kalerkantho


ঢাকার ডিসি ও রাজউক চেয়ারম্যানের একগুঁয়েমি

১৫ লাখ মানুষ জিম্মিদশায়

আপেল মাহমুদ   

১৯ মে, ২০১৭ ০০:০০



১৫ লাখ মানুষ জিম্মিদশায়

শেষ হয়েও যেন শেষ হচ্ছে না ঢাকা মহানগরীর ১৫ লাখ মানুষের ভোগান্তি। সব কিছু ঠিক থাকলেও শুধু ঢাকার ডিসি এবং রাজউক চেয়ারম্যানের একগুঁয়েমি আচরণের কারণে তারা নিজের বাড়িতে পরদেশী হয়ে আছে।

একাধিকবার অবমুক্ত হওয়া সত্ত্বেও তাদের নিজস্ব সম্পত্তির নামজারি ও খাজনা বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে রামপুরা ব্রিজ থেকে খিলক্ষেত নিকুঞ্জ পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশের বিস্তীর্ণ এলাকার অসংখ্য পরিবার চরম বেকায়দায় পড়ে গেছে। জমিজমা, সম্পত্তি বেচাকেনা করতে পারছে না কেউ। এ হয়রানির অবসান হবে কবে, তাও জানে না কেউ।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের সূত্র মতে, ঢাকার ডিসি ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান আন্তরিক হলে সমস্যাটি এত দিন ধরে জিইয়ে থাকত না। জমি অধিগ্রহণপ্রত্যাশী ও অধিগ্রহণ বাস্তবায়নকারী সংস্থাকেই প্রমাণ করতে হবে উল্লিখিত জমির প্রকৃত মালিক কে। তাদের কাছে এসংক্রান্ত সব নথিপত্র গচ্ছিত থাকার কথা। অথচ তারা বিষয়টি নিয়ে কালক্ষেপণ করছে। নানাভাবে ঘটনাটি জটিল করে তুলছে।

গত ৩ এপ্রিল আন্ত মন্ত্রণালয় সভায় এসংক্রান্ত কাগজপত্র উপস্থাপন করার কথা থাকলেও অজুহাত দেখিয়ে সে সভায় তারা উপস্থিত হয়নি।

এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৭ মে ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে অধিগ্রহণ অধিশাখা-১-এর উপসচিব মির্জা তারিক হিকমত স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে আগামী ২১ মে ঢাকার ডিসি ও রাজউক চেয়ারম্যানকে এসংক্রান্ত সব নথিপত্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে রাজউকের চেয়ারম্যানের কাছে ১৩৮/৬১-৬২, ৯১/৫৭-৫৮ ও ২৩/৬৬-৬৭ নম্বর অধিগ্রহণকৃত জমি থেকে ১৩৮৫ দশমিক ২৮ একর জমির ওপর নির্মিত ভবন বা বাড়ির কতগুলো নকশা কত সালে দেওয়া হয়েছে তা জানতে চাওয়া হয়েছে। অপরদিকে ঢাকার ডিসিকে উপরোক্ত ভূমি অধিগ্রহণ মামলার অন্তর্ভুক্ত সব নথিপত্রের সত্যায়িত কপি পাঠাতে বলা হয়েছে।

রাজউকের নগর পরিকল্পনা বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, রাজউকের প্রয়োজনীয় জমি রেখে বাদবাকি জমি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে অনেক আগেই। সেসব জমির মালিকদের বাড়ি করার নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বাড্ডা, বারিধারা, নতুন বাজার, নয়ানগর, নদ্দা, জগন্নাথপুর, জোয়ার সাহারা, কুড়িল ও কুড়াতলী এলাকার হাজার হাজার ছোট-বড় ভবন ও স্থাপনা রাজউক থেকে অনুমোদন নিয়েই নির্মিত হয়েছে। যমুনা ফিউচার পার্ক ও সুবাস্তু নগরভ্যালীর মতো বিশাল বিশাল মার্কেট তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে শুধু যমুনা ফিউচার পার্ক ঘিরেই প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে।

