kalerkantho


বদলে যাওয়া সাকিব বদলালেন বাংলাদেশের ব্যাটিংভাগ্যও

১৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



বদলে যাওয়া সাকিব বদলালেন বাংলাদেশের ব্যাটিংভাগ্যও

বাংলাদেশের ১০০তম টেস্টে সেঞ্চুরি উদ্যাপন সাকিবের। এ সময় পাশে দাঁড়ানো মোসাদ্দেকও করেছেন অভিষেকে কার্যকর এক হাফসেঞ্চুরি। ছবি : মীর ফরিদ

আগের দিন বিকেলে তাঁর আট বলের ইনিংসটি কতগুলো দুঃস্বপ্নের সকালই না ফিরিয়ে আনার আশঙ্কা জাগিয়ে রেখেছিল! সাকিব আল হাসানের ব্যাটে মাসদুয়েক আগের একটি সকাল ফিরলও, তবে সেটি আশঙ্কার মেঘ মুছে দেওয়ার এবং দলকে এগিয়ে নেওয়ারও।

যেভাবে এগিয়ে নিয়েছিলেন গত জানুয়ারিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়েলিংটন টেস্টের দ্বিতীয় দিনের সকাল থেকে। আগের দিন বিকেলে লোপ্পা ক্যাচ দিয়ে বেঁচে যাওয়া সাকিব সেদিন শুধু ডাবল সেঞ্চুরিই করেননি, মুশফিকুর রহিমকে নিয়ে পঞ্চম উইকেটে গড়েছিলেন ৩৫৯ রানের রেকর্ড পার্টনারশিপ। বাংলাদেশের

শততম টেস্টের তৃতীয় দিনের সকালেও সেই দুজন উইকেটে। দ্বিতীয় দিনের শেষ বিকেলে ক্যাচ দিয়ে বেঁচে যাওয়া এবং বলে বলে মারতে চাওয়া সাকিবকে অবশ্য কালকের সাকিবের সঙ্গে মেলানো যাচ্ছিল না কিছুতেই।

ওয়েলিংটনের প্রথম ইনিংসের মতো ব্যাটিংয়ের ধরনটা বদলে নিলেন পি সারা ওভালে। তাতে এই অলরাউন্ডারের নিজের ভাগ্য যেমন বদলাল, তেমনি দলেরও। সাকিব পেলেন নিজের পঞ্চম টেস্ট সেঞ্চুরি। তাঁর সঙ্গে সপ্তম উইকেটে ১৩১ রানের পার্টনারশিপ গড়া তরুণ মোসাদ্দেক হোসেনও টেস্ট অভিষেকে উজ্জ্বল হলেন পারফরম্যান্সের আলোয়। দুয়ে মিলে শ্রীলঙ্কার ৩৩৮ রানের জবাবে ৪৬৭ রান বাংলাদেশের রেকর্ডের খাতায় টুকে দিল দেশের বাইরে সর্বোচ্চ রানের লিডও। সেই লিড ১২৯ রানের।

অথচ আগের দিন বিকেলে সাকিবের ব্যাটিং দেখে মনে হচ্ছিল ওয়েলিংটন টেস্টের পঞ্চম দিনের সকাল না আবার ফিরিয়ে আনেন! যে সকালে দিনের অষ্টম বলেই চালাতে গিয়ে শূন্য রানে আউট হয়ে আসেন প্রথম ইনিংসের ডাবল সেঞ্চুরিয়ান সাকিব। বাংলাদেশের মুঠো গলে সেই ম্যাচটি বেরিয়ে যাওয়ার শুরু ওই শটেই। এর আগে গত অক্টোবরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৩১ রান নিয়ে চট্টগ্রাম টেস্টের তৃতীয় দিন শুরু করা সাকিব দিনের দ্বিতীয় বলেই চড়াও হতে গিয়ে উইকেট বিলিয়ে আসেন। তখন যেমন, তেমনি ভারতের বিপক্ষে হায়দরাবাদ টেস্টেও বাজে শটে ৮২ রানের ইনিংসটির অপমৃত্যু ঘটিয়ে আসার জন্যও কম সমালোচিত হননি।

