kalerkantho


ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়ায় ভারতীয় হাইকমিশনার

গণহত্যার স্বীকৃতি পেতে সমর্থন দেবে দিল্লি

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

২৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



গণহত্যার স্বীকৃতি পেতে সমর্থন দেবে দিল্লি

ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলাকে গতকাল ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া কার্যালয়ে স্বাগত জানান বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান। ছবি : কালের কণ্ঠ

গণহত্যা দিবস পালনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর সংঘটিত গণহত্যার স্বীকৃতি আদায়ের যে লড়াইয়ে নেমেছে বাংলাদেশ তাতে সমর্থন দেবে ভারত। গতকাল সোমবার বিকেলে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে ভারতের হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা এ কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সাত বছর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্বিপক্ষীয় সফরে যাচ্ছেন। আমি আশ্বস্ত করতে পারি যে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সফল সফর হবে। ’

হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা আরো বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর আসন্ন ভারত সফরকালে নয়াদিল্লিতে রাষ্ট্রপতি ভবনে থাকবেন। সাধারণত বিদেশি রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানরা হোটেলে থাকেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের কারণেই শুধু নয়, বাংলাদেশের প্রতি গুরুত্বের কারণে তাঁকে রাষ্ট্রপতি ভবনে থাকার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ’

অনুষ্ঠানে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান তাঁর বক্তৃতায় অত্যন্ত ব্যস্ততার মধ্যেও ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের মিডিয়া হাউসগুলো পরিদর্শনে আসায় ভারতীয় হাইকমিশনারকে ধন্যবাদ জানান। আহমেদ আকবর সোবহান বলেন, ‘ভারত আমাদের সবচেয়ে ভালো বন্ধু। ১৯৭১ সালে প্রমাণিত হয়েছে, বিপদের সময়ে তারাই আমাদের সত্যিকারের বন্ধু। আর কোনো দেশ এটি দিতে পারে না। ’ তিনি আশা করে বলেন, ‘ভারত সব সময় আমাদের পাশে থাকবে। স্বাধীনতা দিবসে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আমাদের জনগণকে শুভেচ্ছা জানানোয় সবাই খুশি। ’

বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমি আশা করি, হাইকমিশনার শ্রিংলার মেয়াদে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী দিন দিন আরো ভালো হবে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক দিন দিন জোরালো হবে। ’

ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, ‘২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস ঘোষণা করে পালন করাকে আমি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। কারণ আপনাদের ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের রেকর্ড রাখতে হবে। ’ তিনি বলেন, ‘বিপুলসংখ্যক মানুষ এ দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ করেছেন। স্বাধীনতা এমনি এমনি আসেনি। ’

শ্রিংলা বলেন, ‘হলোকস্ট ডিনায়াল’ (হলোকস্ট অস্বীকার)-এর মতো একটি গ্রুপ ‘জেনোসাইড ডিনায়াল’ (গণহত্যা অস্বীকার) হবে। তারা বলবে, বাংলাদেশে গণহত্যা হয়নি। মাত্র কিছু লোক মারা গেছেন...ইত্যাদি। তাই এটি রেকর্ড রাখার জন্য গণহত্যা দিবস পালন করা গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, ঐতিহাসিকভাবে গণহত্যার সম্ভাব্য সব ধরনের প্রমাণ এখানে আছে। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা এ দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষকে যে নির্মূল করেছে সে ব্যাপারে কোনো বিতর্ক নেই। আর এটি ঐতিহাসিক ঘটনা, যা কেউ অগ্রাহ্য করতে পারে না। আর এটি আজ যারা অগ্রাহ্য করে, বলে যে এসব কিছু হয়নি তাদের অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে। তিনি বলেন, ‘গণহত্যার বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে নিয়ে বলতে হবে, এটি হয়েছিল। আমাদের এটি সংরক্ষণ করতে হবে। আমরা এটি জনগণকে ভুলে যেতে দিতে পারি না। কারণ আমরা ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের স্মৃতি ভুলে যেতে পারি না। ’

ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনর্জাগ্রত হবে। কারণ এখন বাংলাদেশ ও ভারতে আমাদের অনেকে তখন ছোট ছিলেন। আমরা জানি, ১৯৭১ সালে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি শরণার্থী ভারতে গিয়েছিলেন। সেখানে মানবিক বিষয়, মানবাধিকার সমস্যা ছিল। ’ তিনি বলেন, নিঃসন্দেহে আজকের প্রেক্ষাপটে এটি হলে জাতিসংঘ ‘সুরক্ষার অধিকার’-এর মতো বিষয় তুলত। এটি তখনকার দিনগুলোতে ছিল না। তখন শীতল যুদ্ধের রাজনীতিও ছিল।

ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে অংশীদারত্বের প্রতি আমরা সম্মান দেখাব। আমাদের বন্ধুত্ব ইতিহাস, সভ্যতা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভাষা ও ভ্রাতৃত্ববোধের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বন্ধুত্ব। আমাদের বন্ধুত্ব কারিগরি কোনো সংজ্ঞায় ফেলা কঠিন। ’ তিনি বলেন, ‘আমাদের বন্ধুত্বের ভিত্তি পারস্পরিক সম্মান, পরস্পরের সার্বভৌমত্বকে সম্মান এবং পরস্পরের অবস্থানকে সম্মান জানানো। দ্বিতীয় বিষয় হলো আমরা যা কিছুই করি না কেন, তা উভয়ের স্বার্থেই করে থাকি। আমি এমন কোনো উদ্যোগ নেব না, যাতে আমাদের লাভ হলেও আপনাদের ক্ষতি হয়। আমাদের এ বন্ধুত্বের নীতি বোঝা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ’

