kalerkantho


নিজের সাজা ভোগ ভাড়াটে দিয়ে

চা বিক্রেতা থেকে এখন কোটি কোটি টাকার মালিক নরসিংদী জেলা পরিষদের সদস্য নাজির
ছিনতাই মামলায় সাজা হয় তাঁর

হায়দার আলী   

২১ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



নিজের সাজা ভোগ ভাড়াটে দিয়ে

মামলা হওয়ার পর নিজের ‘ছিনতাইকারী পরিচয়’ আট বছর ধরে গোপন রাখতে পেরেছেন নরসিংদী জেলা পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য নাজিউর রহমান নাজির। নিজের পরিবর্তে এক অটোরিকশাচালককে দিয়ে ছিনতাই মামলায় আদালতে হাজিরা ও জেল খাটিয়ে নিজের অপরাধ গোপন রাখতে সক্ষম হন তিনি।

আট বছর আগে তিনি ছিলেন চা বিক্রেতা। এখন বিপুল সম্পত্তির মালিক। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হয়ে পরাজিত হয়েছেন। সম্প্রতি জেলা পরিষদ নির্বাচনে সদস্য পদে জয়ী হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, দুটি নির্বাচনে তিনি দুই কোটি টাকা খরচ করেছেন। তাঁর এই উত্থানের পেছনে রয়েছে বহু মানুষের কান্না। এমনকি যে ব্যক্তিকে তিনি বদলি জেল খাটান, সেই রিকশাচালকের সঙ্গেও প্রতারণা করেছেন। তাঁকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির টাকা দেননি।

গত শুক্রবার নরসিংদীর শিবপুর উপজেলায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সৃষ্টিগড় বাসস্ট্যান্ডে একটি দোকানে বসে চা খাওয়ার সময় এই চাঞ্চল্যকার তথ্য পান এই প্রতিবেদক। ওই দিন বিকেলে ওই চা স্টলে আড্ডা দিচ্ছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব কয়েকজন মুরব্বি। আলোচনার ফাঁকে এক বৃদ্ধ বলে ওঠেন, ‘টাকা থাকলে নেতাগো কিছুই হয় না। ক্ষমতাই এখন সব। আইজ টাকা আর ক্ষমতার জোরে বদলি জেল খাটাইয়া জেলা পরিষদের নেতাও হইছে নাজির। ’ পাশে বসা তাঁর এক স্বজন উত্তেজিত হয়ে বলেন, ‘তোমার মুখটা বন্ধ করো। নাজির শুনলে তোমার মাথা আর লগে থাকবো না। ’ এই কথোপকথনের সূত্র ধরে অনুসন্ধানে নামেন কালের কণ্ঠ’র এই প্রতিবেদক। ‘জেলা পরিষদ নেতা নাজিরের’ খোঁজ নিতে গিয়ে জানা গেল অনেক চাঞ্চল্যকর ঘটনা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, নরসিংদী জেলা পরিষদের সদস্য নাজিউর রহমান নাজিরের বিরুদ্ধে একটি অপহরণ মামলায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের আদালত। কাগজে-কলমে সেই মামলায় জেলও খাটেন নাজির। কিন্তু শারীরিকভাবে তিনি জেল খাটেননি। তাঁর বদলে জেল খাটেন পটুয়াখালীর কলাপাড়ার দরিদ্র অটোরিকশাচালক তাজিম জমাদ্দার।

মামলা সূত্রে জানা যায়, নরসিংদীর প্রাইম জুট ইন্ডাস্ট্রিতে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন আহম্মদ আলী। ২০০৮ সালের ৩ ডিসেম্বরের ঘটনা। রাজধানীর দিলকুশায় কারখানার প্রধান কার্যালয় থেকে শ্রমিকদের মজুরি ও বোনাসের চার লাখ ৩০ হাজার টাকা নিয়ে রওনা দেন নরসিংদীর শিবপুরের উদ্দেশে। পথে পড়ে যান ছিনতাইকারীর খপ্পরে। ছিনতাইকারীরা নিজেদের গাড়িতে তুলে আহম্মদ আলীকে সিদ্ধিরগঞ্জের পুলসংলগ্ন একটি মেসে নিয়ে আটকে রাখে।

