kalerkantho


বাণিজ্যমন্ত্রীর আশা : জিএসপি অব্যাহত রাখবে ইইউ

সব কারখানায় সিবিএ ট্রেড ইউনিয়ন থাকবে

আবুল কাশেম   

১৯ মে, ২০১৭ ০০:০০



সব কারখানায় সিবিএ ট্রেড ইউনিয়ন থাকবে

ছবি : কালের কণ্ঠ

ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) জিএসপি অব্যাহত রাখতে তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী তৈরি পোশাক খাতের সব কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন ও যৌথ দর-কষাকষি এজেন্ট বা সিবিএ চালু করতে যাচ্ছে সরকার। রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলোতে (ইপিজেড) থাকা কারখানা এবং সরকার যে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছে, সেখানে যেসব কারখানা গড়ে উঠবে, সেগুলোতেও ট্রেড ইউনিয়ন ও সিবিএ ব্যবস্থা থাকবে। এ জন্য ২০১৩ সালে সংশোধিত শ্রম আইন আবারও সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, ইপিজেড আইনও সংশোধন করা হবে। তবে ট্রেড ইউনিয়ন ও সিবিএর সঙ্গে সম্পৃক্ত শ্রমিক নেতাদের কিভাবে জবাবদিহির মধ্যে রাখা হবে, সেটি নিয়েই চিন্তিত সরকার। সম্প্রতি শ্রম মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক আন্ত মন্ত্রণালয় সভায় আইনগুলো সংশোধন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর র‌্যাডিসন হোটেলে সাসেটইনেবিলিটি কমপ্যাক্টের তৃতীয় সভা শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, ইউরোপের ২৮টি দেশের সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের অত্যন্ত সুসম্পর্ক রয়েছে। আশা করি, ইইউতে জিএসপি নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। বাংলাদেশে পোশাক খাতে ৪৫ লাখ শ্রমিক কাজ করে, যার ৮০ শতাংশই নারী। ইইউ জিএসপি নিয়ে কোনো সংকট দেখা দিলে এদের সমস্যা হবে। তাই ইইউ বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা অব্যাহত রাখবে বলে আমার আশা। ’

শ্রম ও ইপিজেড আইন সংশোধনের উদ্যোগ : আইএলওর উচ্চপর্যায়ের মিশন বাংলাদেশের জন্য একটি বিশেষ প্যারাগ্রাফ প্রণয়ন করেছে। সেখানে সি৮৭ (ফ্রিডম অব অ্যাসোসিয়েশন অ্যান্ড প্রটেকশন অব দ্য রাইট টু অর্গানাইজ কনভেনশন, ১৯৪৮) এবং সি৯৮ (রাইট টু অর্গানাইজ অ্যান্ড কালেক্টিভ বার্গেইনিং কনভেনশন, ১৯৪৯) অনুযায়ী বাংলাদেশের পোশাক কারখানায় শক্তিশালী ও স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। এসব ট্রেড ইউনিয়নে শ্রমিকদের সরাসরি ভোটে স্বাধীন ও শক্তিশালী সিবিএ গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া শ্রমিকদের ধর্মঘট ডাকার অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে আইএলওর এসব সুপারিশে। ‘আনফেয়ার লেবার প্র্যাকটিস’ বন্ধ করা এবং শ্রম আইন ও ইপিজেড আইন সংশোধনের জন্যও বাংলাদেশকে সুপারিশ করা করেছে। গত বছর জুনে আইএলও ওই সুপারিশ করার পর থেকেই ইইউ বলে আসছে, আইএলওর এ দুটি কনভেনশন বাংলাদেশ দ্রুত পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করলে জিএসপি স্থগিত করবে তারা। অস্ত্র বাদে সব পণ্যের (ইবিএ) আওতায় বাংলাদেশ ইইউতে অন্য সব পণ্যে জিএসপি বা শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা পেয়ে আসছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এ অবস্থায় করণীয় নির্ধারণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রপ্তানি-২) তপন কান্তি ঘোষের সভাপতিত্বে শ্রম মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক হয়েছে। সেখানে ইইউর জিএসপি অব্যাহত রাখতে শ্রম আইন, ইপিজেড আইন সংশোধন করে ইপিজেডের ভেতরে ও বাইরে সব কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন ও সিবিএ চালু করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। সরকার যে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করছে, সেগুলোও ইপিজেড আইনে পরিচালিত হবে। আইএলও এবং ইইউর পক্ষ থেকে এসব অঞ্চলে যেসব কারখানা গড়ে উঠবে, সেগুলোতেও ট্রেড ইউনিয়ন ও সিবিএ রাখার শর্ত দেওয়া হয়েছে। আইন সংশোধনকালে এটিও মাথায় রাখা হবে।

