kalerkantho


শিশুদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী

দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবাসবে

সারা দেশে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উদ্‌যাপন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবাসবে

বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে টুঙ্গিপাড়ায় শিশু সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবার প্রতি দেশকে ভালোবাসার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে শিশুদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘এখানে জাতির পিতার জন্ম, এখানেই তিনি ঘুমিয়ে আছেন।

তোমরা এ মাটির সন্তান। তোমাদের তাঁর আদর্শ নিয়ে গড়ে উঠতে হবে। দেশকে ভালোবাসবে, দেশের মানুষকে ভালোবাসবে। নিজেকে সুন্দর করে গড়ে তুলবে, যাতে ভবিষ্যতে আমার মতো প্রধানমন্ত্রী বা বড় কিছু হতে পারো। ’ গতকাল শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টায় মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধ মসজিদ কমপ্লেক্সে এ সমাবেশ হয়।

হাজার বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৮তম জন্মদিন ছিল গতকাল। দিনটি জাতীয় শিশু দিবস হিসেবেও পালিত হয়। এ উপলক্ষে সারা দেশে নানা আয়োজনে জাতি এই মহামানবের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা-ভালোবাসা জানায়। কর্মসূচির মধ্যে ছিল মহানায়কের প্রতিকৃতিতে

পুষ্পস্তবক অর্পণ, কেককাটা, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল, আলোচনা সভা, শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বইমেলা, স্বেচ্ছায় রক্তদান, বিনা মূল্যে চিকিৎসা, পুরস্কার বিতরণ, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা।

দিবসের তাত্পর্য তুলে ধরে টেলিভিশন ও বেতার বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করে। সংবাদপত্রগুলোয় বিশেষ ক্রোড়পত্র ও নিবন্ধ প্রকাশ করা হয়। দেশের সব সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সকাল সাড়ে ৮টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত বিশেষ সেবাদান কর্মসূচি পালন করা হয়। রোগীদের উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হয়।

ভোর সাড়ে ৬টায় জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে দিনের কর্মসূচি শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকাল ৭টায় ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে সভাপতি হিসেবে দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করেন। ওই সময় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু ও তোফায়েল আহমেদ, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী ও অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ও এনামুল হক শামীম, প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ, দপ্তর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর ও দক্ষিণ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগ, কৃষক লীগ, তাঁতী লীগের পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও জাসদ সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতারের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ১৪ দলের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য দেওয়া হয়। এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়।

সকাল ১০টায় গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এরপর তাঁরা কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় বিউগলে বেজে ওঠে করুণ সুর। বাংলাদেশ সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার প্রদান করে।

বঙ্গবন্ধু এবং সেই সঙ্গে ১৫ আগস্টের অন্য শহীদদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে ফাতেহা পাঠ ও মোনাজাত করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী সমাধি প্রাঙ্গণে ‘খোকা থেকে বঙ্গবন্ধু’ শিরোনামে বইমেলা ও আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন।

গোপালগঞ্জ থেকে আমাদের প্রতিনিধি জানান, টুঙ্গিপাড়ার শিশু সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী আভিভাবকদের উদ্দেশে বলেন, প্রত্যেক আভিভাবক ও শিক্ষক শিশুদের খোঁজখবর রাখবেন। তারা যেন বিপথগামী না হয়, কোনো ধরনের অপরাধ বা জঙ্গি কর্মকাণ্ডে যেন না জড়ায়। তিনি বলেন, জাতির পিতা শিশুকাল থেকে শিশুদের জন্য জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন। এ তথ্য সব শিশুকে জানাতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিশুদের সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হবে। পড়াশোনার পাশাপাশি তাদেরকে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে হবে। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে হবে, তাদের সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ধর্মীয় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেছি; কিন্তু ধর্মান্ধতা যেন না আসে। ধর্ম মানুষকে খুন করার অধিকার দেয়নি। প্রত্যেক ধর্ম শান্তির বাণী প্রচার করে। ’

বন্ধুবন্ধুর স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ‘পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট আমি মা, বাবা, ভাই—সকলকেই হরিয়েছিলাম। আমি চাই না কোনো ছেলেমেয়ে এক দিনে তাদের বাবা-মা, ভাই-বোনকে হারাক। আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন কারাগারে বাবাকে দেখতে যেতাম। দুঃখী মানুষের পক্ষে কথা বলায় তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। ’

