kalerkantho

26th march banner

কোণঠাসা জঙ্গিদের আত্মঘাতী ছক

এস এম আজাদ   

১৯ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



কোণঠাসা জঙ্গিদের আত্মঘাতী ছক

দেশের নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠনগুলোর হামলার ধরনে পরিবর্তন এসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভিন্নমতাদর্শীদের হত্যার পর বিদেশি হত্যা, স্থাপনায় হামলা, পুলিশ চেকপোস্টে হামলা চালিয়ে হত্যা এবং প্রিজন ভ্যানে হামলা চালিয়ে আসামি ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে জঙ্গিরা। অতি সম্প্রতি তারা ব্যাপক হারে আত্মঘাতী হয়ে উঠেছে। প্রথম দিকে অভিযানের সময় আত্মহত্যা করলেও এখন তারা শক্তিশালী বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মঘাতী হচ্ছে। জঙ্গিদের এমন আচরণ পরিবর্তনের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে গোয়েন্দা ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, একের পর এক অভিযান আর কড়া নজরদারির কারণে ক্রমে কোণঠাসা হয়ে পড়া জঙ্গি ও তাদের মদদদাতারা নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে এবং এ দেশে ‘জঙ্গি আছে’ প্রমাণ করতেই এখন আত্মঘাতী হামলার কৌশল নিয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো কালের কণ্ঠকে বলেছে, ধারাবাহিক অভিযানে নেতৃত্বহীন হয়ে পড়া নব্য জেএমবির জঙ্গিরা ঘর ছেড়ে ডেরায় আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু তারা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তীক্ষ নজরদারির কারণে হামলা চালাতে পারছে না। তারা মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে জঙ্গি দলে যোগও দিতে পারছে না। গুলশান হামলার পর অভিযানে নব্য জেএমবির শীর্ষস্থানীয় নেতারা নিহত ও গ্রেপ্তারের ফলে তাদের দেশীয় নেটওয়ার্কও ভেঙে গেছে। তবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটের সীমান্ত এলাকা, যশোর ও ঝিনাইদহে ডেরায় আছে বেশ কিছু জঙ্গি। কুমিল্লায় দুই জঙ্গিকে গ্রেপ্তারের পর চট্টগ্রামে জঙ্গিদের তিনটি আস্তানার সন্ধান পায় পুলিশ। সেখানে গোপনে তৈরি হয়েছে বেশ কিছু শক্তিশালী বোমা। এমন কিছু বোমা নিয়ে কয়েকজন জঙ্গির আত্মগোপনে থাকার তথ্যও পেয়েছে গোয়েন্দারা। সর্বশেষ রাজধানীর আশকোনায় র‌্যাবের ব্যারাক ও খিলগাঁওয়ে র‌্যাবের চেকপোস্টের ঘটনায় জঙ্গিদের আত্মঘাতী হয়ে ওঠার নতুন কৌশল ধরা পড়ে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগে হামলায় ব্যবহূত হ্যান্ড গ্রেনেডগুলোর চেয়ে বড় ও শক্তিশালী বোমা এখন সুইসাইডাল ভেস্টে ব্যবহার করছে জঙ্গিরা। দুই বছর আগে রাজধানীর মিরপুরে একটি আস্তানায় বোমার মজুদ পাওয়া গেলেও এরপর আর মজুদের সন্ধান পায়নি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এখন পুরনো প্রযুক্তিতে বড় আকারের বোমা বানিয়েছে জঙ্গিরা। এসব বোমা বিকট শব্দ করার পাশাপাশি প্রাণহানি নিশ্চিত করতে পারে বলে জানান বোমা বিশেষজ্ঞরা। গোয়েন্দারা বলছেন, নব্য জেএমবির জঙ্গিদলে ‘বায়াত’ নেওয়ার সময়ই অভিযান বা ‘বিপদের সময়’ গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মাহুতি দেওয়ার কৌশল শেখানো হয়। প্রতিটি জঙ্গি তার পরিবারের নারী ও শিশুদেরও এই প্রশিক্ষণ দিয়েছে। অন্য কোনো উপায় না থাকায় সেই কৌশল কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে জঙ্গি তত্পরতা আছে বলে প্রমাণ করতে চায় আত্মাহুতি দেওয়া জঙ্গিরা। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মঘাতী হামলার অর্থ হচ্ছে নিজে জীবন দিয়ে প্রাণ বা স্থাপনার ক্ষতি করা। তবে এখনকার জঙ্গিরা সেই অর্থে আত্মঘাতী নয়। জীবন দিলে বেহেশতে যাওয়া যাবে—এমনটি বুঝিয়ে তাদের মগজ ধোলাই করা হয়েছে। ফলে তারা কাউকে হত্যা করে নয়, সরকারি সংস্থা বা দপ্তরের কাছে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে অস্তিত্ব জানান দিতে চাইছে।

