kalerkantho


গাজী আবদুস সালাম ভূঁইয়া

আত্মঘাতী দল উল্কার দায়িত্বে ছিলাম

আলম ফরাজী, ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ)   

১৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



আত্মঘাতী দল উল্কার দায়িত্বে ছিলাম

‘১৪ নভেম্বর ১৯৭১, মেজর মো. আবু তাহের কামালপুর রণাঙ্গন পরিদর্শনে আসেন। ওয়্যারলেসে তাঁর সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়।

আমি তখন  আমার আত্মঘাতী দলের সদস্য নজরুল, মোস্তফা, মজিদসহ কয়েকজনকে নিয়ে কামালপুরের কাছাকাছি দেওয়ানগঞ্জের রাস্তায় অবস্থান করছি। খবর পেয়ে তিনি সেখানে চলে এলেন। অভ্যর্থনা জানানোর মতো কিছু ছিল না আমার কাছে। সহযোদ্ধা নজরুলকে ইশারা দিই। তিনি এসএমজির বুলেটের একটি মালা কমান্ডার আবু তাহেরের গলায় পরিয়ে দেন। তিনি বেশ খুশি হলেন। কামালপুরে পাক হানাদারদের শক্ত ঘাঁটির পতন সময়ের ব্যাপার মাত্র। ’

‘তখনই ঘটে যায় ভয়ংকর এক ঘটনা। শত্রুপক্ষের ছোড়া মর্টারের একটি শেল এসে পড়ে সেখানে।

দেখতে পাই, শেলের আঘাতে আবু তাহেরের বাঁ পা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তিনি মাটিতে পড়ে রয়েছেন। এ দৃশ্য দেখে হতবিহ্বল হয়ে পড়ি। কিন্তু গুরুতর আহত অবস্থায়ও কমান্ডার আমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দিতে থাকেন। ’

যুদ্ধদিনের স্মৃতিকথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন গাজী আবদুস সালাম ভূঁইয়া বীরপ্রতীক। ময়মনসিংহের নান্দাইল পৌরসভার চারিআনিপাড়ার বাসায় বসে তিনি বলছিলেন, ৪৬ বছর পরও ঘটনাটি তাঁর স্মৃতিতে অম্লান।

‘১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল। কিন্তু বাঙালি শাসনক্ষমতা পেল না। আমি সে সময় করাচি বন্দরের কাছাকাছি আরব সাগরে মুনসিফ যুদ্ধজাহাজে কর্মরত। বারবার আবেদন করেও ছুটি পাচ্ছি না। অন্যদিকে মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে বিমানে ও জাহাজে করে পাকিস্তানি সেনা বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে। অবশেষে ২২ মার্চ আমার ছুটি মঞ্জুর হয়। জাহাজ থেকে বিদায় নিলাম। দেশে আসার সময় স্বজনদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য পাকিস্তানে অবস্থানরত বিভিন্ন বাঙালি পরিবারের প্রায় আড়াই শ চিঠি পেলাম। ২৫ মার্চ সকাল ১০টার ৭০৭ বোয়িং বিমানের একটি টিকিট পেলাম। করাচি বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে বাঙালি কোয়ার্টারগুলোর দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার সাঁটানো দেখলাম; লেখা রয়েছে, ভুট্টো ঢাকা থেকে ব্যর্থ হয়ে ফিরলে পাকিস্তানে বসবাসরত বাঙালিদের নিশ্চিহ্ন করা হবে। পরিস্থিতি আঁচ করতে পারলাম। ’

‘শ্রীলঙ্কার কলম্বো হয়ে দুপুর ১টায় নামলাম ঢাকা বিমানবন্দরে। সেখানে বিমানবিধ্বংসী কামান মোতায়েন দেখতে পেলাম। দেশের মাটিতে পা রাখার পর মনে আনন্দ-শিহরণ জাগল। ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে এক আত্মীয়ের বাসায় উঠলাম। পাকিস্তান থেকে ফেরার সময় বাঙালি ভাইয়েরা বলেছিলেন, শেখ মুজিবকে বলবেন—আমরা অবরুদ্ধ। কথাটি জানাতে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাসার দিকে রওনা হই। গিয়ে দেখি, চারপাশ লোকে লোকারণ্য। বঙ্গবন্ধু ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে জনগণের উদ্দেশে হাত নাড়ছেন। সন্ধ্যার পর আমি সাংবাদিকদের সঙ্গে বাসার ভেতরে গেলাম। দেখি, বঙ্গবন্ধু বিশ্রাম নিচ্ছেন। ’

