kalerkantho


বৃষ্টির আগে ঝলমলে দিন বাংলাদেশের

১৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



বৃষ্টির আগে ঝলমলে দিন বাংলাদেশের

বাংলাদেশের শততম টেস্টের প্রথম দিনে বল হাতে আলো ছড়িয়েছেন বোলাররা। মুস্তাফিজের বোলিংয়ে দিমুথ করুণারত্নের দুর্দান্ত ক্যাচ নেওয়ার পর মেহেদীকে অভিনন্দন মুশফিকের। ছবি : মীর ফরিদ, কলম্বো থেকে

সন্ধ্যায় প্রেস বক্সে বসে যখন এই লেখা লিখতে শুরু করেছি, ততক্ষণে তুমুল বৃষ্টিতে পি সারা ওভালের চারপাশটা রীতিমতো জলমগ্ন! এরই মধ্যে এক এক করে টিমবাসে উঠে যাওয়া বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটাররা অবশ্য বৃষ্টিতে খেলা বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত ঝলমলে রোদেলা দিনই পার করেছেন। শততম টেস্টের প্রথম দিনটি যে চালকের আসনে থেকেই শেষ করা গেছে।

কখনো কখনো শ্রীলঙ্কাকে এমন কোণঠাসা করেছে যে মনে হয়েছে দিনের শেষে বোধ হয় বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসও শুরুই করে দিতে হবে। বাংলাদেশের বিপক্ষে সচরাচর যাঁর ব্যাটে রানের দেখা মেলে, সেই দীনেশ চান্ডিমাল আবার দাঁড়িয়ে যাওয়াতেই আর তা হয়নি। এর আগে তিন-তিনটি সেঞ্চুরি তাঁর সফরকারীদের বিপক্ষে। এখানে প্রথম দিনের শেষে তিনি চতুর্থটিরও খুব কাছাকাছি। যে কারণে বৃষ্টিতে প্রায় ৭ ওভার আগেই খেলা শেষ হওয়ার সময় স্বাগতিকদের সংগ্রহ ৭ উইকেটে ২৩৮ রান।

ওভারপ্রতি রান তোলার হার তিনেরও বেশ কম। এই যুগে এমন আদিকালের টেস্ট ব্যাটিংয়ের দেখাও কদাচিৎই মেলে। দলের বিপদে এবি ডি ভিলিয়ার্সদেরও যেখানে কখনো কখনো প্রস্তুর যুগের ব্যাটিংয়ে ফিরে যেতে হয়, সেখানে চান্ডিমালও ঠিক তা-ই করলেন। তাঁর ২১০ বলে হার না মানা ৮৬ রানের ইনিংসটিতে এ জন্যই বাউন্ডারির সংখ্যা মাত্র চার।

অথচ এই টেস্টে লঙ্কানদের চতুর্থ স্পিনার হিসেবে খেলার সুযোগ পাওয়া ধনঞ্জয়া ডি সিলভার ৩৪ রানের ইনিংসটিতেই বাউন্ডারির মার পাঁচটি। উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান নিরোশান ডিকওয়েলা তো পেসার শুভাশীষ রায়ের এক ওভারেই মেরেছেন তিন-তিনটি বাউন্ডারি।

বাড়তি স্ট্রোক খেলতে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে অনেক। সেই ঝুঁকিটা বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরাই সাধারণত প্রমাণ করে থাকেন। গল টেস্টের শেষ দিনের ব্যাটিং যার সবশেষ উদাহরণও হয়ে আছে। কলম্বোতে আসতে না আসতেই সেই একই দৃশ্যের মঞ্চায়ন। তবে এবার একটু অদল-বদল হলো। গল টেস্টে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের ভূমিকাটা এবার নিলেন লঙ্কানরা। সুবাদে প্রথম দিনেই বাংলাদেশের চড়ে বসার সুযোগ। আর সেই সুযোগ তৈরির জন্য শততম টেস্টের শুরু থেকেই তেতে ছিলেন বাংলাদেশের বোলাররাও।

