kalerkantho


খন্দকার ম হামিদ রন্জু

আমার দুঃখ শহীদ হইনি

তায়েফুর রহমান, সাভার   

১৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



আমার দুঃখ শহীদ হইনি

“১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় আমাকে নতুনভাবে অনুপ্রাণিত করে। চার খলিফা হিসেবে পরিচিত আ স ম আবদুর রব, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ ও আবদুল কুদ্দুস মাখনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।

এ সূত্রে আ স ম আবদুর রব তাঁর রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘নিউক্লিয়াস’-এ আমাকে সদস্য করে নেন। তিনি আগেই দেশের স্বাধীনতার ব্যাপারে ধারণা দিয়েছিলেন। তখন থেকে আমি স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের পক্ষপাতি। ”

‘বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের জ্বালাময়ী বক্তব্য স্বাধীনতাযুদ্ধের ব্যাপারে আমাকে আরো উজ্জীবিত করে। অবশ্য এর আগেই (১ মার্চ) স্থানীয় কয়েকজন যুবককে নিয়ে সাভার অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ডামি রাইফেল দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ শুরু করেছিলাম। ২ মার্চ আ স ম আবদুর রব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। ওই দিনই আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করে সাভারেও স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনের অনুরোধ জানাই। ৫ মার্চ অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আমরা কয়েকজন মিলে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করি। এর আগে ৩ মার্চ বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে শাজাহান সিরাজ পল্টন ময়দানে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেন।

কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপচারিতায় এসব কথা জানান খন্দকার ম হামিদ রন্জু। তিনি বলেন, ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের খবর ঢাকার রেডিওতে শুনতে না পেয়ে তাঁর মনে পাকিস্তান সরকারের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা জন্মেছিল।

খন্দকার হামিদ বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের জনসভায় সর্বস্তরের মানুষকে উপস্থিত করানোর জন্য সাভার এলাকায় প্রচারের দায়িত্ব পড়ে আমার ওপর। মুড়ির টিনের মতো একটি বাসে করে সাভার থেকে একদল কর্মী নিয়ে সকাল ১১টার দিকে বঙ্গবন্ধুর জনসভায় যোগ দিই। রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের সময় স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সদস্য হিসেবে মঞ্চের নিরাপত্তাবেষ্টনীর ভেতরে ছিলাম। ’

‘একটি সাদা রঙের টয়োটা গাড়িতে কালো পতাকা উড়িয়ে সেদিন বঙ্গবন্ধু মঞ্চে এসে উপস্থিত হন। মাইক নিয়ে কাউকে কোনো সম্বোধন ছাড়াই দরাজ গলায় তিনি বলে উঠলেন—ভাইয়েরা আমার, আজ দুঃখ-ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের কাছে হাজির হয়েছি। ...বঙ্গবন্ধুর জাদুকরী ভাষণ সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্মোহিত করে। ’

‘এ বক্তব্য শোনার পর আমি দ্বিগুণ উৎসাহে সাভারের ১২টি ইউনিয়নে ঘুরে ঘুরে স্বাধীনতার সপক্ষে বক্তব্য দিয়ে লোকজনকে সংগঠিত করতে থাকি। ২৫ মার্চ পর্যন্ত এভাবেই চলতে থাকে। ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় অপারেশন সার্চলাইট চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। তারা সাভারে যেন প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য কয়েক যুবককে নিয়ে মিরপুর লোহার ব্রিজে (আমিনবাজার পুরাতন ব্রিজ) বুলডোজার, কাঠের গুঁড়ি ও অন্যান্য সামগ্রী দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করি। বলিয়ারপুর ও হেমায়েতপুরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে গাছ ফেলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করি। বাইপাইল মোড়ে ব্রিজ নির্মাণের জন্য রাখা সামগ্রী দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করি। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নয়ারহাটে ফেরি চলাচল বন্ধ করে দিই। প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে মিরপুর ব্রিজ হয়ে জিপ নিয়ে ১ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী সাভারে প্রবেশ করে। সাভার থানার ওসি আব্দুল মজিদ স্বাধীনতার পক্ষের লোক ছিলেন। তার পরও তিনি আমাকে ও আশরাফ উদ্দিন খান ইমুকে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। না হলে আমাদের গ্রেপ্তার করা হবে জানান। ’