এই ছিনতাইচক্রের মূল হোতা ছিলেন তখনকার চা বিক্রেতা নাজিউর রহমান নাজির। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নাজির সশরীরে উপস্থিত থেকে টাকাগুলো ছিনিয়ে নেন। নাজিরকে আগে থেকে চিনতেনও আহম্মদ আলী। তবে খুবই কৌশলে ছিনতাইকারীদের কবল থেকে মুক্তি পান তিনি। একপর্যায়ে স্থানীয় পুলিশের সহযোগিতায় তিনি রক্ষা পান।

এ ঘটনায় নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় ছিনতাই ও অপহরণের অভিযোগে নাজিরসহ চারজনকে আসামি করে একটি মামলা করা হয়। দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া শেষে ২০১১ সালের ৩০ মার্চ নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশরাফুজ্জামান জিলানী এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে চার আসামিকেই বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড প্রদান করেন। ছিনতাইয়ের ঘটনায় আসামি নাজিরের ভূমিকাকে মুখ্য এবং গুরুতর উল্লেখ করা হয় রায়ের পর্যবেক্ষণে। এ জন্য তাঁকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মামলার সংশ্লিষ্টরা জানান, মামলা দায়েরের পর থেকে নাজির জামিনে ছিলেন। তবে জামিনের অপব্যবহার করে রায় ঘোষণা পর্যন্ত আদালতে হাজিরা দেননি তিনি। পলাতক অবস্থায় তাঁর বিরুদ্ধে রায় হয়।

কিন্তু রায়ের পর থেকেই চিন্তিত হয়ে পড়েন নাজির। নিজেকে বাঁচাতে এবার ফন্দি আঁটেন চতুর নাজির। পটুয়াখালীর কলাপাড়ার অনন্তপাড়া গ্রামের মো. বাদল জমাদ্দারের ছেলে তাজিম জমাদ্দারকে নানা রকম প্রলোভন দেখান তিনি। তাজিম সিদ্ধিরগঞ্জে রিকশা চালান। তাঁকে একটি অটোরিকশা কিনে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আদালতে হাজিরা দিতে রাজি করানো হয়। এ কাজের বিনিময়ে তাজিমকে একটি অটোরিকশা অথবা নগদে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন নাজির।

সংসারে অনটন ও অসচ্ছলতার কথা চিন্তা করে সহজ-সরল তাজিম রাজি হয়ে যান। কথামতো নাজির হয়ে তাজিম নারায়ণগঞ্জের আদালতে আত্মসমর্পণ করেন ২০১১ সালের ১০ অক্টোবর। আদালতে তাঁকে জেলে পাঠান। পরে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আপিল করে ২৪ দিন পর তাঁকে জামিনে মুক্ত করেন নাজির। কিন্তু প্রতিশ্রুত অর্থ দেওয়া নিয়ে শুরু হয় টালবাহানা। পরে সব হারিয়ে দরিদ্র তাজিম ফিরে যান গ্রামে। আবার শুরু হয় তাঁর কষ্টের জীবন।

নাটকীয় এই প্রতারণার শিকার হয়ে আইনের ভয়ে এখন আর কাউকে কিছু বলতেও পারেন না তাজিম জমাদ্দার। গত রবিবার কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ভাই, আমার কোনো দোষ নাই। আমি চিন্তা করছিলাম একজন মানুষের উপকার হবে। তা ছাড়া আমারও দীর্ঘদিনের অভাব দূর হওয়ার সুযোগ ছিল। একটি অটোরিকশা পেলে আমার সংসারের অভাব দূর হতো। কিন্তু সেটি আর হলো না। আল্লায় ওর বিচার করবো। ’

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে প্রাইম জুট ইন্ডাস্ট্রির ব্যবস্থাপক (উত্পাদক) শাহ আজিজুর রহমান ছিনতাই ও অপহরণ মামলাটির রায় হয়েছে বলে জানালেও বিস্তারিত কিছু বলতে চাননি। তবে মামলাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত কারখানার সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. জসীম উদ্দিন বলেন, ‘নাজির মাসখানেক জেল খেটেছে বলেও শুনেছি। তবে নাজিরের হয়ে অন্য কারো বদলি জেল খাটার ঘটনা আমার জানা নেই। ’ কারখানার আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, ‘নাজিরের বাড়ির পাশঘেঁষাই প্রাইম জুট মিল। নাজিরের ভয়ে কারখানার মালিক থেকে শুরু করে কেউ কথা বলে না। গ্রামের অনেকেই বদলি জেল খাটার খবর জানলেও মুখ খুলতে চায় না। ’