আগের দিন বিকেলের ব্যাটিংও তাই সেই ইনিংসগুলোতেই ফিরিয়ে নিচ্ছিল। তাতে তৈরি হওয়া শঙ্কা মুছে দিতে যেন কাল সকাল থেকে অন্য চেহারায় সাকিব। যে চেহারায় সতর্কতা ছিল, ছিল বুঝেশুনে খেলার দক্ষতা এবং দলের চাহিদা পূরণের তাগাদা। এতটাই যে একপর্যায়ে টানা ৫৩ বলে কোনো বাউন্ডারি মারেননি তিনি। সেই সঙ্গে টেস্ট অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমও অটল ছিলেন চোয়ালচাপা প্রতিজ্ঞায়। তাতে দিনের প্রথম সেশনটা কোনো উইকেটহানি ছাড়াই পার করে দেওয়া যাচ্ছিল প্রায়। কিন্তু সমস্যা হলো মধ্যাহ্নভোজের বিরতির ঠিক আগে নতুন বল উঠল লঙ্কান একাদশের একমাত্র পেসার সুরঙ্গা লাকমলের হাতে। নতুন বলে তাঁর প্রথম ডেলিভারিই গড়বড়টা করল।

মুশফিকের ব্যাটের ভেতরের কানায় লেগে বল স্টাম্প পর্যন্ত গেল। ততক্ষণে অধিনায়কেরও (৫২) ফিফটি হয়ে গেছে, আবার ৯২ রানের পার্টনারশিপে দিনটিও বাংলাদেশের হতে শুরু করে দিয়েছে। মুশফিক গেলেও তাতে ছেদ পড়ল না, কারণ অভিষেকেই মোসাদ্দেক দাঁড়িয়ে গেলেন। দাঁড়িয়ে যাওয়ার কথাও। কারণ তাঁর বড় দৈর্ঘ্যের ম্যাচ টেম্পারামেন্ট নিয়ে সংশয় নেই কোনো। অল্প দিনের ক্যারিয়ারে ঘরোয়া ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে যাঁর সর্বোচ্চ পাঁচটি ইনিংস ২৮২, ২৫০, ২০০*, ১৫২ এবং ১৫২ রানের, তাঁর ওপর আস্থা রাখাই যায়।

সে আস্থার প্রতিদান দেওয়ার পথে রঙ্গনা হেরাথকে ইনসাইড আউটে লং অফ দিয়ে মারা ছক্কাটি যেন তাঁর ইনিংসের ছন্দটা ধরে দিয়েছিল। সেই সঙ্গে আগের দিন বিকেলের অস্থির সাকিবও সুস্থিরতায় ব্যাটিং করে যেতে থাকলেন। সে জন্যই সপ্তম উইকেটের পার্টনারশিপ সেঞ্চুরি ছোঁয়ার সময় সাকিবের অবদান ৪৫ আর মোসাদ্দেকের ৪৯! বাংলাদেশের ৮৬তম টেস্ট ক্রিকেটার দেশের ১৬তম ব্যাটসম্যান হিসেবে অভিষেকে ফিফটিও করেছেন। তাঁর ফিফটির সময় ৯০ রানে থাকা সাকিব অফস্পিনার দিলরুয়ান পেরেরার লেগ স্টাম্পের ওপরের বল সুইপ করে বাউন্ডারিতে পাঠিয়ে সেঞ্চুরিতে পৌঁছান ১৪৩ বলে।

শেষ পর্যন্ত চায়নাম্যান লাকশান সান্দাকানকে (৪/১৪০) মিড অনের ওপর দিয়ে তুলে মারতে গিয়ে দীনেশ চান্ডিমালের দুর্দান্ত ক্যাচে পরিণত হওয়ার আগে করেছেন ১১৬ রান। ১০ বাউন্ডারিতে সাজানো ইনিংসটিতে অবদান আছে চান্ডিমালেরও। আগের দিন বিকেলের এলোমেলো ব্যাটিংয়ের পর এই টেস্টেই চান্ডিমালের ১৩৮ রানের ইনিংস থেকে যে শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। সাকিব বিদায় নিলেও ছিলেন মোসাদ্দেক, শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হওয়ার আগে টেল এন্ডারদের নিয়ে চালিয়ে গেছেন কিছুক্ষণ। তাতে ১৫৫ বলে ৭ বাউন্ডারি ও দুই ছক্কায় তাঁর খেলা ৭৫ রানের ইনিংসটিও দিনের শেষে অমূল্যের মর্যাদা পাচ্ছে। দিনের শেষে পেসার শুভাশিষ রায়ের বলে ১১ রানে থাকা দিমুথ করুণারত্নের দেওয়া কঠিন সুযোগটা মুশফিক গ্লাভসে জমাতে পারলে সেটিও অমূল্য হতো। তাতে লঙ্কানরা বিনা উইকেটে ৫৪ রান নিয়ে দিন শেষ করতে পারত না।

অবশ্য এরও আগে বাংলাদেশের ব্যাটিংভাগ্য বদলানো বেশি জরুরি ছিল। ব্যাটিং বদলানো সাকিবেই বদলেছে সেটি। তাতে দুঃস্বপ্নের সকাল ফেরেনি, ফিরেছে সাফল্যের সকাল!


মন্তব্য