kalerkantho


শামশুল হুদা বিএসসি

চার পাক গোয়েন্দা হত্যায় নেতৃত্ব দিই

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া (কক্সবাজার)   

২১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



চার পাক গোয়েন্দা হত্যায় নেতৃত্ব দিই

‘১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানের চার গোয়েন্দা যাচ্ছিল বাংলাদেশে (পূর্ব পাকিস্তান)  নিয়োজিত মার্কিনিদের প্রধান চর কক্সবাজারের চকরিয়ার মালুমঘাট মেমোরিয়াল খ্রিস্টান হাসপাতালের পরিচালক ডা. অলসনের কাছে। তাদের আটকাতে আমি, আমার বড় ভাই বৈমানিক মোজাম্মেল হকসহ বেশ কয়েকজন সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা চিরিঙ্গা-মাতামুহুরী ব্রিজ এলাকায় ওত পেতে ছিলাম। আরাকান সড়ক দিয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে মাজদা ব্র্যান্ডের একটি সাদা কারে চেপে তারা যাচ্ছিল। ব্রিজের ওপর ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছিল। রাত সোয়া ১২টার দিকে কারটি মাতামুহুরী ব্রিজে ব্যারিকেডে আটকা পড়ে। মুহূর্তে কারটি ঘিরে ফেলি। গোয়েন্দারা বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করছে জানিয়ে নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করে। কিন্তু আমরা সোজা তাদের নিয়ে যাই চিরিঙ্গা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে। সেখানে তাদের আটকে রেখে বড় ভাই মোজাম্মেল হক যোগাযোগ করেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের মুক্তিবাহিনীর প্রধান সংগঠক এম আর ছিদ্দিকীর সঙ্গে। চার গোয়েন্দাকে আটক করার খবর পেয়ে তিনি উল্লসিত হন। তিনি নির্দেশ দেন—এই মুহূর্তে তাদের হত্যা কর। তাদের আমরাও খুঁজছি; তারা গা ঢাকা দিয়েছিল। তাঁর নির্দেশ পাওয়ার পরই আমরা গুলি করে হত্যা করি তাদের। ’

মুক্তিযোদ্ধা শামশুল হুদা বিএসসি কালের কণ্ঠকে এ কাহিনী জানান। যুদ্ধদিনের স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এই চার গোয়েন্দার মিশন ছিল মার্কিনিদের প্রধান চর ডা. অলসনের কাছে গিয়ে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় মার্কিন সপ্তম নৌবহর আনার বিষয়ে বৈঠক করা। যদি তারা সেদিন অলসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারত তাহলে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ত সপ্তম নৌবহর। তাতে পরিস্থিতি পাল্টে যেত। কক্সবাজারে বড় ঘাঁটি স্থাপন করত পাকিস্তান সেনাবাহিনী। ডা. অলসনের কথায় মার্কিন সরকার বাংলাদেশ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিত। কিন্তু তাঁর কাছে পৌঁছানোর আগেই চার গোয়েন্দাকে হত্যা করা হয়। বড় ধরনের বিপদ থেকে কক্সবাজার তথা পুরো বাংলাদেশ রক্ষা পায়। ’

শামশুল হুদা ওই চার গোয়েন্দার নামও মনে রেখেছেন। তারা হলো পাঞ্জাবি মোহাম্মদ হোসেন, বিহারি ফারুক চৌধুরী এবং দুই বাঙালি বরিশালের কাজী হাবিব ও ঢাকার ইয়ার মোহাম্মদ।

শামশুল হুদা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পরই চকরিয়ায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে মানুষকে সংগঠিত করার কাজ শুরু করি। আমাদের একান্নবর্তী পরিবারের সব সদস্য মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। পাকিস্তান সরকারের পক্ষে চকরিয়া থানায় দায়ের করা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় (নং-৪, তারিখ-২২/০৫/১৯৭১) ৫২ জনকে আসামি করা হয়েছিল। পরে সাতজনকে বাদ দিয়ে ৪৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। ৫ নম্বর থেকে ১২ পর্যন্ত আটজন আমার পরিবারের সদস্য। তারা হলো বড় ভাই মোজাম্মেল হক, আহমদ কবির, আকবর আহমদ, চাচাতো ভাই আবদুর রহিম, মোহাম্মদ ইউনুছ, শের আলম, ভাগ্নে শাহনেওয়াজ ও আমি। ’

‘৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী গঠিত চকরিয়া থানা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমি বড় ভাই মোজাম্মেল হক (পাকিস্তান বিমানবাহিনীর করপোরাল) ও আরো কয়েকজনের সমন্বয়ে মুক্তিবাহিনী গঠন করি। চকরিয়া থানা থেকে রাইফেল নিয়ে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হই। ’

