kalerkantho


নেত্রকোনায় প্রধানমন্ত্রী

হাওরের একটি মানুষও না খেয়ে থাকবে না

মিজানুর রহমান নান্নু ও হাফিজুর রহমান চয়ন, নেত্রকোনা   

১৯ মে, ২০১৭ ০০:০০



হাওরের একটি মানুষও না খেয়ে থাকবে না

শত ব্যস্ততার মাঝে এমন সুযোগ মেলে না। গতকাল নেত্রকোনার খালিয়াজুরীতে হাওর অঞ্চল পরিদর্শনে এসে সেই সুযোগ মিলল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রিকশায় চড়ে গেলেন খানিকটা পথ। কথা বললেন, শুনলেন মানুষের কথা। ছবি : বাসস

বন্যায় ফসলহারা নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বললেন, ‘হাওরাঞ্চলের একজন মানুষও না খেয়ে থাকবে না। আমাদের খাদ্যের কোনো অভাব নেই।

দেশে পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ আছে। এর পরও যদি দরকার পড়ে—প্রয়োজনে বিদেশ থেকে আমদানি করব। ’

নেত্রকোনার হাওর উপজেলা খালিয়াজুরীতে গতকাল বৃহস্পতিবার ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণের আগে খালিয়াজুরী ডিগ্রি কলেজ মাঠে এক জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আপনারা হাওরের মানুষ, আমি বাঁওড়ের মানুষ। টুঙ্গিপাড়া এলাকায় হাওরের মতো ছোট ছোট বাঁওড় আছে। আপনাদের কষ্ট আমি বুঝি। ’ হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য নানা পদক্ষেপ নেওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘স্থানীয় ডিসিকে (জেলা প্রশাসক) তালিকা প্রস্তুত করার নির্দেশ দিয়ে দিয়েছি, হাওরাঞ্চলে একটি মানুষও গৃহহারা থাকবে না। যারা গৃহহীন, ভূমিহীন তাদের জন্য আমরা আদর্শ গ্রাম, গুচ্ছগ্রাম বা অন্যান্য প্রকল্পের মাধ্যমে ঘর তৈরি করে দেব। হাওরের মত্স্যজীবীদেরও আর্থিক সাহায্য দেব।

মত্স্যসম্পদ প্রক্রিয়াকরণ এবং বাজারজাতকরণের জন্যও সুব্যবস্থা করে দেব। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির পদক্ষেপ নেব। ’ তিনি আরো বলেন, ‘হাওরাঞ্চলের ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার জন্য আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলব, যাতে তারা সেখানে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে। হাওর উন্নয়নের জন্য বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে দেব। পানি ধারণ করার ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নদী ও খাল খনন করব। ’

হাওর এলাকার লোকজনের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যখনই দুর্যোগ আসে তখনই আমরা আপনাদের দেখতে আসি। আমি আপনাদের অবস্থা দেখতে এসেছি। আপনাদের ত্রাণের ব্যবস্থা করেছি। আপনাদের জন্য যা যা করণীয় তা-ই আমরা করব। ’ তিনি বলেন, ‘প্রত্যেকটা লোক একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে উন্নত জীবন যাপন করতে পারে, শান্তিতে বসবাস করতে পারে, দুবেলা ভাত খেতে পারে, রোগের চিকিৎসা পায়, যারা গৃহহারা মানুষ তারা গৃহ পাবে, উন্নত জীবন পাবে, রোগে চিকিৎসা পাবে—এটাই আমাদের লক্ষ্য। ’

হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য এরই মধ্যে নেওয়া পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘হাওরাঞ্চলে দুর্যোগ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিয়েছি। আগামী ফসল না ওঠা পর্যন্ত সুদ মওকুফসহ কৃষিঋণ স্থগিত করেছি। ভিজিএফ সহায়তা চালু করেছি। খোলাবাজারে ১০ টাকা করে ওএমএসের চাল বিক্রির ব্যবস্থা করেছি। ’ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আবার অর্ধেক সুদে নতুন কৃষিঋণ দেওয়ার কথাও জানান তিনি।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসে নেত্রকোনা জেলা যুবলীগের সভাপতি স্বপন জোয়ারদারসহ অনেক নেতাকর্মীকে হত্যা করে। অসংখ্য নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেয়। তিনি বলেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় আসে লুটপাটের জন্যে। এরা ক্ষমতায় থাকলে লুটপাট করে, আর বিরোধী দলে গেলে মানুষ পুড়িয়ে মারে। এটা কোন ধরনের রাজনীতি?’

বিপরীতে আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন পদক্ষেপের বর্ণনা করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এ দেশের গরিব-দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো আর তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন করা ছাড়া আমার আর চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। ’ তিনি বলেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একমাত্র স্বপ্ন ছিল সোনার বাংলা গড়ে তোলার। আমি যেন সেই স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে পারি সে জন্য আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন। আমি যেন আপনাদের সেবা করে যেতে পারি, মানুষের জন্য কাজ করে যেতে পারি। মনে রাখবেন, আওয়ামী লীগ আপনাদের কাছে আসবে। আপনারা নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছেন। আমি আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। ’

জনসভায় কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী হাওরাঞ্চলে কৃষকদের বি-২৮ ও বি-২৯ জাতের ধান না লাগানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘স্বল্পমেয়াদি ৩২ জাতের ধান আপনারা আবাদ করবেন। আমরা বিনা মূল্যে আপনাদের মাঝে সার, কৃষি উপকরণ বিতরণ করব। ’

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা আপনাদের ভালোবাসেন, আপনারাও শেখ হাসিনাকে ভালোবাসেন। এখানে দুর্যোগ বড় না, মনের টান বড়। আপনাদের বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা কে দিয়েছেন—শেখ হাসিনা দিয়েছেন। বছরের প্রথম দিন বিনা মূল্যে বই কে দিয়েছেন—শেখ হাসিনা। ’

জনসভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, নেত্রকোনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য রেবেকা মমিন, খালিয়াজুরী উপজেলার চেয়ারম্যান সামছুজ্জামান সোয়েব সিদ্দিকী। এ ছাড়া যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়, সংসদ সদস্য ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল, ছবি বিশ্বাস, ইফতিকার উদ্দিন তালুকদার পিন্টু, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মেজবাহ উদ্দিন সিরাজ, সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদিকা অধ্যাপিকা অপু উকিল, জেলা প্রশাসক ড. মো. মুশফিকুর রহমান, পুলিশ সুপার জয়দেব চৌধুরী, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান প্রশান্ত কুমার রায় প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী সকাল ৯টা ৪৭ মিনিটে হেলিকপ্টারে এসে খালিয়াজুরী হেলিপ্যাডে নামেন। সকাল ১১টা ৩ মিনিট থেকে ১১টা ৪৮ মিনিট পর্যন্ত তিনি জনসভায় বক্তব্য দেন। পরে তিনি বল্লবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেন। এরপর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শন শেষে দুপুর ২টা ৩২ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশে খালিয়াজুরী ত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী।

সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া এই বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। এর আগে গত ৩০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি পরিদর্শনে যান এবং ত্রাণ বিতরণ করেন।


মন্তব্য