kalerkantho


মানিকগঞ্জে শিশু দুরন্ত হত্যা

লাশের পাশে শাড়ি স্যান্ডেল কার?

সাব্বিরুল ইসলাম সাবু, মানিকগঞ্জ   

১৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



লাশের পাশে শাড়ি স্যান্ডেল কার?

দুরন্ত

শিশু দুরন্তর দুরন্তপনায় বাড়িজুড়ে সবাই টের পেত তার উপস্থিতি। অথচ ছয় দিন ধরে বাড়িটা খাঁ খাঁ করছে। দুরন্তকে কেড়ে নিয়েছে দুর্বৃত্তের কালো হাত। ছেলেকে হারিয়ে নাওয়া-খাওয়া অনেকটা ছেড়ে দিয়েছেন মা মুক্তা আক্তার। আর নিজে চোখের পানি মুছবেন নাকি স্ত্রীকে সান্ত্বনা দেবেন বুঝে উঠতে পারছেন না দুরন্তের প্রতিবন্ধী বাবা শহিদুল। আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীরা সান্ত্বনা দিতে এসে নিজেরাই কেঁদে ফেলছে। গত বুধবার মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার  বৈকুণ্ঠপুর গ্রামে দুরন্তদের বাড়ির চিত্র ছিল এমন।

প্রতিবন্ধী কৃষক শহীদুল ইসলামের ছেলে দুরন্ত (৭) গত ৯ মার্চ বিকেলে নিখোঁজ হয়। পরদিন ভোরে গলায় কাপড় পেঁচানো অবস্থায় তার লাশ পাওয়া যায় বাড়ির পেছনে একটি বাঁশঝাড়ে।

পরিবারের সদ্যদের অভিযোগ, এক খণ্ড জমির জন্য অবুঝ শিশুকে হত্যা করেছে পাশের জমির মালিক নাছির হোসেন ও তার স্বজনরা। কেননা দুরন্তের লাশের পাশে শাড়ি, কামিজ ও স্যান্ডেল পাওয়া গেছে, যার সঙ্গে নাছিরের ভাগ্নে ইউসুফ আহম্মেদের স্ত্রী লিপি, ইউসুফের মা চায়না বেগম এবং তাদের সহযোগী শুকুর আলীর ব্যবহৃত সামগ্রীর মিল রয়েছে।

    

শিশু দুরন্ত হত্যায় তার বাবা শহিদুল বাদী হয়ে ঘিওর থানায় পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। আসামিরা হলো নাছির হোসেন, তার বোন চায়না বেগম, ভাগ্নে ইউসুফ আহম্মেদ, নাছিরের ভাইয়ের স্ত্রী লাভলি বেগম ও ভায়রা আনোয়ার হোসেন।

এর মধ্যে দুরন্তর লাশ উদ্ধারের পরদিন রাতে কে বা কারা আবার শহিদুলের বাড়িতে হামলার চেষ্টা করে। দুর্বৃত্তরা দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকার চেষ্টা করলে তাঁদের চিৎকারে প্রতিবেশীরা এগিয়ে এলে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা। শহিদুল মনে করছেন, ছেলের হত্যাকারীরাই তাঁকে হত্যা করার জন্য দরজা ভাঙার চেষ্টা করেছিল।

গত বুধবার বৈকুণ্ঠপুর গ্রামে শহীদুলের বাড়িতে ঢুকতেই উঠানে অনেক নারী-পুরুষের ভিড় দেখা গেল। শহিদুলের পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে এসেছে তারা। শহিদুলের স্ত্রী মুক্তা আক্তার বিছানায় শুয়ে আছেন। কেমন আছেন—এ প্রশ্ন করতেই আস্তে আস্তে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘আমার দুরন্ত কোথায়? আমার সোনামনিকে এনে দেন। ’ এগিয়ে গিয়ে শহিদুল স্ত্রীকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করতেই জ্ঞান হারালেন মুক্তা।

পরে মুক্তার মা সুফিয়া বেগম বললেন, ‘মেয়াডাত মইরা যাইব। পাঁচ দিন ধইরা খাওন নাই। হাজার কইয়াও একদানা মুখে দিতে পারি নাই। ’ বলতে বলতে তিনিও হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন নাতি দুরন্তর ছবি বুকে নিয়ে।

খুঁড়িয়ে চলা শহিদুল ইসলাম একসময় তাঁদের পরিবারের এক খণ্ড জমি নিয়ে বিরোধের প্রসঙ্গ তুললেন। শহিদুল জানান, তাঁরা তিন ভাই। বড় ঠাণ্ডু, মেজো মজিদ এবং তিনি ছোট। বাবা মৃত হায়াত আলী। বড় ভাই ঠাণ্ডু জমিজমা বিক্রি করে দিতেন বলে বাবা বেঁচে থাকতে বছর আটেক আগে বসতভিটার ৫ শতাংশ জমি আলাদাভাবে মজিদ ও শহিদুলের নামে লিখে দেন। কিন্তু এর মধ্যেই বছর সাতেক আগে ঠাণ্ডু ওই ৫ শতাংশ জমি থেকে আড়াই শতাংশ জমি পাশের জমির মালিক নাছিরের কাছে বিক্রি করে দেন। পরে এ নিয়ে গ্রামে সালিস হয়। সালিসে ওই আড়াই শতাংশের দাম ২৫ হাজার টাকা তাদের ফিরিয়ে দিতে বলা হয়। শহিদুলরা এই সিদ্ধান্ত মেনে নিলেও নাছির রাজি হয়নি।