‘২৩ থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত আমার নেতৃত্বে এবং ক্যাপ্টেন ফরহাদ ও সুবেদার আবদুল লতিফসহ ৫২ জন ইপিআর সদস্যের সহায়তায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের দালালদের ওপর আক্রমণ করার জন্য ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয় বানিয়ারছড়া ও ফাঁসিয়াখালী পাহাড়ের ঢালায়। এর মধ্যে ২৫ এপ্রিল ক্যাপ্টেন ফরহাদ ও সুবেদার লতিফ কক্সবাজার যান। কিন্তু অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে তাঁদের বন্দি করা হয়। ২৬ এপ্রিল বানিয়ারছড়া ঢালা থেকে আমরা সরে গিয়ে ফাঁসিয়াখালী ঢালায় অবস্থান নিই। ২৭ এপ্রিল পাকবাহিনী চকরিয়ায় তাণ্ডব চালায়। চিরিঙ্গা নাথপাড়া, হিন্দুপাড়াসহ কয়েকটি গ্রামে অনেক বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয় তারা। নাথপাড়া থেকে সুধীর চন্দ্র নাথ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে, রাজাকারদের কাছ থেকে এ তথ্য জানার পর তার বাড়িতেও হানা দেয় তারা। সুধীর নাথকে না পেয়ে তার বাবা রমণী মোহন নাথকে গুলি করে হত্যা করে এবং বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় পাক আর্মি। ’

শামশুল হুদা বলেন, ‘ফাঁসিয়াখালী ঢালায় কঠোর অবরোধ আছে জেনে পাক আর্মি বেশ কয়েক দিন কক্সবাজার যেতে সাহস করেনি। পরে ৫ মে তারা কক্সবাজার যায়। ক্যাপ্টেন ফরহাদ ও সুবেদার লতিফকে হত্যা করে শহর দখলে নেয় তারা। ১১ মে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পাক সেনারা মাতামুহুরী ও ছড়া বেতুয়ার খাল পার হয়ে আমাদের বাড়িতে হামলা চালায়। জ্বালিয়ে দেয় আমাদের ১৩টি ঘর। ’

‘১৮ মে পাহাড়ি পথ দিয়ে আমরা চলে যাই ভারতের দেমাগ্রীতে। সেখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফেরত আসি ৭ নভেম্বর। আবারও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে লোকজনকে সংগঠিত করতে থাকি। আমার নানা কৈয়ারবিলের হামিদুল্লাহ সিকদার। তাঁর বাড়িতে অবস্থান নিই। এ খবর পেয়ে আমাকে মারার জন্য ১৫০ জন পাক আর্মি ও স্থানীয় রাজাকার নানার বাড়ি ঘেরাও করে এক দিন রাতের বেলায়। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে বাড়ির পেছনের পথ দিয়ে বেরিয়ে ধানক্ষেতে লুকিয়ে থাকি। বলতে গেলে অলৌকিকভাবেই বেঁচে যাই সেদিন। পাক আর্মি টর্চলাইটের আলো ছড়িয়ে আমাকে খুঁজেছিল। ’

বীর মুক্তিযোদ্ধা শামশুল হুদা জানান, ‘৩ ডিসেম্বর রাতে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ৬ ডিসেম্বর চকরিয়ার চিরিঙ্গা পুরান বিমানবন্দরে পাকিস্তান আর্মির ঘাঁটি লক্ষ্য করে তিনটি বোমা নিক্ষেপ করে ভারতীয় বিমানবাহিনী। বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া হয় পাকবাহিনীর ওয়্যারলেস ক্যাম্পটিও। ৮ ডিসেম্বর আমার নেতৃত্বে এবং সন্দ্বীপের শামশুল আলম কমান্ডারের সহায়তায় চারদিক থেকে সশস্ত্র আক্রমণ শুরু হয়। পাকিস্তানি আর্মি চকরিয়া থেকে পিছু হটতে থাকে। ওই দিনই চকরিয়া শত্রুমুক্ত হয়। বাটাখালীর ফজল মাতবরের ছেলে কুখ্যাত দালাল জহির আহমদকে ধরে চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার পুটিবিলায় মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। ’

‘১৪ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আমার নেতৃত্বে আজিজনগরে প্যারামিলিটারি মুজাহিদ বাহিনীর ক্যাম্পে আক্রমণ শুরু হয়। বিজয় লাভ করার পর ক্যাম্প থেকে তিনটি এলএমজি, পাঁচটি এসএমজি ও ৪৮টি রাইফেল এবং প্রচুর গোলাবারুদ উদ্ধার করি। সাড়ে ১১টার দিকে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর কর্নেল গোর্বাচরণ সিংয়ের নেতৃত্বে দেড় শতাধিক ভারতীয় ও বাঙালি যোদ্ধা সেখানে আসে। তারা আমাদের অভিযানে খুবই আনন্দিত হয় এবং আমাদের প্রশংসা করে। আমরা মিত্র বাহিনীর কাছে উদ্ধার করা অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দিই। ’

শামশুল হুদা বিএসসির বাড়ি চকরিয়া উপজেলার পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়নের মাইজপাড়ায়। বাবা মরহুম আলহাজ বদিউজ্জামান। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে আমাদের পরিবারের অবদান এ অঞ্চলে সর্বাধিক। চকরিয়ায় আমাদের পরিবারই প্রথম মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য মানুষকে সংগঠিত করে। একসঙ্গে এক পরিবার থেকে এত সদস্যের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া বিরল ঘটনা। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে আজ পর্যন্ত আমাদের পরিবারের এই সদস্যদের নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ’


মন্তব্য