kalerkantho


চালের ঘাটতি নেই তবু বাড়ছে দাম

শওকত আলী   

১৯ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



চালের ঘাটতি নেই তবু বাড়ছে দাম

দেশে চালের ঘাটতি না থাকা সত্ত্বেও দফায় দফায় বাড়ছে দাম। ব্যবসায়ীরা নিজেদের মতো করেই দাম বাড়াচ্ছেন। নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে চালের বাজার। মাসখানেক আগে একবার সব ধরনের চালের দাম কেজিতে পাঁচ-ছয় টাকা বাড়ার পর খাদ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে ব্যবসায়ীরা কথা দিয়েছিলেন যে দাম আর বাড়াবেন না। কিন্তু মাস না পেরোতেই চালের দাম আবার বাড়িয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের দাবি, এক মাসের ব্যবধানে প্রতি কেজি চালের দাম এক-দুই টাকা বৃদ্ধি অস্বাভাবিক নয়। নতুন ধান আসার আগে বছরের এ সময়টায় চালের দাম দুই-এক টাকা বেড়েই থাকে বলেও উল্লেখ করেন তাঁরা।

পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী এবং টিসিবির তথ্যানুযায়ী, বেশির ভাগ চালের দামই কেজিতে এক-দুই টাকা বেড়েছে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে। স্বর্ণা (মোটা) চাল পাইকারি বাজারে এক-দুই টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৩৫-৩৬ টাকা দরে। আর খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৩৮-৪০ টাকায়। মিনিকেট ৪৭ থেকে সাড়ে ৪৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে পাইকারি বাজারে। খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৫০-৫২ টাকায়। নাজিরশাইল পাইকারি বাজারে প্রকারভেদে ৪৬-৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৪৮ থেকে ৫৬ টাকা দরে। পারিজা পাইজাম ৩৭-৩৮ টাকা দরে পাইকারি বিক্রি হলেও খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৪২-৪৬ টাকায়। টিসিবির হিসাব অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে মোটা চালের দাম বেড়েছে ১৬ শতাংশ। মোটা চালই সারা দেশের সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি খায়।

রাজধানীর বাবুবাজারের শিল্পী রাইস এজেন্সির মালিক কাওসার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সপ্তাহ দুয়েক আগে থেকে আমরা চাল কেজিপ্রতি এক-দুই টাকা বেশিতে বিক্রি করছি। কারণ মিলাররা আমাদের কাছে বাড়তি দামে চাল বিক্রি করছে। আর নতুন মৌসুমের আগে আগে চালের দাম বৃদ্ধি একটা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ বৈশাখের শুরু বা মাঝামাঝিতে বোরো ধান কাটা শুরু হলে আবার চালের দাম কমে আসবে বলে জানান এ বিক্রেতা। সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারের খুচরা বিক্রেতা হারুন রশিদ বলেন, ‘চালের বাজার বাড়তির দিকে। আমরা কী করব! পাইকারি বাজার থেকে যে দামে কিনে আনতেছি সে অনুযায়ীই বিক্রি করতে হয়। মোটা চালের দাম কেজিতে দুই টাকা বেড়েছে। অন্যগুলোও এক-দুই টাকা করে বেড়েছে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ব্যবসায়ীরা যা করছেন তা মোটেও সমীচীন নয়। কারণ ছাড়া যেভাবে চালের দাম বৃদ্ধি করা হচ্ছে সেটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সরকারকে এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। কারণ ব্যবসায়ীরা কয়েক দিন আগেই খাদ্যমন্ত্রীর কাছে কথা দিয়েছিলেন চালের দাম আর বাড়াবেন না, কারণ কোনো সংকট নেই।’

গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি চালের দাম নিয়ে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। বৈঠক শেষে তিনি জানিয়েছিলেন, চালকল মালিক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণ ধান-চালের সংগ্রহ রয়েছে। তাঁরা কথা দিয়েছেন বৈশাখে নতুন ধান ওঠার আগে আর চালের দাম বাড়াবেন না। বরং নতুন ধান উঠলে চালের দাম আবার স্বাভাবিক হবে।

নওগাঁয় মিল-আড়তে পর্যাপ্ত মজুদ : নওগাঁ থেকে আমাদের প্রতিনিধি ফরিদুল করিম জানান, দেশে ধান-চালের অন্যতম বড় মোকাম নঁওগা জেলায় সব চালকল ও আড়তে ধান-চালের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। এখানে সব মিলিয়ে এক হাজার দুই শর মতো চলকল রয়েছে। আছে ৭০টি অটোমেটেড রাইস মিল ও দেড় শতাধিক হাসকিং মিল। মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব মিলে ধান ও চালের যে মজুদ রয়েছে তা দিয়ে নতুন ধান ওঠার আগ পর্যন্ত চাহিদা মিটবে।

নওগাঁর হাসকিং মিল মালিক ও আড়তদার সালাউদ্দিন খান টিপু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের কাছে যে পরিমাণ ধান সংগ্রহে রয়েছে তা দিয়ে আগামী বৈশাখ পর্যন্ত চলবে। কিন্তু বর্তমানে চালের যে মূল্য তাতেও আমাদের উৎপাদন খরচের সঙ্গে হিসাব করে দেখা যায়, আমরা স্বর্ণা ও মিনিকেট চালে দুই-আড়াই টাকা লোকসান দিচ্ছি।’

নওগাঁ জেলা ধান চাল আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নিরোদ বরণ সাহা চন্দন বলেন, বৈশাখের প্রথম দিকেই বাজারে নতুন ধান আসবে। এ জন্য অনেকেই গত মৌসুমের মজুদ করা ধান থেকে চাল উৎপাদন করছেন দ্রুত গুদামগুলো ফাঁকা করার জন্য। আর এ সময়টাতে প্রতিবছরই দুই-এক টাকা করে দাম বাড়ে নতুন ধান ওঠার আগ পর্যন্ত। এটা অস্বাভাবিক কিছু না। নতুন ধান এলেই আবার কমে আসবে।

কুষ্টিয়ায় ধান না থাকার অজুহাত : কুষ্টিয়া থেকে তারিকুল হক তারিক জানান, স্থানীয় চালকল মালিকরা ধান সংকটের অজুহাত দেখিয়ে চালের দাম বৃদ্ধি করেছেন বলে জানা গেছে। সব ধরনের চালই মিলগেট থেকে পাইকাররা ৫০ পয়সা বেশি দামে কিনছেন। কুষ্টিয়া জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও দাদা আটো রাইস মিলের মালিক জয়নাল আবেদীন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মিল মালিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে লাভ হবে না। কারণ কুষ্টিয়ায় কোনো কৃষকের কাছে এখন এক ছটাকও ধান নেই। ধানের মোকাম হচ্ছে নওগাঁ ও দিনাজপুর। আমরা সেখান থেকে এক শ্রেণির মৌসুমি মজুদদারের কাছ থেকে বেশি দামে ধান কিনছি।’ মৌসুমি মজুদদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান তিনি।



মন্তব্য