গোপালগঞ্জ শহরের মালেকা একাডেমির পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী উপমা বিশ্বাসের সভাপতিত্বে এ শিশু সমাবেশে আরো বক্তব্য দেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুকমী এমপি, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নাসিমা বেগম, ঢাকা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মনির হোসেন, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোখলেসুর রহমান সরকার। স্বাগত বক্তব্য দেন শিশু প্রতিনিধি ফাইয়াদ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ।

জাতির পিতার জন্মদিন উপলক্ষে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন শেখ হাসিনা। পরে তিনি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।

সকাল পৌনে ১১টায় রাষ্ট্রপতি এবং বিকেল ৫টায় প্রধানমন্ত্রী টুঙ্গিপাড়া ছাড়েন।

বঙ্গবন্ধুর রুহের মাগফিরাত কামনা করে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে সকাল ১০টায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে কোরআনখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রাক-প্রাথমিক, বয়স্ক ও সহজ কোরআন শিক্ষার মোট ৫৯ হাজার ৯৬৮টি কেন্দ্রে এবং ইসলামিক মিশনের আওতায় ১৯টি ইবতেদায়ি মাদ্রাসা ও ৩৯৫টি মক্তবসহ ৬০ হাজার ৩৮২ স্থানে সকাল ৯টায় কোরআনখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে।

সকাল সাড়ে ১১টায় ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনাসভা হয়। জাতীয় প্রেস ক্লাবে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।

রাজধানীর পান্থপথে স্টার সিনেপ্লেক্সে বিনা মূল্যে ত্রিমাত্রিক ভিডিও চিত্র ‘পিতা’র প্রদর্শনী হয়। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত দেড় হাজার শিশু-কিশোরসহ আগ্রহীরা বিনা মূল্যে এ ছবি দেখে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কর্মসূচির মধ্যে ছিল—বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনাসভা, শিশু চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, সংগীতানুষ্ঠান। চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে সকালে ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের ক্যাফেটেরিয়ায় চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা হয়। বঙ্গবন্ধু গবেষণা পরিষদ শোভাযাত্রা ও সমাবেশ করে।

সকাল সাড়ে ৯টায় পিলখানাস্থ বিজিবি সদর দপ্তরের বীর-উত্তম ফজলুর রহমান খন্দকার মিলনায়তনে আলোচনাসভা ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল হোসেন।

শিশুদের সঙ্গে শেখ রেহানা : শিশু-কিশোরদের নিয়ে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই)। ৩২ নম্বরে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা, তাঁর ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক উপস্থিত হন। শিশুদের সঙ্গে বসে তিনি বাবার সঙ্গে তাঁর বিভিন্ন ঘটনার স্মৃতিচারণা করেন। শেখ রেহানা বলেন, ‘আমি যখন তোমাদের মতো ছোট ছিলাম, আমার বাবা বেশির ভাগ সময় জেলেই থাকতেন, দেশের জন্য লড়ার কারণে। বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার সৌভাগ্য আমাদের হয়নি। বেশির ভাগ সময় একাই যেতাম, না হয় মা নিয়ে যেতেন। ’

এ ছাড়া আমরা ছাত্রলীগ ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ, যুবলীগ ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ, ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগ, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, মুক্তিযোদ্ধা ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বঙ্গবন্ধু শিশু-কিশোর মেলা, শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদ, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বঙ্গবন্ধু পেশাজীবী পরিষদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করে।

তেঁতুলিয়ায় দুই কিলোমিটার এলাকায় ছবি আঁকল চার হাজার শিক্ষার্থী : পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, তেঁতুলিয়ায় দুই কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বঙ্গবন্ধুর জীবন চিত্র ও স্বাধীনতাযুদ্ধের ওপর চার হাজার খুদে শিক্ষার্থী নিয়ে  ‘ইচ্ছে স্বাধীন চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা’ অনুষ্ঠিত হয়।

শুক্রবার সকালে তেঁতুলিয়া উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে চৌরঙ্গী থেকে থানা মোড় পর্যন্ত দুই কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এই চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় মোট ১১২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় চার হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানিউল ফেরদৌস বলেন, বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতা সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে জানাতে ও তাদের আগ্রহ সৃষ্টি করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জেলার সিংগাইর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এক হাজার স্কুল শিক্ষার্থীকে উপহার দেওয়া হয় বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন মানিকগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য মমতাজ বেগম।


মন্তব্য