ঢাকা জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালে ভূমি হুকুম দখল কর্মকর্তা শামীম বানু শান্তি স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে সংশ্লিষ্ট এসি ল্যান্ড এবং তহশিল অফিসকে এসব এলাকার জমিজমার খাজনা এবং নামজারি বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ২০০০ সালের ১২ মার্চ ১১৭ স্মারকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত পরিপত্রে এসব এলাকার জমির খাজনা এবং নামজারির বিষয়ে আপত্তি করা হয়েছে; যার জন্য উক্ত এলাকার অধিগ্রহণকৃত জমির অবমুক্ত গেজেট প্রকাশ না করা পর্যন্ত খাজনা কিংবা নামজারি কার্যক্রম করা যাবে না। এই চিঠিই সংশ্লিষ্ট এলাকার ১৫ লাখ মানুষের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। শুধু তাই নয়, একাধিক রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক মীমাংসিত একটি বিষয়ে রাজউক চেয়ারম্যান এম বজলুল করিম চৌধুরী এবং ঢাকা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন বেআইনি হস্তক্ষেপ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাঁরা ১৭ মার্চ এক যৌথ প্রতিবেদনে অধিগ্রহণকৃত উল্লিখিত জমিজমা অবমুক্ত করার মতো নয় বলে অভিমত দিয়েছেন। আলোচ্য ভূমি রাজউক কর্তৃক চূড়ান্তভাবে অধিগ্রহণ করে সেখানে এলাকার উন্নয়নমূলক কাজ এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বরাদ্দের ব্যবস্থা করা যেতে পারে বলে প্রতিবেদনে তাঁরা উল্লেখ করেন।

এলাকা ঘুরে জানা যায়, ওই প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অধিগ্রহণকৃত এলাকায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। একটি মীমাংসিত বিষয় নিয়ে রাজউক ও জেলা প্রশাসকের এ ধরনের পদক্ষেপের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ১৫ লাখ মানুষ রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন। স্থানীয় লোকজন সর্বস্ব দিয়ে কেনা এবং বাপ-দাদার সম্পত্তি রক্ষার জন্য সংগঠিত হয়েছেন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৫৬-৫৭ ও ১৯৬১-৬২ সালে দুটি এলএ কেস (ভূমি অধিগ্রহণ মামলা) থেকেই এসব এলাকাবাসীর দুর্দশা শুরু। প্রয়োজন না হওয়ায় এলএ কেসের আওতাভুক্ত জমি সরকার অবমুক্ত করে দেয়। পরে জমি অবমুক্ত করে লাখ লাখ মানুষের দুর্দশা লাঘব করার জন্য রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ এবং সাহাবুদ্দীন আহমদ লিখিত নির্দেশও দেন। এর পরও নানা অজুহাতে কিছু সরকারি আমলা এবং ডিসি অফিসের কর্মকর্তা এলাকাবাসীর জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছেন। দুটি প্রেসিডেন্ট অর্ডারের পরও কিভাবে সে জমি অধিগ্রহণভুক্ত থাকে সেটাই এলাকাবাসী বুঝতে পারছে না।

ঢাকা জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা সূত্রে জানা যায়, রাজউক থেকে কখনো তাদের বলা হয়নি যে ওই জমি তাদের। এ ধরনের কোনো চিঠি ডিসি অফিসের কোথাও রক্ষিত নেই। কারণ প্রেসিডেন্ট অর্ডারের পর, মন্ত্রিপরিষদের সিদ্ধান্তের পর পত্রপত্রিকায় গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে সেসব জমি জনগণকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর বিষয়টি নিয়ে তো তাদের মাথা ঘামানোর কথা নয়। এর মধ্যে ডিসি অফিসের কোনো কোনো কর্মকর্তা কেন বিষয়টি নিয়ে অতি উৎসাহী হয়ে উঠলেন সেটাই রহস্যজনক।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ঢাকার ডিসি ও রাজউকের চেয়ারম্যান সরকারি কর্মকর্তা হয়েও সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করছেন। তাঁরা জনগণ ও ক্ষমতাসীন সরকারকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন। ভূমি প্রশাসন-ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা তাঁদের থাকলেও কারো ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক সম্পত্তির মালিকানার ওপর তাঁদের কোনো অধিকার নেই। অথচ তাঁরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে সেটাই করছেন। হঠাৎ করে তাঁরা কেন সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, সে রহস্য অজানা।

পূর্ত মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, রাজউক থেকে নকশা পাস করিয়ে বিপুল টাকা খরচ করে বাড়ি নির্মাণ করার পর বলা হচ্ছে, এ জমি বা বাড়ির মালিক রাজউক। তাদের কি কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই? এ ধরনের দাবি যাঁরা করছেন, তাঁদের তো বিবেচনাবোধ থাকা উচিত।

