kalerkantho


হার্টের রিং নিয়ে অন্ধকারে রোগী

তৌফিক মারুফ   

২১ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



হার্টের রিং নিয়ে অন্ধকারে রোগী

নিজের স্বজনের হৃদযন্ত্রে রিং (করোনারি স্টেন্ট) পরানোর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে ঢাকার একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক সাজ্জাদুল আলম বলেন, ‘একটি প্রাইভেট হাসপাতালে আমার মামার হার্টে রিং পরানোর আগে ডাক্তার বলেছিলেন, কমপক্ষে পাঁচ বছরের মধ্যে আর কোনো সমস্যা হবে না। এনজিওগ্রামের পর আমাদের জানানো হয় মেডিকেটেড (ওষুধ মেশানো) রিং পরানোর কথা। রিংয়ের দাম রাখা হয়েছিল এক লাখ ৪০ হাজার টাকা। কিন্তু এক বছর পার না হতেই আবার সমস্যা দেখা দেয়। তখন তাঁর বাইপাস করা হয়। পরে আরেক ডাক্তারই আমাদের বলেন, আগের রিংটি আসলেই মেডিকেটেড ছিল কি না তা নিয়ে সন্দেহ আছে। ’

চিকিৎসক কাওসার হোসেনের এক আত্মীয়ের হার্টে রিং পরানো হয় আরেকটি বড় বেসরকারি হাসপাতালে। কাওসার বলেন, ‘সেখানে প্যাকেজের আওতায় সব হলেও রিং বাবদ দেখানো হয়েছে দুই লাখ ৪০ হাজার টাকা। কিন্তু আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, আসলে ওই রিংয়ের দাম এক লাখ ৮০ হাজার টাকা। এমন প্রতারিত হওয়ার পরও আমি ডাক্তার হয়েই কিছু করতে পারিনি। কারণ এটি আমাদের পেশার জন্যই বিব্রতকর।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রবীণ এক হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কমিশন বাণিজ্য ডাক্তারদের স্বভাব নষ্ট করে দিয়েছে। আগে কেবল ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা প্যাথলজিক্যাল টেস্ট থেকে কমিশন দেওয়া হতো, ওষুধ কম্পানি থেকে দেওয়া হতো গিফট। এখন এক শ্রেণির কার্ডিওলজিস্ট রীতিমতো রিং থেকেও কমিশন খান, যা শুনে আমরাই লজ্জিত। রোগীদের জিম্মি করে চিকিৎসক আর রিং ব্যবসায়ীদের এমন অনৈতিক বাণিজ্য বন্ধ করা একেবারেই জরুরি। ডাক্তারদের কমিশন বন্ধ হলেও দাম অনেক কমবে, মুনাফার হারেও লাগাম টানা যাবে। ’

ওই চিকিৎসক জানান, রিং বিক্রেতারা প্রকৃত দামের পর প্রায় দ্বিগুণ লাভ করেন। সরকারও বিষয়টি ভালো করেই জানে। কিন্তু তারা কঠোর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে না রোগীদের সমস্যায় পড়ার ভয়ে।

রিং থেকে লাগামহীন মুনাফা লোটার বিষয়টি অবহিত হয়েই এবার নড়েচড়ে বসেছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। তারা মুনাফায় লাগাম টানার উদ্যোগ নিতেই বিগড়ে যান রিং ব্যবসায়ীরা।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক মো. রুহুল আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মানুষ যাতে আর প্রতারিত না হয় সে জন্য আমরা উদ্যোগ নিয়েছে, আমদানিকারকদের ইনভয়েস দেখে আমদানি দামের সঙ্গে লাভ হিসাবে ১.৫৫ শতাংশ হারে যুক্ত করে সরকারি খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা তা মানতে চায় না। ’

বাংলাদেশ মেডিক্যাল ডিভাইস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি গাজী শাহীন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দাম থেকে কোনো রোগী প্রতারিত হয় না। এ ছাড়া এক রিংয়ের জায়গায় আরেক রিং পরানোর অভিযোগও ঠিক নয়। তবু আমরাও চাই এ ক্ষেত্রে আরো বেশি শৃঙ্খলা আসুক। সে জন্য আমরাও প্যাকেটের গায়ে এমআরপি (সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য) রাখার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি। কিন্তু আমাদের কয়েকটি আপত্তির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, সরকার যে ১.৫৫ শতাংশ যোগ করার কথা বলেছে  আমরা সেখানে চাই ১.৮৯ শতাংশ যোগ করতে। এটা নিয়ে আমাদের সাথে ঔষধ প্রশাসনের দেন-দরবার হচ্ছে। এ ছাড়া হাসপাতালের দর্শনীয় স্থানে মূল্য তালিকা ঝোলানোতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। ’