শ্রম মন্ত্রণালয়ের সচিব মিকাইল শিপার গতকাল বৃহস্পতিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, শ্রম আইন ও ইপিজেড আইন সংশোধন করে কারখানার শ্রমিকদের ফ্রিডম অব অ্যাসোসিয়েশন বা ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ দেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘তারা (ইইউ) জুন মাসের মধ্যে একটা রোডম্যাপ চেয়েছিল। আমরা বলেছি সময় লাগবে। আমরা ট্রেড ইউনিয়ন রেজিস্ট্রেশন দ্রুততার সঙ্গে দেব। তবে আইএলওর ফুল স্ট্যান্ডার্ড নিশ্চিত করতে সময় লাগবে। কারণ এতে ৪২ স্টেকহোল্ডার রয়েছে, যাদের সবার সঙ্গেই বসতে হবে। ’ 

শ্রম মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকের কার্যবিবরণীতে দেখা যায়, ওই বৈঠকে তপন কান্তি ঘোষ বলেন, ‘বাংলাদেশ বিষয়গুলো যথাযথভাবে সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমাধান করতে না পারলে ইইউ বাংলাদেশকে দেওয়া জিএসপি সুবিধা ইবিএ রিভিউ করবে বলে জানিয়েছে। অন্য দেশের ক্ষেত্রে ইইউর এভাবে জিএসপি সুবিধা রিভিউ করার নজির রয়েছে। ’

শ্রম মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব কালের কণ্ঠকে জানান, বাংলাদেশ আইএলওর সি৮৭ ও সি৯৮তে অনুস্বাক্ষর করেছে। ফলে এসব বিধিবিধান পালনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এত দিন বিষয়গুলো যথাযথভাবে দেখা হয়নি। তবে বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার এখনো সময় আছে। না হলে ইইউ বাংলাদেশকে দেওয়া জিএসপি প্রত্যাহার করতে পারে। তিনি বলেন, গত ডিসেম্বর মাসে আশুলিয়ায় সংঘটিত অসন্তোষের ঘটনা এ ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন নারী নেত্রী ও সংসদ সদস্য শিরীন আখতার। তিনি জানান, শ্রম আইন পরিবর্তন বা প্রস্তাবিত ইপিজেড শ্রম আইনে কী থাকবে, তা ত্রিপক্ষীয়ভাবে নির্ধারণ করা যেতে পারে। ট্রেড ইউনিয়ন রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে যে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ শ্রমিকের স্বাক্ষর নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা শিথিল করা সম্ভব কি না, পরীক্ষা করা যেতে পারে। স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ট্রেড ইউনিয়ন রেজিস্ট্রেশন ম্যাকানিজম চালু করা প্রয়োজন। নিয়মানুযায়ী আবেদন করলে কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

সাসেটইনেবিলিটি কম্প্যাক্টের বৈঠক শেষে যৌথ বিবৃতি : গতকাল ঢাকায় সাসেটইনেবিলিটি কম্প্যাক্টের তৃতীয় সভায় আগামী জুনে জেনেভায় অনুষ্ঠেয় বিশ্ব শ্রম সংস্থার (আইএলও) সম্মেলনের আগেই শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করতে বলা হয় বাংলাদেশকে। না হলে সম্মেলনে আরো চাপে পড়বে বাংলাদেশ।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, যে সিদ্ধান্ত আজ নেওয়া হয়েছে, তাতে আইএলওর খুশি হওয়ার কথা। তবে সংস্থাটি যেসব বিষয় চায়, সেগুলো নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের সময় লাগবে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্থগিত করা জিএসপি পুনর্বহাল নিয়ে হতাশার কথা জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যুক্তরাষ্ট্রের স্থগিত করা জিএসপি সুবিধা পুনর্বহালের জন্য আর কখনো কোনো কথা বলব না। বুধবার টিকফার মিটিংয়েও এ বিষয়ে একটি শব্দও আমরা উচ্চারণ করিনি। আমরা সম্মানের সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে যারা স্থগিত করেছে, তারা পুনর্বহাল করবে কি না, এটা তাদের ব্যাপার। কারণ, আমরা বুঝেছি যত কিছুই করি, তারা জিএসপি পুনর্বহাল করবে না। ’