অন্যদিকে সম্প্রতি নরসিংদী জেলা পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য পদে নির্বাচিত হন নাজিউর রহমান নাজির। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের হলফনামায় তিনি ছিনতাইয়ের মামলায় পাঁচ বছরের জেল হওয়ার বিষয়টি গোপন করে যান। তিনি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী থেকে শিবপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি নূর উদ্দিন মোল্লাকে পরাজিত করেন। এ প্রসঙ্গে নূর উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নাজির ভোটপ্রতি দেড় লাখ টাকা খরচ করে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর টাকার কাছে আমি পরাজিত হয়েছিলাম। ’ পাঁচ বছরের জেল এবং বদলি জেল খাটানোর বিষয়ে তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘এসব বিষয়ে তথ্য পেলে আমি উচ্চ আদালতে মামলা করব। ’

যেভাবে চা দোকানদার থেকে কোটিপতি নাজির : চায়ের দোকানি থেকে কোটিপতি ও জনপ্রতিনিধি হওয়ার নেপথ্যের সব কিছুই বেরিয়ে আসে কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে। বেরিয়ে আসে সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন, ভুয়া দলিলে ভিটামাটিছাড়া করাসহ আরো অসংখ্য কুকীর্তির তথ্য।

জানা গেছে, শিবপুরের সৃষ্টিগড় এলাকার হাজি জয়নাল আবেদীনের ছেলে নাজির। একসময় তিনি ছিলেন চা দোকানদার। আট বছর আগেও সৃষ্টিগড় বাসস্ট্যান্ডে চায়ের দোকান চালিয়ে তাঁর সংসার চলত। কখনো ছিলেন মিষ্টির দোকানের শ্রমিক। সময়ের ব্যবধানে ধীরে ধীরে জালিয়াতি আর প্রতারণার মাধ্যমে তিনি হয়ে ওঠেন কোটিপতি। এখন তিনি জেলা পরিষদের সদস্য। চলেন দামি গাড়িতে। শিবপুর তিতাস গ্যাস ফিল্ড কার্যালয়ের সামনে মহাসড়কের পাশে রয়েছে তাঁর ২৫ শতাংশ জমি। পিপলস ইউনিভার্সিটির পাশেই আছে ৩০ শতাংশ জমি। দুটি জমির মূল্য প্রায় তিন কোটি টাকা। ফসলি জমিসহ নরসিংদীর বিভিন্ন স্থানে রয়েছে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ।

গ্রামবাসী জানায়, গত বছর শিবপুর উপজেলার যোশর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে প্রায় দেড় কোটি টাকা খরচ করে পরাজিত হন নাজির। পরে জেলা পরিষদের সদস্য পদে প্রায় ৮০ লাখ টাকা খরচ করে জয়ী হন বলে এলাকায় অভিযোগ রয়েছে। নাজিরের নির্যাতন আর প্রতারণার কারণে ভিটামাটি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে বহু মানুষ।

গতকাল সন্ধ্যায় অভিযুক্ত নাজিউর রহমান নাজিরের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ আমার কোনো মামলায় সাজা হয়নি। এ ধরনের কোনো মামলা আমার নেই। ’ মামলার সপক্ষে প্রমাণাদিসহ সুনির্দিষ্ট তথ্যের কথা বলা হলে তিনি ভড়কে যান। একপর্যায়ে বদলি জেল খাটানোর কথা স্বীকার করে নাজির বলেন, ‘ভাই, আমি মানুষ, আপনিও মানুষ। মানুষই ভুল করে। আমার এটা ভুল হয়ে গেছে। আমাকে বাঁচান। পত্রিকায় রিপোর্ট হইলে আমি শেষ হয়ে যাব। ’


মন্তব্য