এমন পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন নিরাপত্তা ও অপরাধ বিশ্লেষকরা। তাঁরা বলছেন, সাম্প্রতিক আত্মঘাতী হামলার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য বা পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশেও আত্মঘাতী জঙ্গি আছে বলে প্রচার করা হচ্ছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার এম সাখাওয়াত হোসেন গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চাপের মুখে পড়ে ঘটনা ঘটিয়ে ফোকাস পাওয়াটাই এখন জঙ্গিদের টার্গেট। জঙ্গি সংগঠনগুলোর টার্গেট সব সময়ই থাকে যে জায়গা থেকে তারা সবচেয়ে বেশি প্রপাগান্ডা ভ্যালুটা পাবে সেখানে ঘটনা ঘটানো। তাই এখন সদস্যদের নিজে মরে কোথাও অ্যাটাক করার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘‘আমি মনে করি এটা তৃতীয় ধাপ। প্রথমে তারা সদস্য সংগ্রহ করেছে। তারপর মোটিভেট করেছে। এখন ‘লোন উলফ’ বা ‘সিঙ্গেল অ্যাটাকে’ যাচ্ছে। আমরা আগে থেকেই এ ধরনের হামলার আশঙ্কা করছিলাম। ”

আরেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশীদ বলেন, জঙ্গিদের এই আত্মঘাতী হয়ে ওঠা এটা প্রমাণ করে যে তারা দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাদের পক্ষে পুরনো সদস্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। নতুন জঙ্গি সংগ্রহ করতেও পারছে না। তাই আত্মহননের মাধ্যমে কর্মকাণ্ড দেখাতে চাইছে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ এখনো পাকিস্তান, সিরিয়া বা আফগানিস্তানের মতো হয়ে যায়নি। এখানে আত্মঘাতী হামলা চালানো সহজ নয়। আত্মঘাতী হামলা বলতে যা বুঝায় সেটা তারা আগেও করতে চেয়েছে। কিন্তু রাজশাহীর আহমেদিয়া মাদরাসাসহ অনেক স্থানে সফল হয়নি। তারা যে ভবিষ্যতে পারবে না সেটা বলা যায় না। তাই পলাতক জঙ্গি ও তাদের নেটওয়ার্ক নিয়ে গভীরভাবে কাজ করতে হবে। ’

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া গতকাল ধানমণ্ডির সুফিয়া কামাল কমপ্লেক্সে এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘এসব হামলার আগাম তথ্য আমাদের কাছে ছিল। দেশে আইএসের কোনো অস্তিত্ব নেই, তবে তাদের মতাদর্শ অনুসারীরা আছে। তারাই দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। ধর্মের অপপ্রচার করে নাশকতা চালানো হচ্ছে। এসব ঘটনায় আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এগুলো মোকাবেলায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা প্রস্তুত রয়েছেন। ’ 

গত শুক্রবার রাজধানীর আশকোনায় র‌্যাবের ব্যারাকে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে এক জঙ্গি নিহত হয়। গতকাল ভোরে খিলগাঁওয়ের শেখের জায়গায় র‌্যাবের চেকপোস্টে গুলিতে নিহত হয় এক যুবক। তার শরীরে বোমাসহ সুইসাইডাল ভেস্ট পাওয়া গেছে।

