kalerkantho


কুমিরায়ও এক আস্তানায় ছিল সাত জঙ্গি

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

১৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



কুমিরায়ও এক আস্তানায় ছিল সাত জঙ্গি

চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলার কয়েকটি উপজেলায় নব্য জেএমবির অনেক ‘সেফ হোম’ বা নিরাপদ আস্তানা থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। সীতাকুণ্ড উপজেলায় ছিল তিনটি সেফ হোম।

গত বুধবার দুটি সেফ হোম পুলিশের নিয়ন্ত্রণে চলে এলেও তৃতীয়টি ছিল অধরা। কুমিরা এলাকার ওই সেফ হোম থেকে বৃহস্পতিবার ভোরে পাঁচ-সাতজন তরুণ পিঠে ‘ব্যাকপ্যাক’ ঝুলিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে পালিয়েছে। সেই দৃশ্য দেখেছে ওই এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা। তাদের কাছ থেকে জেনেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, বিশেষ অ্যাপের মাধ্যমে নির্দেশ পেলে ওই সব আস্তানা থেকে চট্টগ্রামে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে একযোগে হামলা চালানোর ছক রয়েছে জঙ্গিদের। হামলায় প্রধান টার্গেট অর্থনৈতিক জোন, বিদেশি, পীর, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। একযোগে হামলা হলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভ্রান্তিতে পড়তে পারে—এমন ধারণা থেকেই নব্য জেএমবি ভয়ংকর এই পরিকল্পনা

করেছে।

জানা যায়, সীতাকুণ্ড পৌর এলাকায় দোতলা বাড়ি ছায়ানীড়ে অপারেশন অ্যাসল্ট সিক্সিটিন শুরু হওয়ার পর কম্পিউটারসহ গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী পুড়িয়ে ফেলে জঙ্গিরা। নিজেদের আস্তানার একটি কক্ষে এসব পোড়ানোর সময় পাশের দেয়ালে ধোঁয়ার কালো আস্তরণ পড়ে।

জঙ্গিদের কেউ একজন সেই কালো আস্তরণে আঙুল দিয়ে আরবি ও বাংলায় ‘দাউলাতুল ইসলাম’ লিখেছে। এই লেখাটি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ভাবিয়ে তুলেছে। ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজানেও জঙ্গি হামলার পর রুমালে এমন লেখা পাওয়া গিয়েছিল।

জঙ্গিদের মধ্যে ভাই-বোন-দুলাভাই : পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, সীতাকুণ্ডের তিনটি সেফ হোমের জঙ্গিরা পরস্পরের পরিচিত। তারা পটিয়া থেকে গাড়ি ভর্তি করে সীতাকুণ্ডের সেফ হোমে বোমা-বিস্ফোরক ও অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে যায়। আবার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া চার জঙ্গির বাড়িও একই এলাকায়। তারা বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের বাসিন্দা। ওই চার জঙ্গি হলো মোহাম্মদ হাসান কামাল উদ্দিন (২৫), তার স্ত্রী জুবাইদা (২১), জুবাইদার ভাই জহিরুল হক ও রাজিয়া সুলতানা। কামাল উদ্দিন নাইক্ষ্যংছড়ির উত্তর বাইশারী গ্রামের মোজাফফর আহমেদের ছেলে। জুবাইদার বাড়িও একই এলাকায়। জুবাইদার বাবার নাম নূর আলম। এই দম্পতি ছায়ানীড়ে অপারেশন অ্যাসল্ট সিক্সটিনে মারা যায়। সঙ্গে তাদের শিশু সন্তানও। জুবাইদার ভাই জহিরুল হক ও রাজিয়া সুলতানা আর্জিনার ঠিকানাও বাইশারী এলাকা। এই দম্পতি সীতাকুণ্ডের সাধন কুটির থেকে গ্রেপ্তার হয়। রাজিয়া সুলতানা আর্জিনা মূলত রোহিঙ্গা। জহিরুলকে বিয়ে করে সে বাংলাদেশি পরিচয় ধারণ করে। জহিরুল-রাজিয়া দম্পতি এখন পুলিশ হেফাজতে। সীতাকুণ্ডের সেফ হোমগুলোর নেতৃত্বে কামাল ছিলেন বলে ধারণা করছেন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা।

