kalerkantho


আ ক ম মোজাম্মেল হক

১৯ মার্চই আমরা সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলি

আজিজুল পারভেজ   

১৯ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



১৯ মার্চই আমরা সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলি

১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ পাকিস্তানি সশস্ত্র হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল গাজীপুরের (তখনকার জয়দেবপুর) মুক্তিকামী বাঙালিরা। স্বাধীনতার স্পৃহায় গর্জে ওঠা বীর জনতা নেমে পড়েছিল সম্মুখযুদ্ধে। সেই লড়াইয়ে নেতৃত্ব  দিয়েছিলেন তৎকালীন ছাত্রনেতা আজকের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। তাঁর স্মৃতিতে এখনো জ্বলজ্বল করে সেদিনের সেই সংগ্রামমুখর মুহূর্তগুলো।

আ ক ম মোজাম্মেল হক জানান, ১৯৭১ সালের ১ মার্চ দুপুরে হঠাৎ এক বেতার ভাষণে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেন। ইয়াহিয়ার ঘোষণার প্রতিবাদে ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ সারা বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) হরতাল আহ্বান এবং ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা আহ্বান করেন বঙ্গবন্ধু। এ প্রেক্ষাপটে গাজীপুরে (জয়দেবপুরে) ২ মার্চ রাতে তৎকালীন মহকুমা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাবিব উল্লাহ তৎকালীন থানা পশুপালন কর্মকর্তা আহম্মেদ ফজলুর রহমানের সরকারি বাসায় সর্বদলীয় সভা আহ্বান করেন। সেই সভায় আ ক ম মোজাম্মেল হককে আহ্বায়ক করে এবং মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির শ্রমিক নেতা নজরুল ইসলাম খানকে কোষাধ্যক্ষ করে ১১ সদস্যের সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়।

আ ক ম মোজাম্মেল হক তখন ছাত্রলীগ নেতা। ১৯৬৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। তিনি বলেন, নিউক্লিয়াস বাহিনীর উদ্দেশ্য ছিল সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বাধীন করা, যা মূলত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ১৯৬২ সালেই ছাত্রলীগের মধ্যে গঠিত হয়েছিল।

বাঙালি সেনাদের মধ্যেও নিউক্লিয়াস গঠিত হয়েছিল ১৯৬৪ সালে।

আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, জয়দেবপুরে (গাজীপুরে) সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ৩ মার্চ গাজীপুর স্টেডিয়ামের পশ্চিম পাশের বটতলায় সমাবেশ করে পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পতাকা ধরেছিলেন হারু ভূঁইয়া এবং অগ্নিসংযোগ করেন শহীদউল্যাহ বাচ্চু আর স্লোগান মাস্টার আব্দুস ছাত্তার মিয়া পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে স্লোগান দিতে থাকেন।

স্মৃতিচারণা করে মোজাম্মেল হক বলেন, ‘আমরা ৭ই মার্চ জয়দেবপুর (গাজীপুর) থেকে হাজার হাজার লোক ট্রেনে করে এবং শতাধিক ট্রাক-বাসে করে আরো বহু লোক মাথায় লাল ফিতা বেঁধে সোহরাওয়ার্দী (তৎকালীন রেসকোর্স) উদ্যানে জনসভায় যোগ দিলাম। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। ’ তিনি আরো বলেন, ‘৭ই মার্চে উজ্জীবিত হয়ে আমরা সম্ভবত ১১ মার্চ গাজীপুর সমরাস্ত্র কারখানা (অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি) আক্রমণ করি। গেটে বাধা দিলে আমি হাজার হাজার মানুষের সামনে টেবিলে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করেছি মাইকে। পাকিস্তানিদের বুঝতে পারার জন্য ইংরেজিতে বলি, I do hereby dismiss Brigadier Karimullah from the directorship of Pakistan Ordnance Factory and do hereby appoint Administrative officer Mr Abudul Qader (evOvwj) as the director of the ordnance Factory.’

মোজাম্মেল হক বলেন, ‘এই গর্জনে সত্যি কাজ হয়েছিল। পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার বক্তৃতা চলাকালীনই পেছনের গেট দিয়ে সালনা হয়ে পালিয়ে ঢাকায় চলে যায়। পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার আর পরবর্তীতে ১৫ এপ্রিলের আগে গাজীপুরে যায়নি। পাকিস্তান সমরাস্ত্র কারখানা ২৭ মার্চ পর্যন্ত আমাদের দখলেই ছিল। ’ তিনি জানান, জয়দেবপুরে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করার সংবাদ দিতে গাজীপুরের তিন সদস্যের একটি দল ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাসভবনে যায়। সেদিন বুধবার বঙ্গবন্ধুর জন্ম দিন। লাখ লাখ মানুষের ঢল নেমেছিল ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে। সেই দলে তিনি ছাড়াও ছিলেন সেই নির্বাচনী এলাকার এমএনএ সামসুল হক (পরে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সদস্য) ও নেতা হাবিব উল্লাহ।

সেদিনের স্মৃতিচারণায় মোজাম্মেল হক বলেন, “সন্ধ্যায় আমরা পেছনে দাঁড়িয়ে আছি দেখতে পেয়ে কিছু বলতে চাই কি না বঙ্গবন্ধু জানতে চান। কুর্মিটোলা (ঢাকা) ক্যান্টনমেন্টে অস্ত্রের মজুদ কমে গেছে অজুহাতে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে রক্ষিত অস্ত্র আনার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংবাদ জানাই। সামসুল হক সাহেবের ইশারায় আমি তরুণ হিসেবে এই অবস্থায় আমাদের কী করণীয় জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু বাঘের মতো গর্জে উঠে বললেন, ‘তুই একটা আহাম্মক, কী শিখেছিস যে আমাকে বলে দিতে হবে’। একটু পায়চারি করে বলবেন ‘বাঙালি সৈন্যদের নিরস্ত্র করতে দেওয়া যাবে না।  Resist at the cost of anything.’ নেতার হুকুম পেয়ে গেলাম। ’’