‘সন্ধ্যা ৭টার দিকে বিশ্রামকক্ষের দিকে এগোনোর সময় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি লেফটেন্যান্ট এম এম রহমানকে দেখতে পাই। তিনি আমার পূর্বপরিচিত। তাঁকে পাকিস্তানে অবস্থানরত বাঙালিদের অবস্থার কথা ও আরো কিছু তথ্য জানালাম। সেসব কথা বঙ্গবন্ধুকে অবহিত করার দায়িত্ব নিলেন তিনি। রাত সাড়ে ৯টার দিকে ৩২ নম্বরের বাসা থেকে বের হই। আত্মীয়ের বাসার দিকে যাওয়ার সময় দেখলাম, ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে রাস্তায় টহল দিচ্ছে সেনাবাহিনীর সদস্যরা। তখনো জানতাম না, কী হতে চলেছে। মধ্য রাতে মারণাস্ত্রের বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে ঢাকা শহর। আকাশে স্টার শেল ফায়ারিং। একজন সামরিক ব্যক্তি হিসেবে বুঝতে পারলাম, কী ঘটতে চলেছে। ২৬ মার্চ সকালে জানালার ফাঁক দিয়ে বিচিত্র ভঙ্গিতে পড়ে থাকা লাশের সারি দেখতে পাই। অবরুদ্ধ ঢাকা। খোঁজখবর নিয়ে ডেমরার দিকে পা বাড়ালাম। নরসিংদীর শিবপুর হয়ে হেঁটে ৭০-৭৫ জন নারী-পুরুষ কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া থানার মঠখোলার শরণার্থী শিবিরে পৌঁছি। ৩ এপ্রিল রিকশায় করে মঠখোলা থেকে কিশোরগঞ্জ হয়ে নান্দাইলে পৌঁছি। ’

আবদুস সালাম বলেন, ‘১৫ মে কিশোরগঞ্জ আর্মি ক্যাম্প থেকে একজন ক্যাপ্টেনের নেতৃত্বে এক প্লাটুন পাকিস্তানি সেনা নান্দাইলে আসে। শান্তিবাহিনীর দালালরা আগেই জয়বাংলার লোকদের কথা তাদের জানিয়েছিল। নান্দাইলের সাতজনের একটি তালিকা তাদের দেওয়া হয়। ওই তালিকায় আমার ও আমার বাবার নাম ছিল। পাক-সেনারা পৌঁছার আগেই আমরা নান্দাইল ছেড়ে চলে যাই। নান্দাইল থানার ওসিকে নির্দেশ দেওয়া হয় ওই সাতজনকে সামরিক কোর্টে হাজির করার জন্য। ’

‘বাড়ি আসার পর গোপনে এলাকার যুবকদের মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করছিলাম। কিন্তু বাড়ি ছাড়তে হলো। ১ জুন সিলেট সীমান্তের ওপারে মহেশখোলা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে পৌঁছাই। আমার সঙ্গে ছিলেন নান্দাইল থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. মুজিবুর রহমান, পুরুরা হাই স্কুলের শিক্ষক এ এস এম আক্রাম হোসেন, মকতুল হোসেন, এ বি সিদ্দিক ও মাজহারুল হক ফকির। পরে সেখান থেকে রংরা হয়ে বাঘমারায় যাই। ভারতের সিকিউরিটি ব্রাঞ্চের লোকেরা জানতে পারে, আমি পাক-নৌবাহিনীর সদস্য ছিলাম। এরপর বাঘমারা থেকে তোরায় যাই। সেখানে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে ইনস্ট্রাক্টরের দায়িত্ব পালন করি। ’

‘একদিন ক্যাপ্টেন ওয়ালি সাবেক সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের রংপুর সীমান্তের ওপারে ভারতের তেলঢালায় ব্রিগেড হেড কোয়ার্টারে যেতে বলেন। এ ঘটনা জুলাই মাসের। সেখানে গিয়ে জানতে পারলাম, অসম সাহসী রণবিশারদ, কমান্ডো মেজর আবু তাহের ১১নং সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ভারতের কালাইপাড়া-মহেন্দ্রগঞ্জ থেকে ছয় মাইল উত্তরে একটি মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং ক্যাম্প চালু করেছেন তিনি। ২০ আগস্ট আমি কালাইপাড়া ক্যাম্পে ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে যোগদান করি। চায়নিজ অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ দিয়ে জামালপুর জেলার মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার যোগ্য করে তোলার দায়িত্ব আমার ওপর ন্যস্ত হয়। ’

