kalerkantho

হেসে খেলে জয়

আয়ারল্যান্ড : ৪৬.৩ ওভারে ১৮১
বাংলাদেশ : ২৭.১ ওভারে ১৮২/২
ফল : বাংলাদেশ ৮ উইকেটে জয়ী
ম্যাচসেরা : মুস্তাফিজুর রহমান

ক্রীড়া প্রতিবেদক   

২০ মে, ২০১৭ ০০:০০



হেসে খেলে জয়

নিউজিল্যান্ডের পর আইরিশদের বিপক্ষেও বোলিংয়ে আগুন ঝরালেন মুস্তাফিজুর রহমান। তাঁর মারাত্মক বোলিংয়ে ১৮১ রানে গুটিয়ে যায় স্বাগতিকদের ইনিংস। শেষ পর্যন্ত আট উইকেটে জয় আসে বাংলাদেশের। ছবি : এএফপি

বাংলাদেশ ক্রিকেটের নতুন প্রজন্মের ‘পোস্টার বয়’ তাঁরা। একজন বোলিংয়ে, একজন ব্যাটিংয়ে। আন্তর্জাতিক ভুবনে দুজনেরই শুরুটা চোখ ধাঁধানো। মিলটা শেষ নয় এখানেই। পথ হারানো পথিক হিসেবেও তো মুস্তাফিজুর রহমান ও সৌম্য সরকারের ক্যারিয়ার এগিয়েছে সমানতালে।

নিজেদের ফিরে পাওয়ার কক্ষপথে থাকা এই দুজন কাল ঝলসে ওঠেন একসঙ্গে। তাতে ঝলসে যায় আয়ারল্যান্ডও। ওদের চেনা উইকেট, জানা কন্ডিশন নিয়ে কত চোরা আতঙ্কই না ছিল বাংলাদেশের! কিন্তু মুস্তাফিজ-সৌম্যরা এভাবে পারফরম্যান্সের দ্যুতি ছড়ালে তা হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে বাধ্য। যেমনটা গেল কাল। আয়ারল্যান্ডকে ৮ উইকেটে হারিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজে নিজেদের প্রথম জয়টি তুলে নিল মাশরাফি বিন মর্তুজার দল। এই জয়ে মুস্তাফিজের বোলিং আলো ছড়াচ্ছে যতটা, সৌম্যর ব্যাটিং এর চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। জয়ের ক্যানভাসে তুলির শেষ আঁচড় পরেরজনের বলে সেটি যেন জ্বলছে রাজটিকা হয়ে। সত্যি, কী রাজসিক ইনিংসই না খেললেন তিনি! ঠিক যেন ২০১৫ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে ওই ১১০ বলে অপরাজিত ১২৭ রানের মতো। কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৭৯ বলে অপরাজিত ৮৮। অথবা প্রোটিয়াদের বিপক্ষে পরের ম্যাচের ৭৫ বলে ৯০ রানে ইনিংস। রান তাড়া করতে নেমে প্রতিবারই সৌম্যর ব্যাটিংয়ে তা কত অনায়াস হয়ে যায় বাংলাদেশের জন্য! কালকের ৬৮ বলে অপরাজিত ৮৭ রানের ইনিংসেও যেন তার প্রতিচ্ছবি। ২৭.১ ওভারেই তাই জয় নিশ্চিত হয়ে যায় দলের।

আইরিশদের ১৮১ রানে গুটিয়ে দেওয়াতেই তৈরি ওই জয়ের ভিত্তি। এরপর তামিম ইকবাল-সৌম্যর ১৩.৫ ওভারে ৯৫ রানের উদ্বোধনী জুটিতেই ম্যাচ থেকে পুরোপুরি ছিটকে পড়ে আয়ারল্যান্ড। এই রানসেতুতে তামিমের রান বেশি, তবে আক্রমণের প্রবল ঝাঁজ সৌম্যর ব্যাটেই। রয়েসয়ে শুরুর পর মুখোমুখি ষষ্ঠ বলে তাঁর বাউন্ডারি। দশম বলে প্রথম ওভার বাউন্ডারি। মিড উইকেটর ওপর দিয়ে সীমানার ওপারে আছড়ে ফেলেন বলকে। সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন উপহার দেন তিনি ব্যারি ম্যাকার্থিকে। ইনিংসের নবম ওভারে বোলিংয়ে এলেন। প্রথম দুটি বল ওয়াইড। এরপর আইনসিদ্ধ প্রথম বলে সৌম্যর চার; পরের বলে ফ্লিক করে লং লেগের ওপর দিয়ে ছক্কা। এক বল বিরতি দিয়ে এক্সট্রা কাভার দিয়ে আরেক চার।