মাঠে গিয়ে যখন তাঁদের শরীরী ভাষা বদলায়, তখন বদলায় পারফরম্যান্সও। গলে প্রথম দিকে একটু জড়সড় মনে হওয়া মুস্তাফিজুর রহমানকে এবার তাই শুরু থেকেই মনে হলো দারুণ ছন্দে আছেন। নিজের প্রথম দুটি ওভারই করলেন মেডেন। মাঝখানে শুভাশীষের করা ম্যাচের দ্বিতীয় ওভারটিও তা-ই। নিজেদের ইতিহাসে কোনো টেস্টের প্রথম তিন ওভারই মেডেন দেওয়ার ঘটনাও বাংলাদেশের ক্রিকেট শততম ম্যাচে এসেই দেখল প্রথম! আর কে না জানে যে রান করা আটকে দিলে ব্যাটসম্যানের ভুল করার সম্ভাবনা জাগে। মুস্তাফিজের করা অফ স্টাম্পের বেশ বাইরের বলই যেমন জায়গায় দাঁড়িয়ে চালিয়ে গালিতে মেহেদী হাসান মিরাজের দারুণ ক্যাচ হলেন লঙ্কান ওপেনার দিমুথ করুণারত্নে (৭)।

তাঁকে দিয়ে শুরুর পর লঙ্কানদের নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারানো চলতেই থাকল। গল টেস্টের ম্যাচসেরা কুশল মেন্ডিস (৫) অবশ্য করুণারত্নের মতো উইকেট দিলেন না, বরং ড্রিফটারে তাঁকে পরাস্ত করলেন অফস্পিনার মিরাজ। আর লিটন কুমার দাশের ইনজুরিতে শততম টেস্টে কিপিংয়ে ফিরে মুশফিকুর রহিমও সমালোচকদের কোনো সুযোগ দিলেন না আর। স্টাম্পিংটা করলেন ঠিকঠাক।

এর সঙ্গে চলতে থাকল ভুলের মহড়াও। আরেক ওপেনার উপুল থারাঙ্গাই (১১) যেমন মিরাজের টার্ন করে বেরিয়ে যেতে থাকা বলে খোঁচা মেরে প্রথম স্লিপে হলেন সৌম্য সরকারের ক্যাচ। মধ্যাহ্ন ভোজের বিরতির ঠিক আগে আঘাত হানলেন শুভাশীষও, আসেলা গুণারত্নেকে (১৩) ফেললেন এলবিডাব্লিউর ফাঁদে। তাতে ৪ উইকেটে ৭০ রান নিয়ে মধ্যাহ্ন ভোজ সারতে যায় লঙ্কানরা। ফিরেই প্রতিরোধের চেষ্টা, ধনঞ্জয়াকে নিয়ে চান্ডিমাল ৬৬ রানের পার্টনারশিপ গড়ার পর আবার বাংলাদেশের ভূত স্বাগতিকদের কাঁধে। স্টাম্পের ওপর বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলামের নিচু হওয়া বল পুল করতে গিয়ে বোল্ড ধনঞ্জয়া। চা বিরতির একটু পরেই আরেকটি পার্টনারশিপে দলকে উতরে নেওয়ার সম্ভাবনা বিসর্জনে পাঠান ডিকওয়েলাও (৩৪)। সাকিব আল হাসানকে রিভার্স সুইপ খেলতে গিয়ে নড়ে যায় তাঁর লেগ স্টাম্প।

তাতেই টেইল এন্ডারদের নিয়ে লড়াই শুরু চান্ডিমালের। মুস্তাফিজ এসে দিলরুয়ান পেরেরাকে তুলে নেওয়ার পর মনে হচ্ছিল লঙ্কানদের অলআউট করে দেওয়াটা কেবলই সময়ের ব্যাপার। কিন্তু অধিনায়ক রঙ্গনা হেরাথকে (১৮*) নিয়ে বৃষ্টির আগ পর্যন্ত সময়টা দিব্যি পার করে দেওয়া বাংলাদেশ শিবিরে অবশ্য দিনের শেষে অসন্তোষ ছিল। সেটি সাকিবের বলে ৩৮ রানে থাকা চান্ডিমালকে দেওয়া ফিল্ড আম্পায়ারের আউটের সিদ্ধান্ত রিভিউতে বদলে যাওয়ায়। টিভি আম্পায়ার দেখার পর বদলে গেছে তাইজুলের বলে ফাইন লেগে মিরাজের নেওয়া দুর্দান্ত ডাইভিং ক্যাচে ৪৬ রানে থাকা চান্ডিমালের আউট হওয়ার সিদ্ধান্তও। বল যে মাটিতে সামান্য ড্রপ খেয়ে পৌঁছেছিল মিরাজের হাতে। তবু মুস্তাফিজের মতো দুটি উইকেট নেওয়া এই তরুণের প্রচেষ্টা ছিল প্রশংসিত হওয়ার মতোই। শততম টেস্টের প্রথম দিনে দেখা মিলেছে এমন আরো অনেক ঝলকেরও। তাতেই বৃষ্টির আগে ঝলমলে রোদেলা দিন বাংলাদেশের।


মন্তব্য