kalerkantho


নুরুল ইসলাম মানিক

গল্লামারী ও বারোয়াড়িয়ার যুদ্ধস্মৃতি এখনো তাড়িয়ে বেড়ায়

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

১৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



গল্লামারী ও বারোয়াড়িয়ার যুদ্ধস্মৃতি এখনো তাড়িয়ে বেড়ায়

‘হঠাৎ আক্রমণ করে আবারও নিরাপদে ফিরে আসা—এই ছিল আমাদের যুদ্ধের কৌশল। এ কারণে আমাদের গ্রুপটি ডুমুরিয়া গ্রুপ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। তবে দুটো যুদ্ধের ঘটনা আজও আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। মনে হলে শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে। একটি গল্লামারী বেতার কেন্দ্রের যুদ্ধ, আরেকটি বারোয়াড়িয়ার যুদ্ধ। গল্লামারীর যুদ্ধে আমাদের বড় কোনো ক্ষতি না হলেও বারোয়াড়িয়ার যুদ্ধে ঘনিষ্ঠ দুই সহযোগীকে হারাই। ’

কথাগুলো বলেন কমান্ডার নুরুল ইসলাম মানিক। যুদ্ধকালে একটি গ্রুপকে নেতৃত্ব দেওয়ায় তিনি কমান্ডার নামে পরিচিতি পান। সবাই তাঁকে চেনে কমান্ডার মানিক নামে। তিনি যে গ্রুপটিকে নেতৃত্ব দেন ৯ নম্বর সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধাদের ওই গ্রুপটিকে বলা হতো ডুমুরিয়া গ্রুপ। এ গ্রুপের সব সদস্যের বাড়ি ছিল ডুমুরিয়ায়।

কমান্ডার মানিক জানান, মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি ছিলেন ২৪-২৫ বছরের যুবক। দেশকে শত্রুমুক্ত করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। সঙ্গে নিয়েছিলেন বন্ধুদের। এর আগে তিনি আইয়ুব খানের মুজাহিদ বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন, এ কারণে আগ্নেয়াস্ত্র পরিচালনা করতে পারতেন। জানা ছিল আত্মরক্ষার কৌশল। একাত্তরের শুরুতেই বন্ধুদের উদ্বুদ্ধ করে একটি দল গঠন করেন। তাঁদের আত্মরক্ষার নানা কৌশল শেখান। একাত্তরের ২৫ মার্চের কালরাতের পর যখন চারদিকে পাকিস্তানি সেনারা আক্রমণ করতে শুরু করল, আর তাদের এদেশীয় দোসররা লুটপাট চালাতে লাগল, তখন তাঁরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু পেরে ওঠেননি। তখন বন্ধুদের নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে ঠাঁই নেন।

ভারতে গিয়ে সেখানকার বিএসএফের সহায়তায় তাঁরা সীমান্ত এলাকায় পাকিস্তানি সেনাছাউনিগুলোয় অনেকবার আক্রমণ করেন। তখনই ডুমুরিয়া বাহিনীর নাম ছড়িয়ে পড়ে। এর বেশ কিছুদিন পর ভারতের দেরাদুনে প্রশিক্ষণ নিয়ে জুলাইয়ের দিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। এখানে তাঁরা পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকার বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি যুদ্ধ করেন। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে খুলনার গল্লামারী বেতারকেন্দ্র ঘিরে পাকিস্তানি সেনারা যে ঘাঁটি গড়ে তুলেছিল, সেখানে আক্রমণ করে এ দলটি। ডিসেম্বরের ১৫-১৬ তারিখের ঘটনা এটি। যদিও ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণ করে, কিন্তু গল্লামারীতে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে ব্যাপক যুদ্ধ হয়। অদূরে শিরোমণিতেও মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাদের যুদ্ধ চলে।