রোগীদের জিম্মি করে বুধবারের ধর্মঘট প্রসঙ্গে ওই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘আমরা রোগীদের জিম্মি করিনি, মাত্র দুই ঘণ্টার জন্য রিং বিক্রি বন্ধ রেখেছিলাম। এরপর থেকে ঠিক হয়ে গেছে। আজও (বৃহস্পতিবার) সব স্বাভাবিকভাবেই চলেছে। ’

গাজী শাহীনের দাবি, বাংলাদেশে ভারতের বা চীনের কোনো রিং আসে না। ফলে কেউ যদি আমেরিকা বা ইউরোপের রিংয়ের পরিবের্তে ভারত বা চীনের রিং পরানোর সন্দেহ করে থাকে তা ঠিক নয়।

যদিও খোদ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকেই হিসাব দিয়ে বলা হয়েছে, ভারতে যে রিংয়ের দাম সাত হাজার ২৬০ রুপি, তা বাংলাদেশি টাকায় রূপান্তর করলে হয় আট হাজার ৯২৯ টাকা। আর যে রিংয়ের দাম ভারতে ২৯ হাজার ৬০০ রুপি, তা বাংলাদেশি টাকায় রূপান্তর করলে হয় ৩৬ হাজার ৪০৮ টাকা। কিন্তু বাংলাদেশে ওই রিংয়ের দাম দীর্ঘদিন ধরেই আদায় করা হচ্ছে কয়েক গুণ বেশি। যে যার মতো রিংয়ের দাম রাখছে।

এদিকে রিং ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা শঙ্কা প্রকাশ পেয়েছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের মুখেও। তিনি গত মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, একবারে দাম নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নিতে গেলে ব্যবসায়ীরা রোগীদের জিম্মি করার মতো পদক্ষেপ নিতে পারে। ওই কর্মকর্তার কথা সত্যি করে পর দিনই হাসপাতালে হাসপাতালে এনজিওগ্রামের টেবিলে রোগীদের রেখে রিং বিক্রি বন্ধ করে দেয় ব্যবসায়ীরা। ফলে চরম ঝুঁকির মুখে পড়ে রোগীদের জীবন। হৃদরোগীদের হৃদযন্ত্রের রিং নিয়ে নৈরাজ্য কমাতে সরকার মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এর প্রতিবাদে রিং ব্যবসায়ীরা ওই ধর্মঘট পালন করে।

রিং ব্যবসায়ীদের নেতা বেশি দাম রাখার কথা অস্বীকার করলেও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের কাছে বেশ দৃঢ়ভাবেই বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রেই আমরা খবর পাই, ২৫ হাজার বা ৫০ হাজার টাকার রিংয়ের দাম কোথাও কোথাও রোগীদের কাছ থেকে এক-দেড় লাখ টাকা করে আদায় করা হয়। এটা খুবই অন্যায়। আবার মান নিয়েও প্রশ্ন আছে। এসব কারণেই বিশেষ কমিটি গঠন করে দাম ও মান নিয়ন্ত্রণে তদারকির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ’

ওই কর্মকর্তা জানান, চারটি অনুমোদিত আমদানিকারক কম্পানি ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কাছ থেকে তাদের প্রতিটি মেডিকেটেড রিংয়ের দাম ৫০ হাজার এবং নন-মেডিকেটেড রিংয়ের দাম ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করে দেওয়ার আবেদন করেছে। ফলে ওই চার প্রতিষ্ঠানের রিংয়ের প্যাকেটের গায়ে খুচরা মূল্য হিসেবে ওই দাম উল্লেখ করে দেওয়া হবে।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, দেশে এখনো কোনো রিং তৈরি হয় না। সবই আমদানিনির্ভর। এ ক্ষেত্রে এ পর্যন্ত মোট ২১টি প্রতিষ্ঠান ৪৭ ধরনের রিংয়ের রেজিস্ট্রেশন নিয়েছে।


মন্তব্য