kalerkantho


ব্রাসেলস দূতাবাস থেকে জরুরি বার্তা

জিএসপি স্থগিতের হুমকি ইইউর

আবুল কাশেম   

১৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



জিএসপি স্থগিতের হুমকি ইইউর

বাংলাদেশের শ্রমিক অধিকার নিয়ে এবার যুক্তরাষ্ট্রের মতোই কঠোর পথে হাঁটতে যাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। শ্রমিক অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ হলে দেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপে অস্ত্র বাদে আর সব পণ্যে (ইবিএ) দেওয়া শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা (জিএসপি) স্থগিত করার কথা স্পষ্টভাবেই জানিয়েছে ইইউ জোট। ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে এ জরুরি বার্তা পাঠানো হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে বাংলাদেশের  রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের ধস নামতে পারে।

ব্রাসেলসে অবস্থিত ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সিলর (কমার্স) এবং কমার্স উইংয়ের প্রধান মোহাম্মদ জহিরুল কাইয়ুম বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক ই-মেইল বার্তায় এ আশঙ্কাজনক তথ্য জানিয়েছেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এর সত্যতা স্বীকার করেছেন।

তাঁরা জানান, গত ১০ মার্চ পাঠানো ওই ই-মেইলে কাইয়ুম জানিয়েছেন, ইউরোপীয় কমিশনের সঙ্গে ব্রাসেলস দূতাবাস নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। তবে কমিশন একটি বার্তাই বারবার দিচ্ছে, তা হলো—শ্রমিক অধিকার রক্ষা ও তাদের ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ বাংলাদেশ কবে নাগাদ কিভাবে বাস্তবায়ন করবে সে সম্পর্কে একটি পরিকল্পনা বা রোডম্যাপ আগামী মে মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠেয় সাসটেইনেবিলিটি কমপ্যাক্টের বৈঠক ও জুনে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠেয় বিশ্ব শ্রম সংস্থার (আইএলও) সম্মেলনে তুলে ধরতে হবে। অন্যথায় ইবিএ হারানোর ঝুঁকি নিতে হবে, বাংলাদেশকে দেওয়া জিএসপি সুবিধা স্থগিত করা হবে।

২০১৪ সালের এপ্রিলে সাভারে রানা প্লাজা ধসের পর ওই বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা স্থগিত করে। যদিও বাংলাদেশের প্রধান প্রধান রপ্তানি পণ্যে জিএসপি সুবিধা ওই দেশের বাজারে ছিল না।

ফলে ওই সিদ্ধান্তে এ দেশের রপ্তানি আয়ে খুব একটা প্রভাব না পড়লেও আন্তর্জাতিকভাবে যথেষ্ট সুনামহানি হয়েছে। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার। সেখানে শুধু অস্ত্র বাদে সব পণ্যই বিনা শুল্কে রপ্তানির সুযোগ আছে। এখন ইউরোপ জিএসপি সুবিধা স্থগিত করলে রপ্তানিতে ভয়াবহ ধস নামবে। বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশই আসে ইউরোপের ২৮টি দেশের বাজার থেকে। ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে এ দেশের রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল এক লাখ ৯ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকা, যা ওই অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৫৬.৪ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি সুবিধা স্থগিত করার পর তা ফিরে পেতে দেশটির দেওয়া ১৬ দফা কর্মপরিকল্পনা বেশ জোরেশোরে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় সরকার। তবে ওই সুবিধা ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা ফিকে হয়ে যাওয়ার পর সে উদ্যোগে ভাটা পড়েছে। বাণিজ্য ও শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, এ পর্যন্ত প্রায় ৩০০ কারখানায় ট্রেড ইউনিয়নের নিবন্ধন ও কারখানা ভবনের সুরক্ষা ও অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। কিন্তু মালিকদের আপত্তির কারণে ট্রেড ইউনিয়নের নিবন্ধন দেওয়ার কাজ ধীরগতিতে চলছে।

জহিরুল কাইয়ুম তাঁর ই-মেইল বার্তায় জানিয়েছেন, আগামী ২৭-২৯ মার্চ ইউরোপীয় পার্লামেন্টের চারজনেরও বেশি সদস্য এবং এস অ্যান্ড ডি পার্টির নেতা বাংলাদেশ সফর করবেন। ওই সময় তাঁরা ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী, আইএলও, অ্যাকর্ড, বিজিএমইএ এবং সুধীসমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। সফরসূচি অনুযায়ী, তাঁরা বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু, স্পিকার শিরীন শারমিনের সঙ্গে ২৯ মার্চ বৈঠক করবেন। তাঁরা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গেও বৈঠক করবেন। এ ছাড়া এপেক্স ফুটওয়্যারসহ কয়েকটি গার্মেন্ট কারখানা ঘুরে দেখবেন তাঁরা।

বাণিজ্য ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা কালের কণ্ঠকে জানান, মে মাসে ঢাকার রেডিসন হোটেলে সাসটেইনেবিলিটি কমপ্যাক্টের সভা হবে। তাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি দল অংশ নেবে। যুক্তরাষ্ট্র থেকেও প্রতিনিধিদল আসবে।   ওই সভার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা ফোরাম চুক্তির (টিকফা) বৈঠক আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছে।

সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে শ্রম পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও উন্নয়নের জন্য দেশের গার্মেন্ট খাতের শ্রমিক, মালিক ও সরকার—এই তিন পক্ষের সমন্বয়ে ১৯ সদস্যবিশিষ্ট ‘আরএমজিবিষয়ক ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদ’ গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে শ্রম মন্ত্রণালয়। এই পরিষদের সুপারিশ অনুযায়ী একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করা হতে পারে।

জানা গেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি স্থগিতের হুমকি পাওয়ার দুই দিনের মধ্যে শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে পোশাক খাতের শ্রমিক, মালিক ও সরকারপক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদ গঠন করে গত ১২ মার্চ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। শ্রম মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব (শ্রম ও আইন) মোরশেদা হাই স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, শ্রমমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী এই পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া সরকারপক্ষে শ্রমসচিব, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শ্রম, স্বরাষ্ট্র এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের একজন করে যুগ্ম সচিব আর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ন্যূনতম মহাপরিচালক পর্যায়ের একজন প্রতিনিধি থাকবেন ওই পরিষদে।


মন্তব্য