kalerkantho


মুস্তাফিজ সাকিবে জয়ের হাতছানি

১৯ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



মুস্তাফিজ সাকিবে জয়ের হাতছানি

পি সারায় অসাধারণ বোলিংয়ে ম্যাচের বাঁক বদলে দেওয়ার দুই রূপকার মুস্তাফিজ ও সাকিব। ছবি : মীর ফরিদ

মধ্যাহ্নভোজের বিরতির আগে এবং বিরতির পরে। বাংলাদেশের শততম টেস্টের চতুর্থ দিনটিকে আগে এই দুই ভাগে ভাগ করে নেওয়া যাক।

বিরতির আগের সময়টি ম্যাচের লাগাম বাংলাদেশের হাত থেকে প্রায় ছুটে যাওয়ার। আর বিরতির পরের সময়টা শ্রীলঙ্কার মুঠো গলে আবার সেটি সফরকারীদের মুঠোয় ফিরে আসার। যে ফিরে আসার মাধ্যমে অলিগলি পেরিয়ে এখন জয়ের মহাসড়কও দেখতে পাচ্ছেন মুশফিকুর রহিমরা।

যে মহাসড়ক ধরে গেলে গন্তব্যও খুব দূরের নয়। আজ পঞ্চম দিনে ব্যাটিংয়ে নামার সময় শ্রীলঙ্কার স্বীকৃত কোনো ব্যাটসম্যানই অবশিষ্ট নেই। তবে তাদের ব্যাটিংয়ের লেজটাও ছেঁটে ফেলা জরুরি। কারণ টেল এন্ডার দিলরুয়ান পেরেরাই উইকেটে পার করে দিয়েছেন ১২৬ বল। এর পরও ৮ উইকেটে ২৬৮ রান নিয়ে চতুর্থ দিন শেষ করা স্বাগতিকদের লিডও ১৩৯ রানের বেশি নয়। শেষ দিনে তাই প্রথম লক্ষ্য লঙ্কানদের সাধ্যের বাইরে যেতে না দিয়ে দ্রুতই বাকি উইকেট দুটি তুলে নেওয়া।

মধ্যাহ্নভোজ আর চা বিরতির মাঝখানে শ্রীলঙ্কার ব্যাটিং মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়ে বাংলাদেশকে চালকের আসনে ফেরানোর মূল চালিকাশক্তি সেই মুস্তাফিজুর রহমান, টেস্ট ম্যাচ জেতার জন্য যাঁর উপস্থিতি বাংলাদেশ শিবিরের কাছে বাধ্যতামূলকই। মিলিয়ে যেতে যেতে আবার দেখা দেওয়া জয়ের সম্ভাবনাটা তৈরি হয় তাঁর বোলিংয়েই। তবে মধ্যাহ্নভোজ সেরে এসে ৭ ওভারের এক জাদুকরি স্পেলে এই বাঁহাতি পেসার একাই ম্যাচ পরিস্থিতি বদলে দিয়েছেন বললেও ভুল হবে। স্বাগতিকদের কোণঠাসা করার ক্ষেত্রে মূল চরিত্র না হলেও সাকিব আল হাসান পার্শ্বচরিত্র তো বটেই। এক প্রান্তে মুস্তাফিজ তো আরেক প্রান্ত থেকে চাপ দিয়ে যেতে থাকেন সাকিবও। দুইয়ে মিলে দিনের প্রথম সেশন বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই পার করে দেওয়া লঙ্কান ব্যাটিং বেসামাল হতে শুরু করে আয়েশেই খাওয়াদাওয়া করে ফেরার পর থেকেই।

তাতে একপর্যায়ে ৪৭ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ধুঁকতে থাকা রঙ্গনা হেরাথের দলের কাছে স্রেফ ১০০ রানের লিডও তখন অনেক দূরের স্বপ্ন হয়ে ওঠে। অথচ ১ উইকেটে ১৩৭ রান নিয়ে মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে যাওয়ার সময় কে ভাবতে পেরেছিল যে একটু পরেই খাদের কিনারে গিয়ে দাঁড়াবে শ্রীলঙ্কা। কিন্তু এই সিরিজের স্বাগতিক আর বাংলাদেশের মধ্যে একটা মৌলিক পার্থক্যও আছে। লঙ্কানদের ব্যাটিং অর্ডারের প্রথম পাঁচ ব্যাটসম্যানের কেউ না কেউ ঠিক দাঁড়িয়ে যান। গলে দুই ইনিংসে যেমন দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন কুশল মেন্ডিস ও উপল থারাঙ্গা। পি সারায় এমনকি টেল এন্ডারদের নিয়েও প্রথম ইনিংসে দলকে বেশ খানিকটা এগিয়ে দিয়েছিলেন দীনেশ চান্ডিমাল। দ্বিতীয় ইনিংসে সেই একই দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন ওপেনার দিমুথ করুণারত্নে।