গাজী আবদুস সালাম ভূঁইয়া বীরপ্রতীক বলেন, ‘কামালপুর যুদ্ধে ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন মমতাজ শহীদ হওয়ার পর আমাকে সেখানে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট মাহফুজ। ডালুতে দায়িত্ব পালনকালে তিনি শহীদ হন। ১১নং সেক্টর হেড কোয়ার্টার শহীদ লে. মাহফুজ নামে একটি কম্পানির নামকরণ করে। সেক্টর কমান্ডার আবু তাহের মাহফুজ কম্পানির কমান্ডার হিসেবে আমাকে দায়িত্ব দেন। আমার টুআইসি ছিলেন হেলালুজ্জামান পান্না। আমি ধানুয়া-কামালপুর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের দায়িত্ব পালন করি। মেজর তাহেরের পরিচালনায় গেরিলা বাহিনী ও আত্মঘাতী দলের আক্রমণ, রাস্তায় মাইন পুঁতে রাখা এবং বিভিন্ন রণকৌশল অবলম্বন করে কামালপুরে পাকিস্তানি বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখা হতো। আমার এলাকা ছিল মহেন্দ্রগঞ্জ সীমান্তরেখা থেকে ধানুয়া-কামালপুরসংলগ্ন দেওয়ানগঞ্জ রাস্তা পর্যন্ত। দেওয়ানগঞ্জ রাস্তার পর থেকে বাংলাদেশের ভেতরে কিছু অংশের দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন পাটোয়ারী। তাঁর বাহিনীতে ছিল ইপিআর ও আর্মির জওয়ানরা। ’

‘২৫ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টায় পাকিস্তানি বাহিনী ক্যাপ্টেন পাটোয়ারীর এলাকায় অতর্কিত আক্রমণ চালায়। সঙ্গে সঙ্গে আমার মাহফুজ কম্পানি অবস্থান নেয় দেওয়ানগঞ্জ রাস্তায়। রাস্তাটি কামালপুর পাকিস্তানি বাহিনী ক্যাম্পে প্রবেশ করেছে। পাকিস্তানি বাহিনীর আরেকটি গ্রুপ আমাদের ওপর আক্রমণ শুরু করলে আমরাও পাল্টা আক্রমণ করি। ফায়ারিং চলতে থাকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। হঠাৎ তারা ফায়ারিং বন্ধ করে দেয়। ওদের কিছু খোঁজাখুঁজি করতে দেখা গেল। আমার মনে হলো, আমাদের আক্রমণে ওদের কেউ হয়তো আহত বা নিহত হয়েছে। ’

‘ওই দিন সন্ধ্যায় যুদ্ধের খবরাখবর নেওয়ার জন্য আবু তাহের ধানুয়া-কামালপুর এসে উপস্থিত হন। ক্যাপ্টেন পাটোয়ারী সাহেবকে ডেকে কিছু উপদেশ দেন। আমাকেও কিছু নির্দেশ দেন। তবে আমার কম্পানির আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনীর কিছু সদস্য হতাহত হয়েছে, এ কথা তিনি বিশ্বাস করতে চাচ্ছিলেন না। কিন্তু আমার বিশ্বাস ছিল, আমাদের আক্রমণে ওদের অনেক লোক মারা গেছে অথবা আহত হয়েছে। কিছু পরে মেজর তাহের বিদায় নিলেন। ’

‘ভোর ৫টায় আমার কম্পানির মুক্তিযোদ্ধা মোস্তফা, নাদির হোসেন ও আব্দুল মজিদকে নিয়ে আমি রণক্ষেত্রে পৌঁছি। কিছুদূর এগোতেই একজন আহত পাঞ্জাবিকে দেখি। আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র নিয়ে আসার সময় কিছু দূরে জেড ফোর্সের অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান ও ১১নং সেক্টর কমান্ডার মেজর আবু তাহেরকে দেখতে পেলাম। তাঁরা আগের দিনের যুদ্ধের ফলাফল জানার জন্য আকস্মিক সফরে এসেছেন। সেখানে গেলাম। তাহের সাহেব আমাকে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি আমাদের ভূয়সী প্রশংসা করলেন। আহত পাঞ্জাবিকে ও তার রাইফেলটিকে তোরাতে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন তাঁরা, হেলমেটটি আমাকে দিয়ে যান। ’