শহিদুল জানান, পরে নাছির বাড়ি বানানোর সময় ওই আড়াই শতাংশ জমিতে অবস্থিত শহিদুলদের একটি টিনের ঘর ও গাছপালা সরিয়ে নিতে চাপ দেয়। কিন্তু শহিদুলরা তাতে রাজি হননি। বছরখানেক আগে এ নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে ঝগড়ায় শহিদুলকে বেদম মারধর করে নাছিরের ভাগ্নে ইউসুফ। ওই ঘটনায় শহিদুল ঘিওর থানায় অভিযোগও করেন। এলাকার গণমান্য ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত মামলা তুলে নেন তিনি। এর পরও ইউসুফ হুমকি দেয়, শহিদুলকে নির্বংশ করে ওই জমির দখল নেওয়া হবে। কথামতো তারা তাঁর ছেলেকে হত্যা করেছে বলে সন্দেহ করছেন শহিদুল।

শহিদুল জানান, দুরন্তর লাশের গলায় পেঁচানো ছিল মেয়েদের একটি সুতির জামা। পাশেই পড়ে ছিল একটি সুতির শাড়ি আর এক জোড়া বার্মিজ স্যান্ডেল। মেয়েদের সুতি জামার মতো একটি জামা ইউসুফের স্ত্রী লিপিকে, ওই শাড়ির মতো একটি শাড়ি ইউসুফের মা চায়না বেগমকে এবং স্যান্ডেলটির মতো একটি স্যান্ডেল বাঁশবাগানের পাশের বাড়ির শুকুর আলীকে পরতে দেখেছেন তাঁরা।

এরই মধ্যে এজাহারভুক্ত আসামি আনোয়ার হোসেন ও চায়না বেগমকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আর সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে পলি বেগম ও শুকুর আলীকে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জিজ্ঞাসাবাদে আনোয়ার হোসেন জানিয়েছিলেন লাশের সঙ্গে পাওয়া শাড়িটি হাফেজ উদ্দিনের স্ত্রী জাবেদা বেগমের এবং মেয়েদের জামাটি হচ্ছে তার পুত্রবধূ সুমি আক্তারের। পরে পুলিশ জাবেদা ও সুমিকে থানায় নিয়ে যায়। কিন্তু প্রায় একই ধরনের শাড়ি ও জামা দেখাতে পারায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

তবে বাড়ির পাশে লাশ পাওয়ার খবর পেয়েও শুকুর আলী সেখানে আসেনি বলে জানান দুরন্তর বাবা। শহিদুল জানান, ঘটনার রাতে সে কয়েকজনের সঙ্গে তাস খেলেছে বলে দাবি করেছে। কিন্তু তার সঙ্গীরা জানিয়েছে, রাত ১১টা পর্যন্ত তাদের সঙ্গে ছিল শুকুর। বাকি সময় কোথায় ছিল তা তারা জানে না। মাদকসংশ্লিষ্টতায় ইউসুফের সঙ্গে শুকুর আলীর সখ্য থাকায় ধারণা করা হচ্ছে সে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত।

শহিদুল আরো জানান, যখন দুরন্তকে খোঁজা হচ্ছিল তখন রাত ১টার দিকে নদীর দিক থেকে নাছিরকে হেঁটে আসতে দেখেন তাঁরা। জিজ্ঞেস করায় নাছির বলেছিল, নদীতে গোসল করতে গিয়েছিল। অত রাতে নদীতে গোসল করতে যাওয়াটা সন্দেহজনক বলে মনে করেন শহিদুল। এ ছাড়া ওই পথেই পড়ে বাঁশঝাড়।

শহিদুলের বাড়িতে ভিড় করা লোকজন জানায়, নাছির তার ভাগ্নে ইউসুফের জোরে এলাকায় মাতব্বরি করে। ইউসুফের বাবা দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে। কোনো কাজকর্ম না করলেও বাবার টাকায় সে সারা দিন বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে মোটরসাইকেলে ঘুরে বেড়ায়। মাদক নিয়ে একাধিকবার সে পুলিশের হাতে ধরাও পড়েছিল।

এলাকার মাতবর বদর আলী জানান, ইউসুফের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ। সে গ্রামের মুরব্বিদের পর্যন্ত তোয়াক্কা করে না।

বদর আলী নামের একজন বলেন, মায়ের আশকারা পেয়ে ইউসুফ আরো বখে গেছে। কোনো সমস্যায় পড়লেই টাকা-পয়সা দিয়ে ছেলেকে রক্ষা করেন তার মা।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সুনিল কর্মকার জানান, আনোয়ার হোসেন ও চায়নাকে এক দিনের রিমান্ড শেষে গতকাল জেলহাজতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার পলি বেগম ও শুকুর আলী বর্তমানে জেলহাজতে।

লাশের পাশে শাড়ি, মেয়েদের জামা ও স্যান্ডেল পাওয়ার কথা নিশ্চিত করে এসআই সুনিল বলেন, ‘এগুলো বড় ধরনের ক্লু। ’ তবে তদন্তের স্বার্থে আর কোনো তথ্য দিতে তিনি রাজি হননি।

ঘিওর থানার ওসি মিজানুর রহমান জানান, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। শিশু হত্যার মামলা হওয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত চলছে বলে তিনি জানান।

 


মন্তব্য