kalerkantho


রেইনট্রি হোটেলে আটকে ধর্ষণ

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে সাফাত ও সাদমান

রেজোয়ান বিশ্বাস   

১৯ মে, ২০১৭ ০০:০০



স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে সাফাত ও সাদমান

বনানীতে হোটেলে আটকে রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের ঘটনায় দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে সাফাত আহমেদ ও তার বন্ধু সাদমান সাকিফ। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তারা এ জবানবন্দি দেয়। ম্যাজিস্ট্রেট আহসান হাবীব সাফাতের ও ম্যাজিস্ট্রেট সাদবীর ইয়াসির আহসান চৌধুরী সাদমানের জবানবন্দি পৃথক খাস কামরায় লিপিবদ্ধ করেন।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, সাফাত ও সাদমান স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দেয়। জবানবন্দি দেওয়ার আগে তাদের চিন্তা-ভাবনা করার জন্য যথেষ্ট সময় দেওয়া হয়। দুজনই জবানবন্দি দেওয়ার সময় স্বাভাবিক ছিল। তাদের কোনো ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে কি না বা কোনো নির্যাতন করা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে দুজনই বলে, তারা স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দিচ্ছে। তারা অপরাধ করেছে।

বনানীর রেইনট্রি হোটেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের এই মামলার আরেক অন্যতম আসামি নাঈম আশরাফ ওরফে আব্দুল হালিমের বিরুদ্ধে সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল ঢাকা মহানগর হাকিম এস এম মাসুদ জামান এই রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে গত বুধবার রাত ৮টা ৪০ মিনিটে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং থেকে নাঈমকে গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ তার ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, দুজনই স্বীকারোক্তিতে বলেছে যে পূর্বপরিকল্পিতভাবে দুই শিক্ষার্থীকে ডেকে এনে তারা ওদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জবরদস্তি যৌন সংসর্গে লিপ্ত হয়। এ জন্য তাদের ভয় দেখানোর পাশাপাশি শারীরিকভাবে নির্যাতনও করা হয়। সাফাত স্বীকারোক্তিতে আদালতকে জানায়, সে এবং নাঈম আশরাফ দুই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করে। মামলার আসামি বাকি তিনজন এই ধর্ষণকাজে সহায়তা করে। ধর্ষণ দৃশ্য ভিডিও করা হয় এবং ঘটনা প্রকাশ না করার জন্য তাঁদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয়। আর পুরো ঘটনার সময় ওই দুই শিক্ষার্থীর দুই বন্ধুকে রেইনট্রি হোটেলের পৃথক কক্ষে আটকে রাখা হয়।

আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত ও তার বন্ধু সাদমানকে গতকাল সকাল ৯টার দিকে আদালতে নেওয়া হয়। এরপর বিচারকের খাস কামরায় তাদের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করা হয়। তারা দায় স্বীকার করে এই জবানবন্দি দেয় বলে আদালতে সাংবাদিকদের জানান জাতীয় মহিলা আইনজীবী পরিষদের আইনজীবী ফাহমিদা আক্তার রিংকি।   এর আগে সাফাত ও সাদমানকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর পুলিশের উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের (ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার) পরিদর্শক ইসমত আরা এমি এসংক্রান্ত অগ্রগতির বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেন। গতকাল বিকেলে তিনি আদালতে সাংবাদিকদের জানান, সাদমানের পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষ হয়েছে। আর সাফাতের ছয় দিনের রিমান্ড শেষ হচ্ছে আজ শুক্রবার। এর আগেই জবানবন্দি দিতে রাজি হওয়ায় সাদমানের সঙ্গে সাফাতকেও আদালতে পাঠানো হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, সাফাত ও সাদমান ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হওয়ায় তাদের আদালতে নেওয়া হয়।

সাফাত আহমেদ ও সাদমান সাকিফকে গত ১১  মে সিলেট  থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। সাদমান মামলার ৩ নম্বর আসামি। এরপর সাফাতকে ছয় দিনের ও সাদমানকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়। পুলিশের কাছেও তারা দুই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের দায় স্বীকার করে। এ ছাড়া গত সোমবার ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল ও দেহরক্ষী আবুল কালাম আজাদকে। বিল্লালকে চার দিনের এবং আজাদকে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

নাঈম রিমান্ডে : দুই শিক্ষার্থী ধর্ষণ মামলার এজাহারনামীয় আসামি নাঈম আশরাফকে গতকাল বিকেলে আদালতে হাজির করে ঘটনার রহস্য ও তথ্য উদ্ঘাটনের জন্য ১০ দিন পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের পরিদর্শক ইসমত আরা এমি। এই আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি মর্মে তদন্ত কর্মকর্তার করা আবেদনের ওপর আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ঢাকা মহানগর পিপি আবদুল্লাহ আবু। আসামির রিমান্ড নামঞ্জুর করে জামিন চান তার আইনজীবী এ বি এম খায়রুল ইসলাম। শুনানি শেষে আদালত নাঈমের সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এর আগে গত বুধবার রাতে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং থেকে গ্রেপ্তারের পর নাঈমকে গতকাল ভোরের দিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিন্টো রোডের গোয়েন্দা কার্যালয়ে আনা হয়। এরপর দুপুর ১২টার দিকে ডিএমপি গণমাধ্যম কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়। ব্রিফিংয়ে ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্র্যান্সন্যাশনাল ইউনিটের (সিটিটিসি) প্রধান মনিরুল ইসলাম জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দুই শিক্ষার্থী ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে নাঈম। তাকে আরো জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, নারী নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের যে সংজ্ঞা দেওয়া আছে সে অনুযায়ী অভিযোগের সমর্থনে প্রাথমিক কিছু তথ্য জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া গেছে। তবে চার আসামির রিমান্ড এখনো শেষ না হওয়ায় এবং পঞ্চম আসামি মাত্র ধরা পড়ায় ঘটনার খুঁটিনাটি নিয়ে এখনই সংবাদমাধ্যমের সামনে বিস্তারিত বলা সমীচীন হবে না। তিনি বলেন, ‘প্রধান অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। সেখানে যৌন সংসর্গের কথা আমরা জানতে পেরেছি। কী পরিস্থিতিতে কী হয়েছিল তা জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আমরা নিশ্চিত করতে পারব। ’