অন্যদিকে জমি অবমুক্ত করে নামজারির অনুমোদন ও খাজনা গ্রহণ করেও ঢাকা ডিসি অফিস এখন বলছে, ওই জমি রাজউকের। তাই এর নামজারি বন্ধ থাকবে এবং খাজনা নেওয়া যাবে না। এ ধরনের পরস্পরবিরোধী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যারা নিরীহ নগরবাসীর ঘুম কেড়ে নিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

নদ্দার বাসিন্দা আনোয়ার আলী বলেন, ‘যদি আমাদের বাড়িঘর অধিগ্রহণ থেকে অবমুক্ত না-ই থাকত তাহলে ১৯৯০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত রাজউক হাজার হাজার বাড়ির নকশা দিল কোন আইনে? তহশিল অফিসগুলো ভূমি মালিকদের নামে নামজারি সম্পন্ন করে খাজনা নিল কেন? তা ছাড়া ব্যাংকগুলো বাড়ি, বাণিজ্যিক স্থাপনা, দোকানপাট ও কারখানার মালিকদের হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ মঞ্জুর করল কিভাবে? এসব প্রশ্নের জবাব আমরা ঢাকার ডিসি ও রাজউকের চেয়ারম্যান সাহেবের কাছ থেকে জানতে চাই। ’

বাড্ডা, ভাটারা, জোয়ার সাহারা, বারিধারা, নতুন বাজার, নয়ানগর, জগন্নাথপুর, নদ্দা, কুড়িল, কালাচাঁদপুর ও খিলক্ষেত এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভূমি অধিগ্রহণ থেকে মুক্তি পাওয়ার পর হঠাৎ করে চিঠি দিয়ে জমির খাজনা-খারিজ বন্ধ করে দেওয়ার নজির কোথাও আছে বলে কারো জানা নেই। তাদের নামে দলিল-দস্তাবেজ, রেকর্ডপত্র ও দখল থাকার পরও ডিসি অফিস সেই জমির খাজনা ও নামজারি বন্ধ রাখার চিঠি দিতে পারে না। এলাকাবাসীর প্রশ্ন, এ দেশে কি আইন বলতে কিছু নেই?

স্থানীয় সূত্র জানায়, এ সমস্যা নিয়ে ২০১৫ সালে ভুক্তভোগীরা স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং ঢাকা উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ কে এম রহমতুল্লার কাছে গিয়েছিল। তিনি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে এর সমাধানের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অনুরোধ করেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তাদের সরেজমিনে তদন্তপূর্বক অধিগ্রহণকৃত জমির মালিকানা প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ভূমি কর্মকর্তারা সে প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, জমির প্রকৃত মালিকরা রাজউক থেকে নকশা নিয়ে সেখানে বাড়িঘর নির্মাণ করে বসবাস করছে। তারা নিয়মিতভাবে খাজনা পরিশোধ করছে। নামজারি করতেও তাদের কোনো অসুবিধা হয়নি। এসব জমিজমা, বাড়িঘর বন্ধক রেখে তফসিলি  ব্যাংক থেকেও তাদের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ মঞ্জুর করা হয়েছে।

একাধিক ভূমি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে ওই সব এলাকাবাসীর সম্পত্তির খাজনা-খারিজ বন্ধ করা হয়েছে। অধিগ্রহণ থেকে অবমুক্ত হওয়ার একাধিক প্রেসিডেন্ট অর্ডার, মন্ত্রিপরিষদের সিদ্ধান্ত এবং পত্রিকায় গণবিজ্ঞপ্তি জারির পর ডিসি অফিস ও রাজউক থেকে সে জমি নিজেদের দাবি করা আহম্মকি ছাড়া আর কিছু নয়। যদি সে জমিতে সরকারের কোনো স্বার্থ থাকত তাহলে কখনো তার খাজনা নেওয়া এবং নামজারি দেওয়া হতো না। গায়ের জোরে তো আর জমির মালিকানা টেকানো যায় না। ’

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউক চেয়ারম্যান এম বজলুল করিম চৌধুরী গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অবমুক্ত করার বিষয়টি জেলা প্রশাসক ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার। এখানে রাজউকের তেমন কিছু করার নেই। তারপরও আমরা মানুষের কথা চিন্তা করে মাননীয় পূর্তমন্ত্রীর সাথে কথা বলেছি। আগামী রবিবার ভূমি মন্ত্রণালয়ে সভা আহ্বানের জন্য পত্র দেব। ’


মন্তব্য