kalerkantho


ছায়ানীড়ে রুদ্ধশ্বাস ১৫ ঘণ্টা

‘কল্পনাও করতে পারিনি বেঁচে থাকব’

এনায়েত হোসেন মিঠু সীতাকুণ্ড থেকে   

১৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



‘কল্পনাও করতে পারিনি বেঁচে থাকব’

‘আমাদের ভবনের নিচতলায় জঙ্গি ও গ্রেনেড আছে শুনেই আমরা ভীত আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। এরপর দরজা বন্ধ করে ভেতরে অবস্থান নিই। এমন গুলি-গ্রেনেড বিস্ফোরণের শব্দ জীবনেও শুনিনি। মনে করেছিলাম বাসা থেকে আর জীবিত বের হতে পারব না। বেঁচে থাকব সেটা কল্পনাও করতে পারিনি। শুধু আল্লাহকে ডেকেছি। মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া পরিবারের সবাইকে নিয়ে নিরাপদে বের হয়ে আসতে পেরেছি...। ’ কাঁপাকণ্ঠে বলছিলেন ৬৫

বছরের বৃদ্ধা হাসিনা বেগম। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে সীতাকুণ্ডের চৌধুরীপাড়ার ছায়নীড়ে অপারেশন অ্যাসল্ট সিক্সটিন শেষে দোতলার একটি ফ্ল্যাট থেকে পরিবারের পাঁচ সদস্যের সঙ্গে পুলিশ বের করে আনে তাঁকে। টানা ১৫ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর মুক্তি পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন এই বৃদ্ধা। একইভাবে উদ্ধার করে আনা হয় পাঁচ শিশুসহ আরো ২০ জনকে।

তাদের মধ্যে তিন শিশুসহ সাতজনকে ভর্তি করা হয়েছে স্থানীয় হাসপাতালে। সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন তিনটি শিশু। এরা হলো- ৬ বছর বয়সী শিক্ষার্থী মাহমুদা সুলতানা তানিশা এবং সীতাকুণ্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সেলিম উদ্দিনের দুই শিশু সন্তান হুমায়রা (৭) ও হুমায়েত (৫)। স্থানীয় এভারগ্রিন ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষার্থী মাহমুদা সুলতানা তানিশা প্রাইভেট শিক্ষিকার কাছে আরবি পড়তে গিয়ে আটকা পড়েছিল ওই বাড়ির নিচতলায়। গত বুধবার দুপুর আড়াইটার দিকে সেলিম উদ্দিনের ফ্ল্যাটে ঢোকে সে। বিকেল ৩টা নাগাদ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বাড়িটি ঘিরে ফেলে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রাতভর অভিযান শেষে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৭টা নাগাদ ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা ফ্ল্যাটের গ্রিল কেটে তানিশাকে উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়ার পর ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শিশুটি বলে, ‘সারা রাত ভয়ে আমি শুধু কেঁদেছি। কারা যেন কয়েকবার ঘরের দরজায় লাথি মেরেছে। আম্মুর জন্য আমার খুব খারাপ লেগেছে। ’ ওই সময় তানিশার পাশে ছিলেন তার দাদা নিজাম উদ্দিন ও চাচি রোকসানা আক্তার। তাঁরা জানান, চৌধুরীপাড়ায়ই তাঁদের বাড়ি। বুধবার দুপুর আড়াইটার দিকে তানিশা আরবি পড়তে ছায়ানীড়ের নিচতলায় সেলিম মেম্বারের ফ্ল্যাটে যায়। বিকেল ৩টা নাগাদ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বাড়িটি ঘিরে ফেললে খবর পেয়ে তাঁরা বিষয়টি পুলিশকে জানান। পরে পুলিশ রাতভর সেলিম মেম্বারের স্ত্রীর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে এবং তাঁদের দরজা না খুলতে পরামর্শ দেয়। সকাল ৭টায় উদ্ধার হওয়ার পর পুলিশ তানিশাকে হাসপাতালে ভর্তি করায়। ওই বাসায় তানিশার সঙ্গে এক শিক্ষিকার কাছে পড়তে গিয়ে জিম্মি দশায় পড়ে আরো দুই শিশু।

সকাল সোয়া ৯টার দিকে জিম্মি অবস্থা থেকে মুক্ত হয় ইউপি সদস্য মো. সেলিমের পরিবার। ছোট দুই কন্যাশিশুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। শিশু হুমায়রা ও হুমায়েতকেও উদ্ধার হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরও ভীতসন্ত্রস্ত দেখা যায়। তাদের বাবা ইউপি সদস্য সেলিম উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি বাড়ির বাইরে ছিলাম। ভেতরে আমার দুই শিশু সন্তানসহ আমার স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন ও শ্যালিকা মর্জিনা আক্তার আটকা পড়ে। ’  

জেলা পুলিশের পরিদর্শক পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, অভিযানে ওই বাড়ির আনিসুর রহমানের পরিবারের চার সদস্য, সেলিম উদ্দিনের পরিবারের পাঁচ সদস্য, মর্জিনা বেগমের পরিবারের আট সদস্য এবং ইয়াসমিনের পরিবারের তিন সদস্যকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া বাড়ির বাসিন্দাদের মধ্যে আছেন—রেহানা আক্তার, আবুল কাশেম, হুমায়রা, শান্তা, হাসিনা বেগম, সাহাদাত, ইনান হুমায়রা, জিহাদ আহমেদ, আনিসুর রহমান, পারভিন আক্তার, মর্জিনা আক্তার, রেশমা বেগম, ইয়াসিনসহ ২০ জন নারী, পুরুষ ও শিশু। তারা ছায়ানীড় নামের বাড়ির তিনটি ফ্ল্যাটের বাসিন্দা।   এদিকে গতকাল বিকেল ৪টার দিকে নির্মল ভৌমিক নামে ৯০ বছরের এক বৃদ্ধকে বাড়ির দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষ থেকে উদ্ধার করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঘটনাস্থলে থাকা পরিদর্শক পদমর্যাদার এক পুলিশ কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘সম্ভব অভিযানের সময় ছোঁড়া গ্যাসে ওই বৃদ্ধ অজ্ঞান হয়ে পড়েন। বিকেলে বোমা নিষ্ক্রীয়কারী দল দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে ঢুকে তাঁকে পেয়ে উদ্ধার করে। পরে তাঁকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। ’


মন্তব্য