kalerkantho


টেস্টে ফের ওয়ানডের ব্যাটিং

১৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



টেস্টে ফের ওয়ানডের ব্যাটিং

শেষবেলায় তিন উইকেট হারানোর পরও উইকেটে এসেই চালিয়ে খেলা শুরু করেন সাকিব আল হাসান। সৌভাগ্য তাঁর সাব্বির-ইমরুলের পথ ধরতে হয়নি। ছবি : মীর ফরিদ

তাঁদের দুজনের ক্ষেত্রে ভালো-মন্দের একটা কাটাকুটি খেলা চলবেই। আর সেই খেলা দলকে এগিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা যতখানি তৈরি করবে, ঠিক ততখানি হতাশ করারও।

একদিকে দলকে দারুণ শুরু দেওয়ার নিশ্চয়তা যেমন দেবে, তেমনি সেট হয়ে বড় ইনিংস খেলা নিয়েও অনিশ্চয়তা রাখবে। এবং শেষ পর্যন্ত আশা জাগিয়েও বড় ইনিংস খেলা হবে না। গত কিছুদিন ধরে এই হলো তামিম ইকবাল আর সৌম্য সরকারের ব্যাটিংয়ের ধর্ম।

বাংলাদেশের শততম টেস্টের শেষ বিকেলে সেই ধর্ম আবার গ্রহণ করলেন ইমরুল কায়েস ও সাব্বির রহমানও। এঁদের মতো বিদায় হতে হতেও না হওয়া সাকিব আল হাসানও এমন ব্যাটিং শুরু করে দিলেন যে মনে হলো ওয়ানডে ম্যাচের অন্তিম মুহূর্তে বাংলাদেশ! জেতার জন্য ১২ বলে দরকার ২৭ রান আর সাকিব নেমেই চালাতে শুরু করলেন এবং ৫ বলে ১৫ রান করে যেন জয়ের নায়কও হওয়ার পথে! ওভাবে খেলতে গিয়েই একবার জীবন পেলেন বলেই পি সারা ওভাল টেস্টের দ্বিতীয় দিন শেষে সফরকারীদের ইনিংসের চেহারা আরো ভীতিকর হলো না।

সেই ভীতিকর চেহারাটা বেরিয়ে পড়ল দিনের শেষ ৩.৩ ওভারে। আরো নির্দিষ্ট করে বললে ৭ বলের মধ্যে গেলেন উইকেটে সেট হওয়া ইমরুল ও সাব্বির। এঁদের মাঝখানে নাইটওয়াচম্যান হিসেবে তাইজুল ইসলামকে পাঠিয়েও সুফল মেলেনি। প্রথম বলেই শেষ তাঁর ইনিংস।

তাই হঠাৎ করেই ২ উইকেটে ১৯২ থেকে বাংলাদেশের ১৯৮ রানে ৫ উইকেট নেই। ওই অবস্থায় নেমে কোথায় একটু টেস্ট উপযোগী ব্যাটিংয়ে বিপর্যয় সামাল দেওয়ার চেষ্টা দেখা যাবে, তা না করে তেড়েফুঁড়ে মারতে শুরু করে দিলেন সাকিব। এভাবে ব্যাটিং করতে গেলে আউট হওয়ার ঝুঁকি থাকে এবং সেই ঝুঁকি থেকে বেঁচে যাওয়াতেই বিপর্যয় আরো ঘনীভূত হলো না। বাংলাদেশ ৫ উইকেটেই ২১৪ রান নিয়ে দিন শেষ করতে পারল।

শ্রীলঙ্কার প্রথম ইনিংসের চেয়ে এখনো ১২৪ রানে পিছিয়ে তারা। দিনের শেষে বেশ কিছু উইকেট হারানোয় পরিস্থিতি অনুযায়ীও পিছিয়ে পড়া বাংলাদেশ দিনের শুরুতে লঙ্কানদের এগিয়ে যাওয়াও ঠেকাতে পারেনি। ৭ উইকেটে ২৩৮ রান নিয়ে দ্বিতীয় দিন শুরু করা স্বাগতিকরা আরো ১০০ রান যোগ করল। টেল এন্ডারদের নিয়েই দলকে ৩৩৮ রান পর্যন্ত নিয়ে গেলেন আগের দিন ৮৬ রানে অপরাজিত দীনেশ চান্ডিমাল। কাল তিনি করলেন টেস্ট ক্যারিয়ারের অষ্টম সেঞ্চুরি, বাংলাদেশের বিপক্ষে যেটি তাঁর চতুর্থ। সেটি করার পথে অষ্টম এবং নবম উইকেটে রঙ্গনা হেরাথ ও সুরঙ্গা লাকমলকে নিয়ে ৫০ ছাড়ানো দুটি পার্টনারশিপও গড়েছেন। ২৪৪ বলে চান্ডিমাল তিন অঙ্কের ম্যাজিক ফিগারে পৌঁছানোর পর বাংলাদেশ অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম রক্ষণাত্মক ফিল্ডিংয়ে চাপ আলগা করে লঙ্কানদের ইনিংসকে আরো সহজে বাড়তে দিয়েছেন।