১৯ মার্চের স্মৃতিচারণা করে মোজাম্মেল হক বলেন, সেদিন ছিল শুক্রবার। আকস্মিকভাবে পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার জাহান জেবের নেতৃত্বে পাকিস্তানি রেজিমেন্ট জয়দেবপুরের (গাজীপুর) দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করার জন্য পৌঁছে যায়। একজন জেসিও (নায়েব সুবেদার) জয়দেবপুর হাই স্কুলের মুসলিম হোস্টেলের পুকুরে (জকি স্মৃতির প্রাইমারি স্কুলের সামনে) গোসল করার সময় জানান যে ঢাকা থেকে ব্রিগেডিয়ার জাহান জেব চলে এসেছেন। খবর পেয়ে দ্রুত আমাদের তখনকার আবাসস্থল মুসলিম হোস্টেলে ফিরে গিয়ে উপস্থিত হাবিবউল্ল্যা ও শহিদুল্লাহ বাচ্চুকে জানাই। শহিদুল্লাহ বাচ্চু তখনই রিকশায় চড়ে শিমুলতলীতে, মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি, ডিজেল প্লান্ট ও সমরাস্ত্র কারখানায় শ্রমিকদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে জয়দেবপুরে চলে আসার খবর দিয়ে দেন। এক ঘণ্টার মধ্যেই হাজারো শ্রমিক জনতা চারদিক থেকে লাঠিসোঁটা, দা, কাতরা, ছেন, দোনালা বন্দুকসহ জয়দেবপুর উপস্থিত হয়।

মোজাম্মেল হক জানান, সেদিন জয়দেবপুর হাটের দিন ছিল। জয়দেবপুর রেলগেটে মালগাড়ির বগি, রেলের অকেজো রেললাইন, স্লিপারসহ বড় বড় গাছের গুঁড়ি, কাঠ, বাঁশ, ইট ইত্যাদি যে যেভাবে পেরেছে তা দিয়ে এক বিশাল ব্যারিকেড দেওয়া হয়। জয়দেবপুর থেকে চৌরাস্তা পর্যন্ত আরো পাঁচটি ব্যারিকেড দেওয়া হয়, যাতে পাকিস্তানি বাহিনী অস্ত্র নিয়ে ফেরত যেতে না পারে। দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ছিলেন মেজর কে এম সফিউল্লাহ (পরে প্রধান সেনাপতি)। আমরা যখন ব্যারিকেড দিচ্ছিলাম তখন টাঙ্গাইল থেকে রেশন নিয়ে একটি কনভয় জয়দেবপুর আসছিল। ওই রেশনের গাড়িকে জনতা আটকে দেয়। সেই কনভয়ে থাকা পাঁচজন সৈন্যের চায়নিজ রাইফেল তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়।

মোজাম্মেল হক আরো জানান, এদিকে রেলগেটের ব্যারিকেড সরানোর জন্য দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গলের রেজিমেন্টকে ব্রিগেডিয়ার জাহান জেব আদেশ দেন। কৌশল হিসেবে বাঙালি সৈন্যদের সামনে দিয়ে পেছনে পাঞ্জাবি সৈন্যদের অবস্থান করিয়ে মেজর সফিউল্লাহকে জনতার ওপর গুলিবর্ষণের আদেশ দেয়। বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা আমাদের/জনতার ওপর গুলি না করে আকাশের দিকে গুলি ছুড়ে সামনে আসতে থাকলে আমরা বর্তমান গাজীপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ওপর অবস্থান নিয়ে বন্দুক ও চায়নিজ রাইফেল দিয়ে সেনাবাহিনীর ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করি। তিনি বলেন, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুলিতে জয়দেবপুরে শহীদ হন নেয়ামত ও মনু খলিফা, আহত হন চতরের সন্তোষ, ডা. ইউসুফসহ শত শত বীর। পাকিস্তানি বাহিনী কারফিউ জারি করে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ শুরু করলে আমাদের প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। আমরা পিছু হটলে দীর্ঘ সময় চেষ্টা করে ব্যারিকেড পরিষ্কার করে ব্রিগেডিয়ার জাহান জেব চান্দনা চৌরাস্তায় এসে আবার প্রবল বাধার সম্মুখীন হয়। নাম করা ফুটবল খেলোয়াড় হুরমত এক পাঞ্জাবি সৈন্যকে পেছন থেকে আক্রমণ করেন। আমরা সৈন্যের রাইফেল কেড়ে নিই। কিন্তু পেছনে আরেক পাঞ্জবি সৈন্য হুরমতের মাথায় গুলি করলে হুরমত সেখানেই শহীন হন। বর্তমানে সেই স্থানে চৌরাস্তার মোড়ে ‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’ নামে ভাষ্কর্য।

মোজাম্মেল হক জানান, ১৯ মার্চের পর সারা বাংলাদেশে স্লোগান ওঠে, ‘জয়দেবপুরের পথ ধর-বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘জয়দেবপুরের পথ ধর-সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু কর’।


মন্তব্য