kalerkantho


বোমায় ক্ষতবিক্ষত লাশ

নিহতদের মধ্যে মিরপুরের নিখোঁজ রাফিদ-আয়াদ!

এস এম আজাদ, ঢাকা ও এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

১৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



নিহতদের মধ্যে মিরপুরের নিখোঁজ রাফিদ-আয়াদ!

পাসপোর্টের ফটোকপি থেকে পাওয়া রাফিদের ছবি

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের প্রেমতলায় ‘ছায়ানীড়’ নামের বাড়িতে চালানো ‘অপারেশন অ্যাসল্ট সিক্সটিন’ অভিযানে নিহত চার জঙ্গির মধ্যে দুজনের পরিচয়ের সূত্র পেয়েছে চট্টগ্রাম পুলিশ ও ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। আত্মঘাতী বোমায় ছিন্নবিচ্ছিন্ন হওয়া মরদেহ দুটি রাজধানীর মিরপুরের পূর্ব মনিপুর থেকে নিখোঁজ হওয়া আহমেদ রাফিদ আল হাসান (১৮) ও আয়াদ হাসানের (১৮) বলে ধারণা করা হচ্ছে। তারা দুজন আপন খালাতো ভাই।

‘ছায়ানীড়ে’ অভিযানের আগে বুধবার সন্ধ্যায় সীতাকুণ্ড পৌরসভার আমিরাবাদ নামারবাজারে ‘সাধনকুটির’ নামে আরেকটি বাড়ি থেকে জসিম ও আরজিনা নামের দম্পতি দুই জঙ্গিকে আটক করে পুলিশ। সিটিটিসি ইউনিটের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল বৃহস্পতিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদে জসিম ও আরজিনা জানিয়েছে, ছায়ানীড়ে নিহতদের মধ্যে ঢাকার মিরপুরের রাফিদ ও আয়াদও রয়েছে। তাদের লাশ বোমার আঘাতে এমনই ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে যে তা শনাক্ত করা সম্ভব নয়। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমেই তাদের পরিচয় নিশ্চিত হতে হবে। নিহত অন্য দুই নারী-পুরুষের পরিচয়ও শনাক্তের চেষ্টা চলছে। ’

নিহতদের মধ্যে মিরপুরের রাফিদ ও আয়াদ আছে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রামে থাকা সিটিটিসি ইউনিটের অতিরিক্ত উপকমিশনার আব্দুল মান্নান বলেন, ‘আমরাও এমনটা শুনেছি। তবে এটা কনফার্ম করে বলা যাচ্ছে না। ’

গতকাল দুপুরে রাফিদ ও আয়াদের মিরপুরের বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীরা বলেন, তাঁরা এ বিষয়ে কিছু জানেন না। এ বিষয়ে কোনো তথ্য নেই স্থানীয় থানা পুলিশের কাছেও। জানতে চাইলে মিরপুর থানার ওসি নজরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এমন নিখোঁজদের তালিকা করে সিটি তদন্ত করছে। এদেরটাও তদন্ত চলছে। আমাদের কাছে কোনো হালনাগাদ তথ্য নেই। ’

পুলিশ ও পারিবারিক সূত্র জানায়, রাজধানীর পূর্ব মনিপুরের ধনাঢ্য পরিবারের তরুণ রাফিদ ও আয়াদ গত বছর এ-লেভেল পরীক্ষা দেয়। ৯ আগস্ট নিখোঁজ হওয়ার আগে তারা বাসায় একটি চিরকুট রেখে যায়। যাতে লেখা ছিল—‘আমরা আমাদের পথ খুঁজে পেয়েছি, আমাদের চলে যাওয়ার জন্য আরেফিনকে দায়ী করো না’। এ ঘটনায় আয়াদের মা মুনমুন আহমেদ মিরপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি (নম্বর ৬৩৭) করেন। চিরকুটে উল্লেখ করা আরেফিন হচ্ছে রাফিদ ও আয়াদের দূরসম্পর্কের মামাত ভাই। ধারণা করা হচ্ছে, আরেফিনের মাধ্যমেই জঙ্গি দলে যোগ দেয় তারা। পরে পুলিশ আরেফিনকে গ্রেপ্তার করে। তবে তখন দুজন নিখোঁজের সূত্র মেলেনি।