এর ফায়দা ভালোমতোই তুলেছেন বাংলাদেশের সফলতম বোলার অফস্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজের (৩/৯০) তৃতীয় শিকারে পরিণত হওয়া চান্ডিমাল। তাঁর ১৩৮ রানের ইনিংসে যে লঙ্কানরা একেবারে সাধ্যের বাইরে চলে গিয়েছিল, তামিম-সৌম্যর ওপেনিং জুটির ব্যাটিং দেখে তা মনে হচ্ছিল না কিছুতেই। গল টেস্টের দুই ইনিংসেই তাঁরা দিয়েছিলেন যথাক্রমে ১১৮ ও ৬৭ রানের সূচনা। এই টেস্টেও যখন আরেকটি সেঞ্চুরি পার্টনারশিপের অপেক্ষা, তখনই ছন্দপতন। ফিফটির কাছাকাছি গিয়ে যেন অস্থির হয়ে ওঠেন তামিম। বাঁহাতি স্পিনার হেরাথের আগের বলেই তাঁর ব্যাটে ছুঁয়ে যাওয়া বল অল্পের জন্য স্লিপ ফিল্ডারের কাছে যায়নি।

মিডল স্টাম্পের ওপর করা পরের বল আড়াআড়ি ব্যাটে ডিফেন্স করতে গিয়েও বিপদ ডেকে আনেন। ফিল্ড আম্পায়ার আলীম দার নটআউট দিলেও রিভিউ নিয়ে লঙ্কানরা পেয়ে যায় তামিমের উইকেটটি। এলবিডাব্লিউ হওয়া তামিমের রান ৪৯। গত ছয় টেস্টের ১১ ইনিংসের মধ্যে একটি সেঞ্চুরি আছে বটে, কিন্তু সাতবার সেট হয়েও আউট হয়েছেন তিনি। এর মধ্যে দুটি ইনিংস ফিফটি ছাড়ানো আর দুটি ফিফটির আশপাশে। গতকাল এক কীর্তিতে তাঁকে ছুঁয়ে ফেলা সৌম্যর সীমাটাও ইদানীং ফিফটির আশপাশেই। তামিমের পর দ্বিতীয় বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান হিসেবে টানা তিন টেস্ট ইনিংসে ফিফটি করলেন।

কিন্তু তাঁর ফিফটি মানেই ধরে নেওয়া যেতে পারে যে এই বুঝি যাওয়ার সময় হলো! সেই সময় এসেও গেল। চায়নাম্যান লাকশান সান্দাকানের টার্ন করে ভেতরে ঢোকা বল এক পা বাইরে বেরিয়ে কাভারে ড্রাইভ খেলতে গিয়ে বোল্ড। তাই সবশেষ দুটি টেস্ট ইনিংসের (৭১ ও ৫৩) মতো এটিরও অকাল সমাপ্তি ৬১ রানে। তামিম-সৌম্যর যেখানে শেষ, সেখান থেকে শুরু ইমরুল-সাব্বিরের। ৬২ রানের পার্টনারশিপ গড়ার পথে ২৫ রানে একবার জীবন ফিরে পাওয়া ইমরুল (৩৪) শেষ বিকেলে সেই সান্দাকানের আরেকটি টার্ন করে ভেতরে ঢোকা বলে পুল করতে গিয়ে হন এলবিডাব্লিউ। পরের বলে নাইটওয়াচম্যান তাইজুল ইসলামেরও একই পরিণতি। সাকিব নেমে বাউন্ডারিতে সান্দাকানের হ্যাটট্রিক ঠেকিয়েই থামেননি, মারধরও চালিয়ে যেতে থাকেন। একই বোলারকে স্লগ করতে গিয়ে ডিপ মিড উইকেটে উপুল থারাঙ্গার সৌজন্যে সাকিব বেঁচে গেলেও এর আগেই পেসার লাকমলের শর্ট বলে লেগ গালিতে পাতা ফাঁদে ধরা দেন সাব্বিরও (৪৬)। সব মিলিয়ে দারুণ শুরুতে যা পেয়েছিল বাংলাদেশ, তা হারানোর পথেও। সেই পথে কাঁটা বিছিয়ে তৈরি ইতিমধ্যেই ৩ উইকেট তুলে নেওয়া সান্দাকানও। সিনহালা ভাষায় তাঁর নামের অর্থ ‘চাঁদের আলো’।

কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাটিং তো আবার দেখাচ্ছে অমাবস্যার অন্ধকার। যে অন্ধকার নেমে এসেছে ভালো-মন্দের কাটাকুটি খেলায়!


মন্তব্য