kalerkantho


ভাড়া নিয়ে বাসে বাসে বিতণ্ডা

সিটিং সার্ভিসের জন্য নতুন আইন দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২১ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



ভাড়া নিয়ে বাসে বাসে বিতণ্ডা

বন্ধ করার অভিযানের নামে কয়েক দিন ধরে চরম জনদুর্ভোগ সৃষ্টির পর গতকাল আবার রাজধানীর রাস্তায় নেমেছে সিটিং সার্ভিসের বাস। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজধানীর গণপরিবহনব্যবস্থায় হঠাৎ তৈরি হওয়া বিপর্যয় কেটেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে সিটিং সার্ভিসের প্রায় সব বাসই রাস্তায় নামানো হয়েছে।

ফলে মালিকদের সিটিং সার্ভিস বন্ধ ইস্যুতে রবিবার থেকে বুধবার পর্যন্ত রাস্তায় গণপরিবহনের তীব্র সংকটের দৃশ্য গতকাল চোখে পড়েনি।

এদিকে বেশির ভাগ রুটেই সিটিং সার্ভিসের বাসে গতকালও সরকার নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি ভাড়া আদায় করা হয়েছে। কোথাও কোথাও এ নিয়ে বাসচালক ও সহকারীর সঙ্গে যাত্রীদের বচসাও হয়েছে। এই হয়রানি থেকে বাঁচতে যাত্রীরা সিটিং সার্ভিস ব্যবস্থাকে নতুন আইনি কাঠামোয় এনে সহনীয় ভাড়ার হার নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে।

গত রবিবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত রাজধানীতে হঠাৎ করে সিটিং সার্ভিসের বাসে অঘোষিত ধর্মঘট চলে। ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি নামের একটি সংগঠনের উদ্যোগে সিটিং সার্ভিসবিরোধী অভিযানের ফলে ওই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিষয়টিকে ইস্যু করে বাস মালিক ও শ্রমিকরা নগরীর রাজপথে গাড়ি  নামানো থেকে বিরত থাকে। এতে তৈরি হয় কৃত্রিম যান সংকট। অসহনীয় ভোগান্তির স্বীকার হয় নগরবাসী।

জানা গেছে, সরকার নির্ধারিত ভাড়া অনুযায়ী প্রথম তিন কিলোমিটারে সর্বনিম্ন ভাড়া সাত টাকা। তবে সিটিং বাসে আদায় করা হয়েছে সর্বনিম্ন ১০ টাকা। মোহাম্মদপুর (বসিলা)-ডেমরা রুটে স্বাধীন পরিবহনের বাসে বাংলামোটর থেকে মালিবাগের ভাড়া নেওয়া হয় ১০ টাকা। দুপুরে বাংলামোটরে বাসের অপেক্ষায় থাকা যাত্রী ছানোয়ার মিয়া বলেন, ‘সিটিং সার্ভিসের বাসে নতুন ভাড়ার হার নির্ধারণ করাটা জরুরি হয়ে পড়েছে। এই সার্ভিসকে আইনি কাঠামোয় আনতে হবে। তবে সিটিং সার্ভিস বন্ধে কেন অভিযান চালানো হলো, আর কেনই বা তা স্থগিত করা হলো এর জবাব আমরা পাচ্ছি না। মাঝখান থেকে সাধারণ মানুষকে টানা চার দিন চরম দুর্ভোগে ফেলা হলো। ’

রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন রুটে চলাচল করে সাড়ে চার হাজার বাস। এর মধ্যে প্রায় তিন হাজারই চলে সিটিং সার্ভিসের আওতায়। সিটিং সার্ভিসের বাসগুলোর বেশির ভাগ বিভিন্ন স্থানে বন্ধ রেখে চালক, সহকারী চালক ও অন্যান্য পরিবহনকর্মীরা এই ধর্মঘট শুরু করেছিল। তাতে মালিকদেরও সায় ছিল। জনস্বার্থে সরকারের উদ্যোগে গত বুধবার বিআরটিএ সদর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সিটিং সার্ভিসবিরোধী অভিযান ১৫ দিনের জন্য স্থগিত করা হয়। বসিয়ে রাখা সিটিং সার্ভিসের বাসগুলো বুধবার রাত থেকে চলতে শুরু করে। বিভিন্ন পরিবহন কম্পানি সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সচল সব সিটিং বাসই রাস্তায় নামানো হয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, রাজধানীর মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, আবদুল্লাহপুর, সায়েদাবাদ, মহাখালী, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন স্থান থেকে সিটিং সার্ভিসের বাসগুলো বেশি চলাচল করেছে। রাস্তায় স্বাধীন এক্সপ্রেস, হিমাচল পরিবহন, শিকড় পরিবহন, শ্রাবণ সুপার, গুলিস্তান-আদমজী ট্রান্সপোর্ট কম্পানি, কোমল মিনিবাস সার্ভিস, মেঘলা ট্রান্সপোর্ট লিমিটেড, বেকার মিনিবাস সার্ভিস, শ্রাবণ ট্রান্সপোর্ট কম্পানি, ভূইয়া পরিবহন, দিশারী পরিবহন, নূরে মক্কা, অনাবিল, সুপার, অসীম, পরিস্থান, অগ্রযাত্রা, রবরব, গ্যালাক্সি, রাইদা, তেঁতুলিয়া পরিবহনসহ বিভিন্ন পরিবহনের বাস চোখে পড়েছে। বেশির ভাগ বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া ২৫ টাকা আদায় করতে দেখা গেছে। তবে কিছু বাসে সরকারি হারেও ভাড়া আদায় করা হয়েছে। মিরপুর থেকে বনশ্রী রুটে চলাচলকারী আলিফ পরিবহনের ৩০টির মধ্যে ২২টি বাস গতকাল রাস্তায় চলাচল করে। এই বাস কম্পানির মালিক সাইদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, অভিযানের সময় কিছু বাসের চালক ও সহকারী মারধরের শিকার হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাদের অসুস্থতার কারণে কিছু বাস রাস্তায় নামানো যায়নি।

