kalerkantho


ই-মেইল হ্যাকিং

এবার বাংলাদেশের করাচি মিশনের অর্থ বেহাত

মেহেদী হাসান ও আবুল কাশেম   

১৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



এবার বাংলাদেশের করাচি মিশনের অর্থ বেহাত

পাকিস্তানের করাচিতে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার নূর-ই হেলাল সাইফুর রহমানের ই-মেইল অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে ৩৪ হাজার ইউরো হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ২৯ লাখ টাকা।

জার্মানি থেকে হাইকমিশনের জন্য একটি মার্সিডিস বেঞ্জ গাড়ি ফ্ল্যাগ কার হিসেবে কেনার জন্য হ্যাকারদের খপ্পরে পড়ে ওই অর্থ বার্লিনের একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বদলে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ম্যানচেস্টারের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। ১৯ জানুয়ারি ওই অর্থ বেহাত হলেও তা করাচি মিশন বুঝতে পারে পরের দিন। খোয়া যাওয়া অর্থ উদ্ধারে বার্লিন ও ম্যানচেস্টারে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশন মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থিত সব বাংলাদেশ মিশনকে আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আদেশ দিয়েছে সরকার।

করাচির ডেপুটি হাইকমিশনারের গাড়ি কেনার অর্থ বেহাত হওয়ার তথ্য গত ২৬ জানুয়ারি অর্থ বিভাগের তখনকার সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদকে লিখিতভাবে জানান পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক। মাহবুব আহমেদ ওই দিনই বিষয়টি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে অবহিত করেন। ই-মেইল হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ বেহাত হওয়ার ঘটনা ও হারানো অর্থ পুনরুদ্ধারে নেওয়া উদ্যোগগুলো জেনে মুহিত সারসংক্ষেপে লিখেছেন, ‘ধন্যবাদ। যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তার অতিরিক্ত কি কিছু করা যায়? বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শ কী?’ অর্থ বিভাগকে লেখা শহীদুল হকের চিঠি ও অর্থমন্ত্রীর নির্দেশনা কালের কণ্ঠ’র কাছে রয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অর্থ চুরির এ ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন, এ ঘটনার কারণ উদ্ঘাটনের জন্য একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এরই মধ্যে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মিশনপ্রধানদের লিখিত বক্তব্য চাওয়া হয়েছে।

অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিবকে লেখা পররাষ্ট্রসচিবের আধাসরকারি পত্র এবং অর্থমন্ত্রীর নির্দেশনার তথ্য জানিয়ে নূর-ই হেলাল সাইফুর রহমানের কাছে হ্যাকিংয়ের ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি পুরোপুরি তা অস্বীকার করেন। কালের কণ্ঠকে গতকাল সন্ধ্যায় তিনি বলেন, ‘এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। ’

তবে পাকিস্তানে বাংলাদেশ মিশনের একটি সূত্র বলে, ‘এ ধরনের একটি খবর আমরা শুনেছি। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। ’

বিষয়টি জানার পরই তাত্ক্ষণিকভাবে জার্মানির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ কর্তৃপক্ষকে ঘটনাটি জানিয়ে অর্থ উদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বার্লিনের বাংলাদেশ দূতাবাসকে নির্দেশ দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন শহীদুল হক। তিনি বলেন, এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের লন্ডন ও ম্যানচেস্টারে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোকেও ওই অর্থ উদ্ধারের জন্য ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। তা ছাড়া বার্লিন ও ম্যানচেস্টারে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনকে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত রেখে এ বিষয়ে পুলিশ কেই ফাইল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হক চিঠিতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন, করাচির বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশন মার্সিডিস বেঞ্জ ব্র্যান্ডের একটি গাড়ি ফ্ল্যাগ কার হিসেবে ব্যবহারের জন্য জার্মানি থেকে কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। সে মোতাবেক বার্লিনে অবস্থিত দাইমিয়ার এজি স্টাটগার্ট নামক একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ক্রয় চুক্তি করে। চুক্তি অনুযায়ী করাচির ডেপুটি হাইকমিশন ৪০ হাজার ইউরো বাংলাদেশের বার্লিন দূতাবাসের ব্যাংক হিসাবে পাঠায়। চুক্তি অনুযায়ী গত বছরের অক্টোবর মাসে মোট মূল্যের ১৫ শতাংশ করাচিতে বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার নূর-ই হেলাল সাইফুর রহমানের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের বার্লিন দূতাবাস বার্লিনে অবস্থিত ডয়চে ব্যাংকে দাইমিয়ার এজি স্টাটগার্টের হিসাব নম্বরে পাঠিয়ে দেয়।