কৃতিত্ব দিতে হবে তামিমকেও। তা শুধু ৯৫ রানের ওপেনিং জুটির কারণে নয়, সতীর্থদের ওপর থেকে চাপ কমিয়ে দেওয়ার জন্যও। দুর্ভাগ্য তামিমের; হাফ সেঞ্চুরির ৩ রান দূরত্বে হয়ে যান কট বিহাইন্ড। পর্বতসম চাপ নিয়ে ক্রিজে যান এরপর সাব্বির রহমান। আয়ারল্যান্ড ‘এ’ দলের বিপক্ষে সর্বশেষ প্রস্তুতি ম্যাচেই সেঞ্চুরি তাঁর। অথচ তা যেন সবাই ভুলে গেছে বেমালুম। মনে আছে কেবল ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচে ০ ও ১ রান। কাল আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষেও রান করতে না পারলে যে সাব্বিরকে একাদশ থেকে বাদ দেওয়ার দাবিটা স্লোগানে রূপ নিত, তা কে না জানে!

অত চাপ নিয়ে নেমে সাব্বির খেলেন ৩৪ বলে ৩৫ রানের ছোট্ট ইনিংস। এর চেয়েও বড় ব্যাপার, সৌম্যর সঙ্গে ৭৬ রানের জুটি। অবিচ্ছিন্ন থেকেই জয়টা তুলতে পারতেন দুজন। সাব্বিরের অস্থিরতায় তা হয়নি। চার মারার পরের বলে উড়িয়ে মারতে গিয়ে ক্যাচ দেন বাউন্ডারিতে। ৪০ বলে ফিফটি পাওয়া সৌম্য শেষে অপরাজিত থাকেন ৬৮ বলে ৮৭ রান করে। ওয়ানডে ক্রিকেটে তাঁর সর্বোচ্চ চারটি ইনিংসই হয়ে থাকে প্রায় একই রকম। পাকিস্তানের বিপক্ষে সেঞ্চুরি, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দুটি আশির ঘরের ইনিংসের পর কালকেরটি—প্রতিবার রান তাড়া করতে নেমে খেলা। তিনবারই অপরাজিত; প্রোটিয়াদের বিপক্ষে আরেক ম্যাচেও তিনি আউট হওয়ার সময় দলের জয় নিয়ে সব অনিশ্চয়তা শেষ।

বাংলাদেশ কাল ম্যাচ জয়ের নিশ্চয়তা পেয়ে যায় অবশ্য প্রথম ইনিংসের বোলিং-ফিল্ডিংয়েই। আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে প্রথম ম্যাচ বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়ায় এবং পরের খেলায় নিউজিল্যান্ডের কাছে হারায় কাল চাপ ছিল বেশ। কিন্তু আইরিশদের ব্যাটিংয়ে পাঠিয়ে শুরুতেই উইকেট তুলে নেওয়ায় চাপ রূপান্তরিত স্বস্তিতে। সবচেয়ে বড় স্বস্তি অবশ্যই মুস্তাফিজের প্রত্যাবর্তনে। কাঁধের অস্ত্রোপচারের পর থেকে তাঁর কার্যকারিতার মরচে ধরছিল খানিকটা। কাল তিনি সব সংশয় উড়িয়ে দেন চার শিকারে। সৌম্যর ব্যাটিং-বীরত্বের পরও তাই ম্যাচসেরা মুস্তাফিজই। তাঁর সঙ্গে অভিষিক্ত সানজামুল ইসলাম এবং অধিনায়ক মাশরাফির দুটি করে উইকেটে দুই শও পেরোয়নি আয়ারল্যান্ডের স্কোর।

১৩৬ রানে ৭ উইকেট ফেলে দেওয়ার পর অবশ্য আরো অল্পতে আয়ারল্যান্ডকে গুটিয়ে দেওয়ার আশা ছিল বাংলাদেশের। ম্যাচ শেষে সে জায়গা নেয় আফসোস—কেন আরেকটু বেশি রান করল না ওরা! তাহলে যে সেঞ্চুরিটা করার সুযোগ পেতেন সৌম্য সরকার!


মন্তব্য