মানিক বলেন, ‘আমরা ৪০ জনের মতো মুক্তিযোদ্ধা রেডিও স্টেশন তথা পাকিস্তানি সেনাদের ঘাঁটি আক্রমণের জন্য যাই। পরিকল্পনা ছিল গ্রেনেড মেরে ঘাঁটি উড়িয়ে দেওয়া। কিন্তু পাকিস্তানি সেনাদের প্রতিরোধ আমাদের পরিকল্পনা ভণ্ডুল করে দেয়। ’

বর্তমানে ওই এলাকাটিতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। তখন এলাকাটি ছিল প্রায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন নিচু জমি, ধান হতো সেখানে। পাশের ময়ূর নদী ছিল খুব খরস্রোতা। পাকিস্তানি সেনাদের ঘাঁটি রেডিও স্টেশনটি (বর্তমানে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন) ঘিরে ছিল কাঁটাতারের বেড়া। আর ছিল সার্চলাইট। ওই লাইট ঘুরিয়ে দেখে দেখে পাকিস্তানিরা মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর গুলি করতে থাকে। ঘণ্টা তিনেক দুই পক্ষের মধ্যে গুলিবিনিময় হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের দলটি কাঁটাতার পার করে মূল ঘাঁটি এলাকায় প্রবেশ করতে পারেনি। এরই মধ্যে নদীতে জোয়ার আসে। জোয়ারের পানি খাল হয়ে বিলের মধ্যে এসে পড়ে। বিলের পানি উঁচু হতে থাকে। মানিকের দলটি পানিতে থেকে যুদ্ধ করতে অসুবিধায় পড়ে। অগত্যা বিলের পানিতে ভাসতে ভাসতে একপর্যায়ে ধীরে ধীরে পিছু হটে।

আর বটিয়াঘাটা থানাধীন বারোয়াড়িয়া এলাকাটি বাজার ও লঞ্চঘাটের জন্য বেশ পরিচিত ছিল। বটিয়াঘাটা থানা সদর থেকে এর দূরত্ব ৩০ কিলোমিটারের মতো, পাইকগাছা থানা সদর থেকে দূরত্ব ২০ কিলোমিটারের মতো। সেখানকার মনি গোলদারের দোতলা বাড়িতে রাজাকাররা ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করে গোটা এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে। ইচ্ছামতো হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের ওপর আক্রমণ, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ ও নারী নির্যাতন চালাতে থাকে।

মুক্তিযোদ্ধা কামরুজ্জামান টুকুর নেতৃত্বে ২০ নভেম্বর ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল বারোয়াড়িয়া রাজাকার ক্যাম্পে আক্রমণের জন্য পাইকগাছা থেকে রওনা দেয়। বটিয়াঘাটার মুক্তিযোদ্ধা বিনয়ের নেতৃত্বে ১৪-১৫ জনের একটি দলও বারোয়াড়িয়ায় যায়। কামরুজ্জামান টুকুর দলে ছিলেন কমান্ডার মানিক। এই দুটো দল সম্মিলিতভাবে দুই ভাগে ভাগ হয়ে রাজাকার ক্যাম্পটি ঘিরে ফেলে। মুক্তিযোদ্ধারা রাজাকারদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানায়। পরিবর্তে রাজাকাররা গুলি ছোড়ে। দুই পক্ষে প্রচণ্ড গোলাগুলি হয়।

একপর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের চারজনের একটি ছোট গ্রুপ ডেটোনেটর ব্যবহার করে ক্যাম্প ভবনটির দোতলার অংশ উড়িয়ে দেয়। ঘণ্টা দুই গোলাগুলির পর রাজাকাররা কাবু হয়। এখানেই মুক্তিযোদ্ধা মৌখালির আজিজ ও বটিয়াঘাটার জ্যোতিষ শহীদ হন। ঘটনাস্থলে চার-পাঁচজন রাজাকারও মারা পড়ে। মুক্তিযোদ্ধারা পরে শতাধিক রাজাকারের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। এ ক্যাম্প থেকেই উদ্ধার করা হয়েছিল গুরুদাসী মণ্ডলকে, যার স্বামী গুরুপদ ও সন্তানদের রাজাকাররা নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল।


মন্তব্য