ধর্ষণের ঘটনা গত ২৮ মার্চ ঘটলেও প্রভাবশালী আসামিদের হুমকির কারণে মামলা করতে এক মাসের বেশি সময় দেরি করার কথা বাদী নিজেই এজাহারে বলেছেন। পুলিশ সেই মামলা নিতে গড়িমসি করেছিল বলে অভিযোগ ওঠায় পুলিশের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে একটি তদন্ত কমিটিও করা হয়েছে। সে প্রসঙ্গ টেনে মনিরুল ইসলাম বলেন, আইনের কাছে প্রভাবশালী বলে কিছু নেই। অপরাধী অপরাধীই। ওই ঘটনায় আরো কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নাঈমের বিরুদ্ধে প্রতারণার অনেক অভিযোগ : সিরাজগঞ্জের কাজীপুরের হালিম ঢাকায় নাঈম আশরাফ নামে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান খুলে ব্যবসা চালাচ্ছিল। নাঈমের এই পরিচিতি প্রকাশ পায় রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার ২ নম্বর আসামি হিসেবে তার নাম উঠে আসার পর। গত ৬ মে মামলা দায়েরের পর গণমাধ্যমে প্রকাশিত নাঈমের ছবি দেখে তাকে হালিম বলে শনাক্ত করে সিরাজগঞ্জের কাজীপুরের গাইন্দাইল গ্রামের বাসিন্দারা। হালিম ওই গ্রামের ফেরিওয়ালা আমজাদ হোসেনের ছেলে। এলাকায় প্রতারক হিসেবে তার পরিচিতি ছিল। গ্রামবাসী জানায়, হালিম প্রভাবশালী বিভিন্ন ব্যক্তিকে তার বাবা পরিচয় দিয়ে নানা সুবিধা আদায় এমনকি বিয়েও করেছে দুবার।

ঢাকায় এসে নাঈম আশরাফ নাম নিয়ে ‘ই-মেকার্স’ নামে একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান খুলে ২০১৪ সালে ভারতের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী অরিজিৎ সিংয়ের কনসার্টের আয়োজন করে সে। এরপর ২০১৬ সালে ঢাকায় ভারতের আরেক শিল্পী নেহা কাক্কারকে নিয়ে ‘নেহা কাক্কার লাইভ ইন কনসার্ট’ অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করে নাঈম।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নাঈম বিভিন্নজনের সঙ্গে নিজের সেলফি দিত, যা নানামুখী অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হতো। আর এমনটা মনে করছেন ওই ছবিতে থাকা ব্যক্তিরা।

নিজেকে স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা পরিচয় দিয়ে হালিম এলাকায় ব্যানার-পোস্টারও লাগাত; যদিও সংগঠনে তার কোনো পদ ছিল না বলে জানান স্বেচ্ছাসেবক লীগের কাজীপুরের নেতারা।

আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাতের সঙ্গে নাঈমের নিবিড় ঘনিষ্ঠতার কথা সাফাতের সাবেক স্ত্রী ফারাহ মাহবুব পিয়াসাও জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, সাফাত সব সময় নাঈমের কথায় চলত।

অভিযোগকারী তরুণীদের দাবি, ওই রাতে রেইনট্রি হোটেলে নাঈম ও সাফাত ধর্ষণের পাশাপাশি তাঁদের শারীরিকভাবে নির্যাতনও করে। পা ধরে নিস্তার চাইলেও মেলেনি।

ধর্ষকরা যত ক্ষমতাধরই হোক ব্যবস্থা নেওয়া হবে—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : বনানীর হোটেলে দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় জড়িতরা যত ক্ষমতাধরই হোক না কেন তাদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন। গতকাল মহাখালীতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে নারীদের হলিডে মার্কেটের উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ঘটনার তদন্ত চলছে। তদন্তে যার নাম আসবে, যার গাফিলতি পাওয়া যাবে, যার অবস্থান এখানে ভিন্নতর থাকবে, যারা সহযোগিতা করেছে বলে প্রমাণিত হবে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সে যেই হোক, যত ক্ষমতাধর ব্যক্তিই হোক।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, অপরাধের ঘটনাস্থল বনানীর রেইনট্রি হোটেল কর্তৃপক্ষের যদি কোনো গাফিলতি থাকে, যদি সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রসঙ্গত, গত ২৮ মার্চ বন্ধুর সঙ্গে আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়ে বনানীর ‘দ্য রেইনট্রি’ হোটেলে ধর্ষণের শিকার হন দুই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। ওই ঘটনার প্রায় ৪০ দিন পর গত ৬ মে বনানী থানায় অভিযুক্ত সাফাত আহমেদ, নাঈম আশরাফ ও সাদমান সাকিফসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন তাঁরা।


মন্তব্য