‘অতঃপর আমি ও ইমু এলাকা ছেড়ে পার্শ্ববর্তী মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর থানার রায়দক্ষিণ গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নিই। সেখান থেকে আট যুবককে সংগ্রহ করি। সাভারের মোজাম্মেল হক ও আব্দুল কাইউমকে সঙ্গে নিয়ে ১২ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা হয়ে ভারতের বক্সনগর থানায় প্রবেশ করি আমরা। ভারতের বিভিন্ন স্থানে ঘোরাঘুরি করে প্রশিক্ষণের কোনো সুযোগ না পেয়ে মনঃকষ্টে ভুগতে থাকি। দুই বেলা খাবারের সুযোগও মিলছিল না। পরে মোজাম্মেল হক ও আব্দুল কাইউমকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে যাই আগরতলায়। পূর্ব সম্পর্কের সূত্র ধরে সেখানে আ স ম আবদুর রবের সঙ্গে দেখা করি। পরদিনই তিনি ভারতীয় একটি কার্গো বিমানযোগে আমাদের তিনজনকে প্রশিক্ষণের জন্য দেরাদুন মিলিটারি একাডেমিতে পাঠিয়ে দেন। দুই মাস কঠোর পরিশ্রম করে প্রশিক্ষণ নিই। আগস্টের শেষ সপ্তাহে বেশ কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে ফিরে আসি সাভারে। ’

‘সাভারের অবস্থান ঢাকার খুব কাছে হওয়ায় পাকিস্তানি আর্মির যাতায়াত ছিল অবাধ। তাই এখানে কোনো ক্যাম্প করার সুযোগ পাইনি। চলে যাই মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর থানার রায়দক্ষিণ গ্রামে। সেখানে বিরাট বাহিনী গড়ে তুলি। সাভার, ধামরাই ও মানিকগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে যুবকদের সংগঠিত করে প্রশিক্ষণ দিতে থাকি। তবে ছোটখাটো কিছু ঘটনা ছাড়া এই এলাকায় বড় কোনো যুদ্ধ সংগঠিত হয়নি। ফলে বড় যুদ্ধে অংশগ্রহণের সুযোগ হয়নি। ’

স্মরণীয় ঘটনার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘১ ডিসেম্বর একটি রাইফেল সঙ্গে নিয়ে চাপাইন ও ডেইরি ফার্ম এলাকা হয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী আব্দুল গফুরের বাসায় যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে পাকিস্তাানি বাহিনীর এক দালাল আমাকে দেখতে পেয়ে রেডিও ট্রান্সমিশন অফিসে অবস্থানরত পাকিস্তানি বাহিনীকে খবর দেয়। তারা এসে আমাকে না পেয়ে অহেতুক ফায়ার শুরু করে। আমি পার্শ্ববর্তী ধানক্ষেতে লুকিয়েছিলাম। পাকিস্তানি আর্মি চলে গেলে আব্দুল গফুরের বাসায় যাই। কিন্তু এরই ভেতর বাড়িতে খবর চলে যায় যে আমি পাকিস্তানি আর্মির গুলিতে মারা গেছি। সবাই কান্নায় ভেঙে পড়ে। পরদিন পাকিস্তানি বাহিনী প্রকৌশলী আব্দুল গফুরের বাসায় আমার অবস্থানের খবর পেয়ে অভিযানে যায়। তবে গফুরের কথায় বাসার ভেতরে প্রবেশ না করে চলে যায়। সেদিনও নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যাই। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আমি তিন রাজাকারকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করি। তাদের কাছ থেকে তিনটি রাইফেল ও ৪৫০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করি। ’

খন্দকার হামিদ বলেন, ‘যে স্বপ্ন নিয়ে সেদিন মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম, সে স্বপ্ন থেকে আমরা এখন অনেক দূরে। আমার গর্ব—আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। আর আমার দুঃখ—মুক্তিযুদ্ধে আমি শহীদ হইনি। ’

খন্দকার ম হামিদ রন্জুর বাড়ি সাভারের গেণ্ডা মহল্লায়। খন্দকার আব্দুল মজিদ ও ইয়াকুত নেছার দ্বিতীয় সন্তান তিনি। ১৯৭১ সালে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়তেন, সাভার কলেজে। ওই সময় ছাত্রলীগের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সদস্যও ছিলেন। ভাষাশহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার নির্মাণ পাকিস্তান সরকার নিষিদ্ধ করেছিল। তার পরও ১৯৬৮ সালে সাভার অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের স্বর্ণময়ী ছাত্রাবাসের সামনে রাতে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়; হারিকেনের আলোয়। নির্মাণকাজে নেতৃত্ব দেন তিনি। সাভারে এটিই প্রথম শহীদ মিনার।


মন্তব্য