স্বস্তিদায়ক তবে ভাড়ার তালিকা নিয়ে বিতণ্ডা

মিরপুর ১০ নম্বরের বাসিন্দা নাজনীন সুলতানা একটি বায়িং হাউসে কাজ করেন। সকালে উত্তরার অফিসে যেতে এবং রাতে বাসায় ফিরতে তিনি সিটিং সার্ভিসের বাসে চলাচল করেন। সিটিং সার্ভিসবিরোধী অভিযানকালে তিনি বিপাকে পড়ে যান। অফিসে যাতায়াতের জন্য বাধ্য হয়ে তিনি সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকের সঙ্গে চুক্তি করেন। গত রবিবার থেকে বুধবার পর্যন্ত দিনে গড়ে ৪০০ টাকা ব্যয় করে তাঁকে অফিসে যাওয়া-আসা করতে হয়েছে। গর্ভবতী হওয়ায় সিটিং সার্ভিসের বাস চলাচলের জন্য বেশি উপযোগী উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সিটিং সার্ভিসের বিরুদ্ধে অভিযান উঠে যাওয়ায় আমি আগের মতোই বাসে চলাচল করতে পারছি। যাতায়াত খরচও হচ্ছে অনেক কম। ’

মিরপুর থেকে মতিঝিল শাপলা চত্বর পর্যন্ত যেতে সকালে বিকল্প পরিবহনে উঠে ২৫ টাকা ভাড়া দিয়ে চলাচল করেন শরীফুল ইসলাম রনি। তিনি জানান, বাসে আগের চেয়ে পাঁচ টাকা কম রেখেছে। তবে সরকার নির্ধারিত ভাড়া কত তা বাসের কর্মীরা বলতে চায়নি। তারা জানিয়েছে, ১৫ দিন পর তালিকা টাঙানো হবে।

ভিআইপি পরিবহনের বাসে নিয়মিত বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় চলাচল করেন আজাদুর রহমান। তিনি জানান, আজিমপুর-গাজীপুর রুটের ওই কম্পানির বাসে আগের মতো গলা কাটা ভাড়া গতকাল আদায় করতে দেখা যায়নি। আজিমপুর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত আগের মতোই ভাড়া আদায় করা হয়। তবে পথিমধ্যে বিভিন্ন স্টপেজে ভাড়া আগের চেয়ে গতকাল কম রাখা হয়েছে। বিভিন্ন অংশে ভাড়া ভাগ করে তা আদায় করা হয়েছে।

তবে ভাড়ার তালিকা নিয়ে যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে বাগিবতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনা অব্যাহত আছে। সিটিং সার্ভিসের বাসগুলোয় বিআরটিএ নির্ধারিত ২০১৫ সালের সর্বশেষ ভাড়ার তালিকা রাখা আছে। কিন্তু যাত্রীদের অনেকে পুরনো ভাড়ার তালিকা রাখা হয়েছে বলে চড়াও হয়। লোকাল না হয়ে আগের সিটিং সার্ভিসের মতো ভাড়া নেওয়ার প্রতিবাদ করতে গিয়ে কালশী মোড়, মিরপুর-১০, মিরপুর-১, বাংলামোটরসহ বিভিন্ন স্থানে যাত্রীদের পরিবহন শ্রমিকদের হাতে হেনস্তা হতে হয়েছে। আবার নতুন বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে পরিবহন শ্রমিকদের ওপর চড়াও হয়েছে সাধারণ যাত্রীরা।


মন্তব্য