রানা প্লাজা ধসের পর টেকসই বাণিজ্যের জন্য বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আইএলও মিলে সাসেটইনেবিলিটি কম্প্যাক্ট তৈরি করে, পরে কানাডাও এতে যোগ দেয়। গতকাল দিনভর বিভিন্ন সেশনে বাংলাদেশের শ্রম পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হলেও একমত হতে পারছিল না বিদেশি পক্ষগুলো। বৈঠক সূত্র জানায়, শেষ মুহূর্তে বাংলাদেশের শ্রম আইন সংশোধন ও ইপিজেড আইন সংশোধন করে বাংলাদেশ শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করা, সিবিএ করা ও স্বাধীনভাবে সংগঠন করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে রাজি হলে নমনীয় হন বিদেশি অংশীদাররা।

সাসেটইনেবিলিটি কম্প্যাক্টের বৈঠক শেষে যৌথ উপসংহারে বলা হয়েছে, কম্প্যাক্টের অংশীদাররা পোশাক খাতের শ্রমিক অধিকার, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীল বাণিজ্য সম্প্রসারণে কাজ করবে। ঢাকা বিভাগের ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন বৃদ্ধি, নিবন্ধনে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরস উন্নয়ন, কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর শক্তিশালী করা, কারখানার নিরাপত্তায় বিনিয়োগ বাড়ানোয় সন্তোষ প্রকাশ করেছে কম্প্যাক্ট। অংশীদাররা একমত হয়েছে যে স্বচ্ছতার সঙ্গে ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন দেওয়া হবে। সংগঠন করার স্বাধীনতা ও সিবিএবিরোধী যেসব বৈষম্য রয়েছে, সেগুলো দূর করা এবং দ্রুততার সঙ্গে ট্রেড ইউনিয়নকারীদের বিরুদ্ধে হয়রানি বন্ধ করা হবে।

গত ডিসেম্বরে আশুলিয়ায় সংঘটিত শ্রমিক ধর্মঘটের কথা উল্লেখ করে যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ২০১৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি মেনে চলবে বলে আশা করে অংশীদাররা। ওই ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়েছে, তা শিগগিরই আইনের আওতায় পর্যালোচনা করা হবে। আইএলওর সুপারভিশনে বাংলাদেশের শ্রম আইন সংশোধনে দ্রুত আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন বলে অংশীদাররা একমত হয়েছে। ইপিজেড আইনের খসড়া আরো পর্যালোচনার জন্য প্রত্যাহার করা হয়েছে। তারা ফের জোর দিয়ে বলেন, ইপিজেডগুলোতে শ্রমিকদের স্বাধীনভাবে সংগঠন করা ও সিবিএ প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করা জরুরি। আগামী বছরগুলোতে নিরাপদ গার্মেন্ট সেক্টর প্রতিষ্ঠায় সরকারের সঙ্গে বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয় করার ওপরও জোর দেয় অংশীদাররা। বাংলাদেশ সরকার পোশাক খাতের উন্নয়নে কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করবে আশা করে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আগামী বছরগুলোতেও এ খাতের কর্মপরিবেশের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে কম্প্যাক্ট।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের দাম বাড়ানোর বিষয়ে ঢাকায় নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়াদুন বলেন, এটি ব্রান্ডগুলোর দায়িত্ব। তারা ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে। আর রপ্তানিকারক হিসেবে বাংলাদেশের পোশাক মালিকরা এ ব্যাপারে ব্রান্ডগুলোর সঙ্গে দর-কষাকষি করতে পারে।

যৌথ বিবৃতির আগে সমাপনী সেশনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব শুভাশীষ বসু বলেন, ইইউ ইবিএ বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ। এটি ইউরোপের ক্রেতাদের জন্যও ভালো। জিএসপি সুবিধা বাংলাদেশ-ইইউ উভয়ের জন্যই লাভজনক।

পরে ইইউ জিএসপি ইউনিটের প্রধান মাদেলাইন টুমিঙ্গা বলেন, দায়িত্বশীল বাণিজ্যে জাতিসংঘের গাইডলাইন ও আইএলওর কনভেনশন মেনে চলতে হবে। ইইউ জিএসপি সুবিধা এসবের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তিনি শ্রমিকদের নিরাপত্তা, আইএলওর শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শ্রম আইন সংশোধন, ইপিজেডের শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন সুবিধা দেওয়া ও আনফেয়ার লেবার প্র্যাকটিস বন্ধের ওপর জোর দেন।

আইএলওর উপপরিচালক কারেন কার্টিস বলেন, শ্রমিক অধিকারের মূল কয়েকটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে উন্নতি করতে হবে। শ্রমিকদের স্বাধীনভাবে সংগঠন করার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। শ্রম আইন সংশোধন করতে হবে।


মন্তব্য