সূত্র মতে, সীতাকুণ্ডে তিনটি সেফ হোম থাকার তথ্য ১৩ মার্চ পেয়েছিল মিরসরাই থানা পুলিশ। ওই থানার মামলায় গ্রেপ্তার করা দুই জঙ্গি মো. হাসান ও জসিমকে কুমিল্লায় জিজ্ঞাসাবাদের পরপরই তথ্যটি পুলিশ পেয়েছিল। পরদিন ১৪ মার্চ থেকেই নব্য জেএমবির সেফ হোমগুলো শনাক্ত করতে কাজ করছিল মিরসরাই থানা পুলিশ। জেলা পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা এর সঙ্গে যুক্ত করেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) মো. মশিউদ্দৌলা রেজাকে। তাঁদের তত্পরতায় একটি সেফ হোম তথা চৌধুরী বাড়ির ছায়ানীড় শনাক্ত হয়। অন্যটি অর্থাৎ সাধন কুঠির শনাক্ত হয় ওই বাড়ির মালিকের তত্পরতায়। এর মধ্যে ছায়ানীড় ঘিরে তিন শতাধিক পুলিশ সদস্য অভিযানে ব্যস্ত থাকার ফাঁকে অদূরের আরেকটি সেফ হোম থেকে জঙ্গিরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।

পুলিশ সূত্র মতে, মূলত কুমিল্লার চান্দিনায় হাইওয়ে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার দুই জঙ্গি হাসান ও ইমতিয়াজের দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরেই সীতাকুণ্ডের ছায়ানীড়ে অভিযান হয়েছে। কালের কণ্ঠকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) মো. মশিউদ্দৌলা রেজা, মিরসরাই থানার ওসি মো. সাইরুল ইসলাম এবং থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসেন।

ইমতিয়াজ ও হাসানের দেওয়া তথ্য : পুলিশ সূত্রে জানা যায়, কুমিল্লা হাইওয়ে পুলিশের ওপর আক্রমণ করতে গিয়ে ধরা পড়া হাসান ও ইমতিয়াজের দেওয়া তথ্য মতে গত ৭ মার্চ মিরসরাই উপজেলা সদরের পূর্ব গোভানিয়া রিদোয়ান মঞ্জিল থেকে ২৯টি গ্রেনেডসহ বোমা তৈরির বিপুল সরঞ্জাম উদ্ধার করে পুলিশ। ওই ঘটনায় মিরসরাই থানায় একটি মামলা করেন কুমিল্লা জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার উপপরিদর্শক মো. শহিদুল বাশার। আবার কুমিল্লায়ও দুই জঙ্গির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। মিরসরাই থানার মামলাটি তদন্ত করছেন পরিদর্শক (তদন্ত) মো. জাকির হোসেন। কুমিল্লার মামলাটি তদন্তের শুরুতে আটক মো. হাসান ছয়টি নাম প্রকাশ করে। হাসানের দেওয়া তথ্য মতে, জঙ্গি সংগঠনে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছে ময়নুল হোসেন মুছা (৩০), সামরিক প্রশিক্ষকের দায়িত্বে আছে হাদিছুর রহমান সাগর, চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করছে মোশাররফ হোসেন (৩০) এবং বোমা তৈরির দায়িত্ব পালন করে সোহেল মাহফুজ ওরফে হাতকাটা নসরুল্লাহ (৩০)। এ ছাড়া হাসান তার পরিচিত দুই সদস্যের নামও প্রকাশ করে। তারা হলো ফরহাদ ও মনির।

কুমিল্লা গোয়েন্দা পুলিশ হাসানকে সাত দিনের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। ইমতিয়াজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় এখনো রিমান্ডে নেওয়া হয়নি। এ দুই জঙ্গিকে মিরসরাই থানার মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১৩ মার্চ কুমিল্লায় যান চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মশিউদ্দৌলা রেজা এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন। সেখানে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের পরই পাওয়া যায় ভয়ংকর সব তথ্য।

হাসান ও ইমতিয়াজের দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, তারা আগে পটিয়ায় ছিল। সেখান থেকে সীতাকুণ্ডে চলে যায়। পটিয়া থেকে সীতাকুণ্ডে ফিরে তিনভাগে বিভক্ত হয়ে তিনটি সেফ হোমে অবস্থান নেয়। চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় তাদের ‘অনেক সেফ হোম’ আছে। জঙ্গিরা নিজেদের মধ্যে কথা বলে অ্যানড্রয়েড মোবাইল ফোনের থ্রিমা অ্যাপের মাধ্যমে। দুজনই জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই লক্ষ্যে হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। অতীতে বিচ্ছিন্নভাবে হামলার ঘটনায় ভালো ফল আসেনি। সে জন্য এখন পরিকল্পিতভাবে একযোগে হামলার সিদ্ধান্ত হয়েছে।


মন্তব্য