‘কামালপুরে মেজর তাহেরের নির্দেশে উল্কা ও ইউরেকা নামের দুটি আত্মঘাতী দল গঠন করা হয়। উল্কার দায়িত্ব পাই আমি। হারুন-অর রশিদ পান ইউরেকার দায়িত্ব। ওই এলাকায় মুক্তা, লতা, বদিউজ্জামান, আব্দুল হেলিম, মোহাম্মদ সাফায়েত হোসেন প্রমুখ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হিসেবে গৌরবের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত কামালপুরের পরিস্থিতি বলতে ছিল আক্রমণ আর পাল্টা আক্রমণ। ১৪ নভেম্বর মেজর তাহের ঢাকার প্রবেশদ্বার কামালপুরে ত্রিমুখী আক্রমণ পরিচালনা করেন। পশ্চিমে ক্যাপ্টেন আব্দুল আজিজের বাহিনী, পূর্বে টেংরামারীতে আমার মাহফুজ কম্পানি ও অন্যান্য। আর উত্তর দিকে মিত্রবাহিনীর শিখ ও মারাঠা রেজিমেন্টের দুটি কম্পানি। উত্তর দিক থেকে (গারো পাহাড়) রাত ১২টা থেকে ৩টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্পে শেলিং চলে। রাত ৪টার পর আমাদের বিভিন্ন গ্রুপ কৌশলে কামালপুরে প্রবেশ করবে। আমি এবং আমার আত্মঘাতী দলের নজরুল, মোস্তফা ও মজিদ ভোর ৫টা ৩০ মিনিটে কামালপুরের কাছে দেওয়ানগঞ্জ রাস্তায় অবস্থান নিই। সেক্টর কমান্ডার মেজর আবু তাহের কামালপুরের উত্তরে বর্ডার লাইনে তেঁতুলগাছের কাছে দাঁড়িয়ে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে যুদ্ধের নির্দেশ দিচ্ছেন। আমার সঙ্গে ওয়াকিটকি সেট। দরকারে কথা বলি তাহের সাহেবের সঙ্গে। যুদ্ধ পরিচালনার সুবিধার্থে ১১ নম্বর সেক্টরকে ৮টি সাব-সেক্টরে ভাগ করা হয়েছিল। এগুলো হলো মহেন্দ্রগঞ্জ, মানকারচর, পুরাকাশিয়া, ডালু-বাঘমারা, শিববাড়ী, রংরা ও মহেশখোলা। আমি কামালপুর ক্যাম্পের কাছে আছি শুনে মেজর তাহের সেখানে চলে আসেন। তখন প্রায় সকাল ৮টা। সহযোদ্ধা নজরুলকে এসএমজি চেইনের আকারে বুলেটের একখানা মালা উনার গলায় পরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিই। বিজয় যখন সন্নিকটে, তখনই শত্রুপক্ষের মর্টার শেলের আঘাতে সেক্টর কমান্ডার মেজর আবু তাহেরের বাঁ পা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আমি এ দৃশ্য দেখে হতবিহ্বল হয়ে পড়ি। নিজেকে কোনোভাবে মানাতে পারছিলাম না। পা বিচ্ছিন্ন, তার পরও তিনি আমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা দিয়ে যাচ্ছিলেন। পরে তাঁকে আমরা সীমান্তে মিত্রবাহিনীর অ্যাম্বুল্যান্সে তুলে দিই। ওই দিনের মতো যুদ্ধ বন্ধ করে দিই। ’