শহীদুল হক লিখেছেন, গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর দাইমিয়া চুক্তির অবশিষ্ট ৩৪ হাজার ১১ ইউরো পরিশোধের জন্য করাচি মিশনকে অনুরোধ জানায়। ওই অর্থ পাওয়ার পর গত জানুয়ারি মাসেই গাড়িটি হস্তান্তর করার কথা বলে কম্পানিটি। ওই দিনই করাচি মিশন হতে ই-মেইলের মাধ্যমে বার্লিনের বাংলাদেশ দূতাবাসকে বাকি অর্থ দাইমিয়ার ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। পরের তিন দিন বার্লিনের বাংলাদেশ দূতাবাস বন্ধ ছিল বিধায় ওই অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। এর পরই শুরু হ্যাকিংয়ের ঘটনা।

শহীদুল হকের বর্ণনা অনুযায়ী, গত ১৯ ডিসেম্বর করাচিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনারের ব্যক্তিগত ই-মেইল থেকে আরেকটি ই-মেইলের মাধ্যমে বাকি অর্থ আগের ব্যাংক হিসাবে না পাঠিয়ে নতুন একটি হিসাব নম্বর দিয়ে সেখানে পাঠানোর অনুরোধ করা হয়। কারণ হিসেবে বলা হয়, আগের ব্যাংক হিসাব নম্বরটি অ্যাকাউন্ট ডিপার্টমেন্ট নিরীক্ষা করছে। তাই সেখানে অর্থ পাঠানো সম্ভব নয়। অবশিষ্ট অর্থ পাঠানোর জন্য দাইমিয়ার নামে ম্যানচেস্টারের ন্যাটওয়েস্ট ব্যাংকের একটি হিসাব নম্বর দেওয়া হয়। পরে জানা যায়, ১৯ ডিসেম্বরের ওই ই-মেইলটি ডেপুটি হাইকমিশনার পাঠাননি। শহীদুল হকের ধারণা, করাচির ডেপুটি হাইকমিশনারের ই-মেইল অ্যাকাউন্টটি হ্যাকড হয়েছিল, যা তিনি এবং বার্লিনের বাংলাদেশ দূতাবাসের কেউই জানতেন না।

হ্যাকারদের ওই ই-মেইল পেয়ে ১৯ ডিসেম্বরই বার্লিনের বাংলাদেশ দূতাবাসে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ইমতিয়াজ আহমেদ ম্যানচেস্টারের ন্যাটওয়েস্ট ব্যাংকের হিসাবে অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। একই দিনে অর্থ পাঠানোর প্রমাণ হিসেবে ন্যাটওয়েস্ট ব্যাংকের দেওয়া কনফরমেশন স্লিপটি করাচির ডেপুটি হাইকমিশনারকে ই-মেইল করেন তিনি। ওই ই-মেইলটিও হ্যাকড হয় বলে ধারণা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। কারণ যে কনফরমেশন স্লিপটি ডেপুটি হাইকমিশনার গ্রহণ করেন, তাতে ১৫ ডিসেম্বর যে ব্যাংক হিসাব নম্বর দেওয়া হয়েছিল (আগেরবার যে অ্যাকাউন্টে অর্থ জমা দেওয়া হয়) সেখানে অর্থ পাঠানো হয়েছে বলে দেখানো হয়। ফলে করাচি মিশন বুঝতে পারেনি ওই অর্থ আসলে ম্যানচেস্টারের ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হয়েছে। শহীদুল হক চিঠিতে লিখেছেন, ‘ধারণা করা যায় হ্যাকারগণ সময় ক্ষেপণের জন্য কনফরমেশন স্লিপটিতে পরিবর্তন ঘটায়। ’

এদিকে হ্যাকারদের পাঠানো পরিবর্তিত কনফরমেশন স্লিপের মেইল পেয়ে নূর-ই হেলাল সাইফুর রহমান দাইমিয়ার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ই-মেইল করে অর্থপ্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করতে অনুরোধ জানান। কিন্তু ওই ব্যক্তি ১৯ জানুয়ারি এর উত্তর দেননি। বারবার যোগাযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পরের দিন কম্পানিটির প্রতিনিধি করাচি মিশনের ডেপুটি হাইকমিশনারকে ই-মেইলে জানান, যে কনফরমেশন স্লিপটি পাঠানো হয়েছে তা জাল এবং যে ন্যাটওয়েস্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অর্থ পাঠানো হয়েছে, সেটিতে তাদের কোনো লেনদেন হয় না।


মন্তব্য