চট্টগ্রাম পুলিশের সূত্র জানায়, গতকাল সকালে ছায়ানীড়ে অভিযান শেষ হওয়ার পর বাসাটির ভেতর চারটি মৃতদেহ পায় পুলিশ। এর মধ্যে দুজন আত্মঘাতী, তাদের দেহ বোমার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। আরেকজনের পা উড়ে গেছে। এ ছাড়া এক নারীর ক্ষত-বিক্ষত লাশ মিলেছে, যার দেহে সুইসাইডাল ভেস্ট আছে, তিনি ইটের নিচে চাপা পড়ে আছেন। ঢাকা থেকে যাওয়া সিটিটিসি ইউনিট, সোয়াত ও বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের সদস্যরা গতকাল ঘটনার তদন্ত করছিলেন। নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করতে তাঁরা জসিম ও আরজিনা নামের দুই জঙ্গিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

মিরপুরের দুই তরুণের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা জিডির সূত্র ধরে গতকাল পূর্ব মনিপুর গিয়ে একাধিক সূত্রে জানা গেছে, রাফিদ ও আয়াদের নানা আইনউদ্দিন আহমেদ একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। পূর্ব মনিপুরের ১২৭০ নম্বর হোল্ডিংয়ে আইনউদ্দিনের বড় তিনতলা বাড়ি। বাড়ির এক পাশে দুই বছর আগে জামিয়া ইসলামিয়া দারুল নূর নামে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। তাঁর তিন মেয়ের মধ্যে আয়াদের মা মুনমুন আহমেদ বড়। মেজ মেয়ে নীলুফার ইয়াসমিন শিল্পীর ছেলে রাফিদ। ছেলে না থাকায় মেজ ও ছোট মেয়েকে নিজের বাড়িতে রাখেন আইনউদ্দিন। নীলুফার স্বামী অর্থাত্ রাফিদের বাবা তৌফিক হাসান শ্বশুরের ব্যবসা দেখাশোনা করেন। তিনি আগে জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি কেরানীগঞ্জের একটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান প্রার্থী হয়ে পরাজিত হন। ছেলে নিখোঁজ হওয়ার পর তিনি দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন। সম্প্রতি দেশে ফেরেন। তাঁর দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে রাফিদ ছোট। সে ব্রিটিশ কাউন্সিলের মাধ্যমে এ লেভেল পরীক্ষা দিয়েছিল। বড় ছেলে রাকিব মেডিক্যালের ছাত্র। অন্যদিকে আয়াদের মা-বাবা আগে সৌদি আরব ছিলেন। দুই বছর আগে আয়াদের বাবা আলী হাসান মারা যাওয়ার পর তাঁরা দেশে ফেরেন। আয়াদ পরিবারের সঙ্গে মনিপুরের  বাসায় থাকত। সে একটি ইংরেজি মাধ্যমের প্রতিষ্ঠানে কোচিং করে এ লেভেল পরীক্ষা দেয়।

সিটিটিসির এক কর্মকর্তা জানান, গত ৮ অক্টোবর গাজীপুরে পুলিশি অভিযানের পর আয়াদ ও রাফিদের স্বজনরা সেখানে তাদের লাশ আছে কি না, খোঁজ নেয়। তাঁরা নিহত জঙ্গিদের ছবি দেখে নিশ্চিত হন, এখানে তাদের ছেলেরা নেই। জিডি হওয়ার পরই পুলিশ আরেফিন ইসলামকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করে। জিজ্ঞাসাবাদের পরে তাকে জেলহাজতে পাঠানো হয়। আরেফিন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি বিভাগের অষ্টম সেমিস্টারের ছাত্র ছিলেন। ‘সহশিক্ষা’ ধর্মসম্মত নয়, এই যুক্তিতে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া বন্ধ করে দেন। আয়াদ ও রাফিদের পরিবারের দাবি, আরেফিন ফেসবুকে আইএসের পক্ষে লেখা ও ছবিতে লাইক দিতেন। আরেফিন নিখোঁজ দুই তরুণকে বিভিন্ন পুস্তিকা ও আইএসের মতাদর্শ প্রচারের বাংলা ব্লগ আত-তামকীনসহ ইন্টারনেটের বিভিন্ন সাইটের সঙ্গেও পরিচয় করান। অবশ্য আয়াদ ও রাফিদ বাসায় যে চিরকুট রেখে যায়, তাতে মামাতো ভাই আরেফিনকে দায়ী না করতে বলেছে।

স্বজনদের বরাত দিয়ে সূত্র জানায়, রাফিদ, তাঁর বড় ভাই রাকিব ও প্রতিবেশী মামাত ভাই আরেফিন একসঙ্গে থাকতো। দেশে ফিরে তিনজনের সঙ্গে যোগ দেয় আয়াদ। আয়াদের মা মুনমুন আহমেদ তার ও-লেভেলে পরীক্ষার্থী ছেলেকে পড়ানোর দায়িত্ব দেন রাকিবের ওপর। তখন আরেফিনের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠতা বাড়ে।


মন্তব্য