শ্রিংলা বলেন, ‘ভারতে একটি মনোভাব আছে যে বাংলাদেশকে পেছনে রেখে আমরা উন্নতি করতে পারব না। বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর উন্নতি বাংলাদেশের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। আমরা যদি মনে করি, ভারত এগিয়ে যাবে এবং বাংলাদেশ তার অবস্থানেই থাকবে তবে, তা ভুল হবে। আবার বাংলাদেশ যদি মনে করে সে একাই এগিয়ে যাবে এবং ভারত তার স্থানে থাকবে, তবে তাও যথার্থ হবে না। ’ তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি সত্যিকারের প্রবৃদ্ধি ও সীমান্ত বাণিজ্য চান তাহলে আপনাদের বিনিয়োগের সুযোগ দিতে হবে। আপনারা যদি ভারতে বিনিয়োগ করেন তাহলে প্রবৃদ্ধি ও  রপ্তানি বাজার পাবেন। ইতিমধ্যে অনেক কম্পানি করছে। আমরা আরো বিনিয়োগে উৎসাহিত করছি। বসুন্ধরার মতো গ্রুপ এ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ’

ভারতীয় দূত বলেন, ‘বাংলাদেশে ভারতের বড় বিনিয়োগ আছে। বড় কয়েকটি কম্পানি বাংলাদেশে বিনিয়োগের অপেক্ষায় আছে। সেগুলো এলে ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হবে। এই বিনিয়োগের অর্থ হলো আপনারা বাড়তি কোনো অর্থ ছাড়াই বিদেশি অর্থ পাচ্ছেন। ’ তিনি আরো বলেন, ‘সাত বছর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্বিপক্ষীয় সফরে যাচ্ছেন। আমি আশ্বস্ত করতে পারি যে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সফল সফর হবে। ’

আসন্ন সফরকালে তিস্তা চুক্তি সই হতে যাচ্ছে কি না এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা চুক্তিতে কী থাকছে জানতে চাইলে হাইকমিশনার বলেন, ‘আমার পক্ষে এখনই এই ইস্যুতে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। কারণ এখনো আলোচ্য বেশ কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত আলোচনার প্রক্রিয়ার মধ্যেই আছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলে নিশ্চিতভাবেই তা প্রকাশ করা হবে। ’ তবে অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আসন্ন সফরে বাণিজ্য, সীমান্ত হাট, শুল্কায়ন, প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, সাইবার নিরাপত্তা, কানেকটিভিটি, শিপিং, পর্যটন, ক্রুজ শিপিং, ড্রেজিং, তথ্য বিষয়ে সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণে বেশ কিছু চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই করতে যাচ্ছে দুই দেশ।

ভারতের হাইকমিশনার বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৭০ শতাংশের বয়স ৪০ বছরের নিচে। এটি ১৯৭১ সাল-পরবর্তী প্রজন্ম। ১৯৭৫ থেকে নির্দিষ্ট একটি সময় পর্যন্ত, এমনকি ১৯৯১ সালেও বিকৃত ইতিহাসের বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। তাদের বলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধে অন্য কোনো দেশের কোনো ভূমিকা ছিল না। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, এ দেশের তরুণ প্রজন্ম ভারতের মতো প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখার সুফল বুঝতে পারবে। নিকট প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক না থাকলে মধ্যম বা উচ্চ আয়ের দেশ হওয়া যাবে না। ’

গতকাল বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া কমপ্লেক্স পরিদর্শনে আসেন ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা। কনফারেন্স কক্ষে পৌঁছলে তাঁকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান। ওই সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন বাংলানিউজটোয়েন্টিফোরডটকমের এডিটর-ইন-চিফ আলমগীর হোসেন, কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন, বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম, কালের কণ্ঠ’র নির্বাহী সম্পাদক মোস্তফা কামাল,  ডেইলি সানের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শিয়াবুর রহমান, নিউজ টোয়েন্টিফোরের নির্বাহী পরিচালক হাসনাইন খুরশিদ, রেডিও ক্যাপিটালের নির্বাহী পরিচালক মেহেদী মালেক সজীবসহ ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের সিনিয়র সাংবাদিকরা। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন নিউজটোয়েন্টিফোরের হেড অব কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স সামিয়া রহমান। অনুষ্ঠানে ভারতীয় হাইকমিশনের কাউন্সেলর (প্রেস, মিডিয়া, কালচার) রাজেশ উইকে, প্রথম সচিব অরুন্ধতী দাশ, অ্যাটাশে রঞ্জন মণ্ডল উপস্থিত ছিলেন। পরে হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা বাংলাদেশ প্রতিদিন, কালের কণ্ঠ, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর, ডেইলি সান, রেডিও ক্যাপিটাল ও নিউজটোয়েন্টিফোর অফিস পরিদর্শন করেন। তিনি সাংবাদিক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচিত হন। ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের মিডিয়াগুলোর ভূমিকার প্রশংসা করে হাইকমিশনার বলেন, বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই মিডিয়াগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।


মন্তব্য