পঞ্চম উইকেট পড়ার সময়ও তিন অঙ্কের ম্যাজিক ফিগারে না পৌঁছানো এ ব্যাটসম্যান নিজের পঞ্চম টেস্ট সেঞ্চুরিতে তো পৌঁছালেনই, টেল এন্ডার পেরেরাকে নিয়ে ৮৬ মিনিটে পার করে দিলেন বাংলাদেশের সাফল্যহীন ২২টি ওভারও। সুবাদে বাড়তে থাকা অস্বস্তি থেকেও মুক্তি মেলে সাকিবের বলে। অফ স্টাম্পের বাইরের টার্ন না করা বল সামনে বেড়ে খেলতে যান করুণারত্নে (১২৬), কিন্তু বল ব্যাটের বাইরের কানা নিয়ে যায় স্লিপ ফিল্ডার সৌম্য সরকারের হাতে। তাতেই যেন জয়ের সঙ্গে দূরত্ব আরেকটু ঘুচে যায়, বাংলাদেশ দলের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস তো বলছিল সে কথাই।

অথচ দিনের দ্বিতীয় ওভারের প্রথম বলেই উপল থারাঙ্গাকে (২৬) টার্নে পরাস্ত করে মেহেদি হাসান মিরাজ ওপেনিং জুটি ভাঙার পর কত লম্বা সময়ই না এমন আরেকটি সাফল্যের জন্য অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে মুশফিকদের! সেই অপেক্ষা শেষ হয় মধ্যাহ্নভোজের বিরতির পর দ্বিতীয় ওভারে মুস্তাফিজ বোলিংয়ে ফিরতেই। তিনি ফিরে অ্যাঙ্গেল বদলানোর জন্য রাউন্ড দ্য উইকেটে বোলিং শুরু করলেন। তাতে ওভারের শেষ বলেই সাফল্য। যদিও কুশল মেন্ডিসের (৩৬) বিপক্ষে কট বিহাইন্ডের আবেদন সফল করতে ‘রিভিউ’ নিতে হয় বাংলাদেশকে। অবশ্য মুস্তাফিজ-মুশফিক কম্বিনেশনে বল চান্ডিমালের (৫) ব্যাট ছুঁয়ে গিয়েছিল কি না, তা নিয়ে কোনো সংশয়েরই অবকাশ ছিল না। মুস্তাফিজ সেখানেই থামেননি, তাঁর অফ স্টাম্পের বাইরের বল চালাতে গিয়ে ধনঞ্জয়া ডি সিলভাও (০) জমা হন মুশফিকের গ্লাভসে।

এর আগে-পরে সাকিবও যোগ দিয়ে ফেলেন শিকারযজ্ঞে। আসেলা গুণারত্নে (৭) কোনো শট অফার না করে হন এলবিডাব্লিউ, আর প্যাডেল সুইপ খেলতে গিয়ে উইকেটের পেছনে মুশফিকের দুর্দান্ত ক্যাচে পরিণত হন নিরোশান ডিকওয়েলাও (৫), যা মুশফিকের শততম ডিসমিসালও। অধিনায়কের ডিসমিসালের সেঞ্চুরির আগেই মুস্তাফিজের স্পেলটি (৭-১-২৪-৩) লঙ্কানদের সর্বনাশের পথ খুলে দেয়। মধ্যাহ্নভোজের পর সাকিবের স্পেলে (১২-১-৩১-২) সে বিপর্যয় আরো ঘনীভূত হয় স্বাগতিকদের। শেষ পর্যন্ত ৬১ রানে ৩ উইকেট পাওয়া সাকিব আরেকটি কাজও করেছেন। করুণারত্নেকে ফিরিয়ে প্রতিপক্ষকে সাধ্যের মধ্যে রাখার পথও সুগম করেছেন।

২০০৯ সালে গ্রেনাডায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে নিজেদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২১৬ রান তাড়া করে জেতার ঘটনা আছে বাংলাদেশের। তবে পি সারায় লঙ্কানরা ২০০-র কাছাকাছি চলে গেলে এবং উইকেটও শেষ দিনে স্পিন উপযোগী হয়ে উঠলে হেরাথদের সামলানোর ঝুঁকি থাকছে। সে জন্যই আজ লঙ্কান ইনিংসের লেজটা দ্রুত ছেঁটে দেওয়ার তাড়া।

মধ্যাহ্নভোজের বিরতির আগে অবশ্য দল এই জায়গায় পৌঁছবে বলে মনেই হচ্ছিল না। বিরতির পর থেকে পৌঁছতে শুরু করল, তবে সে কৃতিত্বে মুস্তাফিজের ভাগীদার সাকিবও। দুজনের বোলিংয়ে শততম টেস্টে জয়ের স্বপ্নে রঙিন বাংলাদেশও!


মন্তব্য