হত্যার প্রতিবাদ এবং ছাত্রসংসদ নির্বাচন দাবিতে আমরা সবার সঙ্গে থেকে উৎসাহ দিয়েছি। ’

ছাত্রদল সভাপতি আরো বলেন, ‘রাজনৈতিক কারণে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের হত্যা ও গুম করা হচ্ছে। নিজ দলের একজনকর্মী হত্যা ও গুমের প্রতিবাদ করতে গেলেও মামলা ও হামলার শিকার হতে হচ্ছে। ন্যূনতম রাজনৈতিক অধিকার নেই আমাদের। এ জন্যই প্রকাশ্যে আশা সম্ভব হচ্ছে না। শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ২৫ দফা দাবিতে সোচ্চার ছাত্রদল। আমরা সারা দেশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে লিফলেট বিতরণ করেছি। ’

জেলা কমিটি গঠন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা কমিটিগুলো ধারাবাহিকভাবে গঠন করছি। দায়িত্ব নেওয়ার পর ৫০টির বেশি কমিটি করেছি। ক্রমান্বয়ে অন্যগুলোও হবে। ঢাকার অন্তর্গত সব কমিটি গঠন করা হয়েছে। আংশিক কমিটিগুলো পূর্ণাঙ্গ হয়েছে। আমাদের যত কর্মী আছে তাদের সবার পরিচয় নিশ্চিত করা হবে। কাউকে পরিচয়হীন রাখা হবে না। কারণ প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও আমাদের নেতাকর্মীরা আদর্শ ধারণ করে রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছে। ’

সংশোধনী : ‘গঠনতন্ত্র লঙ্ঘনই ছাত্রলীগে নিয়ম!’ শিরোনামে কালের কণ্ঠে প্রকাশিত ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সায়েম খানের বক্তব্যের একটি বাক্যে ভুল ছাপা হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, ‘বর্তমান ছাত্রলীগে গণতন্ত্রের চর্চা নেই। নির্বাহী সংসদের কোনো নেতার মতামত নেওয়া হয় না। ’ এই বক্তব্যে ভুলবশত ‘বর্তমান ছাত্রলীগের’ পরিবর্তে শুধু ‘ছাত্রলীগ; ছাপা হয়েছে। এ নিয়ে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতা ও সাবেক নেতাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে। এ অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির জন্য আমরা দুঃখিত।


মন্তব্য