জঙ্গিদের হাতে এখন শক্তিশালী বোমা : পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের একাধিক সূত্র জানায়, সম্প্রতি চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার চার জঙ্গিকে জিজ্ঞাসাবাদে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, যশোরসহ ছয়টি এলাকায় নব্য জেএমবির কিছু ‘সেফ হোম’ আছে। সেখানে আত্মগোপনে আছে অনেক তরুণ। সেখান থেকে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে নজরদারির কারণে তারা দেশে বা দেশের বাইরের কোনো স্থানে যেতে পারছে না। তাদের আস্তানায় বেশ কিছু শক্তিশালী বোমা তৈরি হয়েছে। তারা এখন কিছু করতে না পেরে আত্মঘাতী হতে চাইছে। সম্প্রতি নব্য জেএমবির বোমা ও অস্ত্র সরবরাহকারী বড় মিজান সিটিটিসির হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য মিলেছে—হাদীসুর রহমান সাগর, আব্দুস সামাদ মামু ওরফে আরিফ, ছোট মিজান, সোহেল মাহফুজসহ কয়েকজন অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরবরাহকারী আছে নব্য জেএমবির। তারা প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে এসব অস্ত্র ও উপাদান নিয়ে আসে। গুলশান হামলার সংগঠক মুসাসহ বেশ কয়েকজন জঙ্গি এখনো অধরা আছে।

সূত্র জানায়, কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গি ইমতিয়াজ অমি ওরফে আজওয়াদ ও মাহমুদ হাসান পুলিশকে জানায়, গ্রেপ্তারের আগেই তারা দুই দফায় ১২টি বোমা ঢাকায় পৌঁছে দিয়েছিল। নব্য  জেএমবির প্রশিক্ষণ নিয়েছে এ ধরনের পাঁচটি গ্রুপে অন্তত ২৫ সদস্য আছে। তাদের বেশির ভাগ দেশের ভেতরেই আছে। এদিকে গত এক বছরে নিখোঁজ রয়েছে এমন অর্ধশতাধিক যুবকের তালিকা আছে পুলিশ ও র‌্যাবের কাছে। তাদের মধ্যে বেশ কিছু যুবক ইরাক ও সিরিয়ায় চলে গেছে। তবে দেশ ছাড়তে পারেনি এমন গৃহত্যাগীর সংখ্যাই বেশি।

জানতে চাইলে সিটিটিসি ইউনিটের ডিসি মুহিবুল ইসলাম খান বলেন, অভিযানের পরও কিছু জঙ্গি হয়তো সংঘবদ্ধ হয়েছে। অনেক দিন ধরে যারা পলাতক ছিল তারাও নতুনভাবে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। যারা পলাতক আছে, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।  

সিটিটিসি ইউনিটের স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের অতিরিক্ত উপকমিশনার এবং বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের প্রধান ছানোয়ার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আশকোনা বা খিলগাঁওয়ের বোমা আমি দেখিনি। তবে চট্টগ্রামের বোমা অনেক বড়। ভেস্টে যেসব বোমা ব্যবহার করা হয়েছে তা-ও আপডেটেড। এক জঙ্গি চার-পাঁচ কেজি ওজনের বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মারা যায়। প্রযুক্তি এক হলেও এ ধরনের বোমা আগে দেখা যায়নি। এগুলো অনেক বেশি শক্তিশালী। মনে হয়েছে, দক্ষ কোনো কারিগর দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। ’

আত্মঘাতী হওয়াই এখন কৌশল : একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশব্যাপী বোমা হামলার পর জেএমবি গাজীপুরের আইনজীবী সমিতি ও চট্টগ্রামের আদালতে আত্মঘাতী হামলা চালিয়েছিল। এরপর নেত্রকোনায় উদীচী কার্যালয়ে একটি বিস্ফোরণে বেশ কয়েকজন মানুষের প্রাণহানি ঘটে, যা আত্মঘাতী হামলা বলে ধারণা করা হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জঙ্গিদের হামলায় আত্মঘাতী হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়নি। নব্য জেএমবির নতুন কৌশলে আত্মঘাতী হওয়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলছেন, ‘এদের আত্মঘাতী হওয়ার সিদ্ধান্ত বায়াত নেওয়ার সময়ই হয়। কারণ তাদের বোঝানো হয়, এভাবে মরলে বেহেশত নিশ্চিত। এখন তারা মরে এবং ঘটনা ঘটিয়ে এখানে জঙ্গি আছে বলে জানান দিচ্ছে। তাদের পেছনে যারা আছে তারাও সেটি চাইছে। ’

র‌্যাব ও সিটিটিসি সূত্র জানায়, রাজধানীতে পর পর দুই দিন দুটি ঘটনাই পরিকল্পিত। হামলার ধরন দেখে নব্য জেএমবির কাজ বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গি আস্তানা থেকে যে ধরনের সুইসাইডাল ভেস্ট উদ্ধার করা হয়েছিল, ঢাকার হামলাকারীর গায়েও ছিল একই ভেস্ট।


মন্তব্য