‘২৪ নভেম্বর থেকে কামালপুরের পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্প অবরোধ করে রেখেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। ৩ ডিসেম্বর যৌথ কমান্ডের সিদ্ধান্তে বীর মুক্তিযোদ্ধা বশীর আহম্মেদকে দিয়ে পাক সেনা ক্যাম্পে চিঠি পাঠানো হয়। তাতে লেখা ছিল, তোমাদের চারদিক থেকে যৌথ বাহিনী ঘেরাও করে রেখেছে। বাঁচতে চাইলে আত্মসমর্পণ কর, তা না হলে মৃত্যু অবধারিত। বশীরের আসতে দেরি হওয়ায় আরেক বীর সেনানী আনিসুল হক সঞ্জুকে পাঠানো হয় পাক ক্যাম্পে। শেষ পর্যন্ত গ্যারিসন অফিসার আহসান মালিকসহ বেলুচ, পাঠান ও পাঞ্জাবি সৈন্যের ১৬২ জনের একটি দল যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। ৪ ডিসেম্বর শনিবার পাক-সেনাদের কবল থেকে মুক্ত হয় কামালপুর। ’

‘মেজর তাহের আহত হওয়ার পর ১১ নম্বর সেক্টরের দায়িত্ব পান উইং কমান্ডার হামিদুল্লাহ খান। কুড়িগ্রাম, জামালপুর, শেরপুর ও টাঙ্গাইল এলাকার মিত্রবাহিনীর দায়িত্বে ছিলেন ব্রিগেডিয়ার হরদেব সিং (ক্লিয়ার)। তিনি ঢাকাকে শত্রুমুক্ত করার মহাপরিকল্পনা মোতাবেক কামালপুর টু ঢাকা অভিযানে বেঙ্গল রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন আব্দুল আজিজকে অপারেশন কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব দেন। গোপনীয় শাখার মাধ্যমে তিনি আমার কম্পানিকে এ অভিযানে সহযোগিতা করার জন্য বলেন। তিনি একাধিক কম্পানিকে একত্রিত করে উনার কমান্ডে নিয়ে আসেন। অভিযানে তিনি আমাকে টুআইসি হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন। ৫ ডিসেম্বর আমরা শেরপুর মুক্ত করি। ৬ ডিসেম্বর সকালে আমরা বিনা বাধায় শ্রীবর্দী প্রবেশ করি। দুপুর ১২টার দিকে পাকবাহিনীর ক্যাম্প কুরুয়ার দিকে অগ্রসর হই। হঠাৎ পাক-সেনারা আমাদের আক্রমণ করে; অবিরত এলএমজির ফায়ার করতে থাকে। আমাদের অ্যাডভান্স পার্টি ব্রিগেডিয়ার ক্লিয়ারের মাধ্যমে ভারতের বিমানবাহিনীকে আমাদের সহযোগিতার জন্য বার্তা পাঠায়। কয়েক মিনিটের মধ্যে ভারতীয় বিমান থেকে বোমাবর্ষণ করা হয়। অনেক পাক-সেনা নিহত হয়। ভুলক্রমে কিছু গোলা মিত্রবাহিনীর ওপর পড়ে যাওয়ায় কয়েক জন শহীদ হন। ১১ থেকে ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত আমরা গাজীপুরের কালিয়াকৈর সার্কেল অফিসারের কার্যালয়ে অবস্থান করি। ১৪ ডিসেম্বর ব্রিগেডিয়ার ক্লিয়ার ক্যাপ্টেন আজিজ ও আমাকে ময়মনসিংহ যেতে নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, আগামী তিন দিনের মধ্যে জেনারেল নিয়াজি আত্মসমর্পণ না করলে ময়মনসিংহ থেকে কালিয়াকৈরে ফিরে আসতে হবে। আমরা ওই দিন বিকেলেই ময়মনসিংহে চলে যাই। ময়মনসিংহে গিয়ে খবর পাই, আমার বাবা মো. শাহনেওয়াজ ভূঁইয়া, নান্দাইল থানা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও থানা মুক্তিযোদ্ধা সংগঠককে ১৭ নভেম্বর বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে পাকবাহিনী হত্যা করেছে। আর এ খবর পেয়ে আমার দাদা ছাবিদ আলী হৃদেরাগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। রাজাকার বাহিনী আমার বাড়িতে লুটপাট করেছে, বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। খবর পেয়ে ১৪ ডিসেম্বরেই নান্দাইলে যাই। বাড়িতে ধ্বংসাবশেষ ছাড়া কিছুই দেখতে পাইনি। শহীদদের কথা স্মরণ করে সেদিন আমি রাজাকারদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আইন হাতে তুলে নিইনি। ’


মন্তব্য