kalerkantho


সীতাকুণ্ডে ‘জেএমবি’র দুই আস্তানা

গ্রেনেড, সুইসাইড ভেস্ট উদ্ধার ‘ছায়ানীড়ে’ অভিযান

এস এম রানা, সীতাকুণ্ড থেকে   

১৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



গ্রেনেড, সুইসাইড ভেস্ট উদ্ধার ‘ছায়ানীড়ে’ অভিযান

থেমে থেমে গুলির শব্দ, কখনো বোমা। বাড়িটি ঘিরে সতর্ক অবস্থায় পুলিশ। চারদিকে জেনারেটর দিয়ে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। মাইক টাঙিয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা সন্দেহভাজন জঙ্গিদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানাচ্ছেন। বাড়ির ভেতরে পায়চারি করছে তিন-চারজন জঙ্গি। কখনো বা ছাদে উঠছে, আবার নামছে নিচে। নিজেদের ফ্ল্যাটের দরজা-জানালা বন্ধ করে ভাড়াটিয়া নারী, শিশুসহ অন্তত ১৫-২০ জন ভেতরে আটকা পড়ে আছে। পুলিশের বিশেষ টিম সোয়াত ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রস্তুতি নিচ্ছে বাড়ির ভেতরে অভিযানের, যা শেষরাত বা সকালের দিকে হতে পারে।

গতকাল বুধবার রাত ১২টায় চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড পৌর সদরের প্রেমতলা ওয়ার্ডের চৌধুরীপাড়ায় ‘ছাড়ানীড়’ নামের ওই বাড়ি ঘিরে ছিল এই চিত্র। পুলিশ জানায়, বিকেল ৩টার পর থেকে সেখানে অভিযান শুরু করে তারা। বাড়ির ভেতরে ঢুকতে চাইলে পুলিশকে লক্ষ্য করে পাঁচটি গ্রেনেড ছুড়ে মারে জঙ্গিরা।

সন্ধ্যা নামার পর থেকে পুলিশের সঙ্গে তাদের থেমে থেমে গোলাগুলি চলছিল। জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) জঙ্গিদের এ আস্তানায় তিন-চারজন পুরুষ ও নারী রয়েছে। শিশুও থাকতে পারে বলে পুলিশ দাবি করেছে।

এর আগে দুপুর দেড়টার দিকে এই বাড়ি থেকে প্রায় পৌনে এক কিলোমিটার দূরে লামারবাজারের আমিরাবাদ এলাকার ‘সাধন কুটির’ নামের একটি বাড়ি থেকে শিশুসহ এক দম্পতিকে আটক করেছে পুলিশ, যাদের ‘জঙ্গি’ বলা হচ্ছে। সেখান থেকে গ্রেনেড, সুইসাইড ভেস্ট, পিস্তল, গুলি ও ম্যাগাজিন উদ্ধার করা হয়েছে। আটক দম্পতি নিজেদের নাম জসীম ও আর্জিনা বলে বাড়িটি ভাড়া নিয়েছিলেন। নিজেদের বাড়ির ঠিকানা বলেছিলেন কক্সবাজার। কিন্তু বাড়িওয়ালা পরিচয়পত্র চাইলে তাঁরা ভুয়া পরিচয়পত্র দেন। আর এতেই ধরা পড়েন তাঁরা।

‘ছায়ানীড়’ ঘিরে রেখে অভিযানের প্রস্তুতি : দোতলা বাড়িটির ভেতরে আটকা পড়া সবগুলো পরিবারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে বলে রাত সাড়ে ১১টার দিকে জানান পুলিশ সুপার নূরে আলম মিনা। নিচতলার একটি ফ্ল্যাটে আটকা পড়েছে বাঁশবাড়িয়া এলাকার ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. সেলিমের পরিবার। সেলিমের স্ত্রী ও বাড়ির মালিকের সঙ্গেও মোবাইল ফোনে কথা বলেছেন পুলিশ সুপার। ভেতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁরা পুলিশ কর্মকর্তাকে জানিয়েছেন, ওই বাড়িতে নারী, শিশুসহ অন্তত ১৫-২০ জন আটকা আছে। উত্তর-পশ্চিম কোনার ফ্ল্যাট থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে পাঁচটি গ্রেনেড ছোড়া হয়। চার ইউনিটে বিভক্ত ওই বাড়ির সব কটি দরজা-জানালা ভয়ে বন্ধ করে রেখেছে বাসিন্দারা।

বাড়িটির মালিক মৃত সুরেশ মিস্ত্রির স্ত্রী। তিনি পুলিশকে জানিয়েছেন, সন্দেহভাজন জঙ্গি পরিবারটি প্রায় দুই মাস আগে বাড়িটি ভাড়া নিয়েছে। বোমা ছুড়ে মারার পর তারা তাদের ফ্ল্যাটের দরজা-জানালা বন্ধ করে রেখেছে। সন্দেহভাজন ভাড়াটিয়ার বাড়ি দিনাজপুর জেলায় বলে জানিয়েছেন বাড়ির মালিক।

ভেতর থেকে সেলিমের স্ত্রী জানান, তাঁরা ভেতরে খুব আতঙ্কগ্রস্ত আছেন। বিকেল ৩টার পর থেকে অভুক্ত শিশুদের কিছু খাওয়াতে পারেননি। শিশুরা কান্নাকাটি করছে।

পুলিশ অবরুদ্ধ থাকা লোকজনকে দরজা-জানালা খুলতে নিষেধ করেছে, যাতে জঙ্গিরা কোনোভাবেই তাদের জিম্মি করতে না পারে।

এ অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন চট্টগ্রাম পুলিশ রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. শফিকুল ইসলাম। এর সঙ্গে অতিরিক্ত ডিআইজি সাখাওয়াত হোসেন, জেলা পুলিশ সুপার নূরে আলম মিনাসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়েছেন।

অভিযানের বিষয়ে মো. শফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, বাড়িতে জেএমবি জঙ্গিরা আস্তানা গেড়েছে—এ ব্যাপারে তাঁদের কাছে তথ্য আছে। দুপুর ৩টার পর অভিযান শুরু করলে ভেতর থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে পাঁচটি গ্রেনেড ছোড়া হয়। এতে সীতাকুণ্ড থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোজাম্মেলসহ দুই পুলিশ সদস্য আহত হন। এরপর পুলিশ সদস্যরা পিছু হটেন। বর্তমানে বাইরে থেকে পুরো ভবনটি ঘিরে রেখেছে পুলিশ।

ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘বাড়িটিতে ২০-২৫ জন নারী ও শিশু অবরুদ্ধ হয়ে আছে। এ মুহূর্তে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান শুরু করলে জঙ্গিরা বোমা হামলা করতে পারে। এ কারণে সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষায় আমরা পরিকল্পিত অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সোয়াত টিম ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছেছে। ঢাকা থেকে সোয়াতের আরেকটি দল পাঠাচ্ছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজি) এ কে এম শহীদুল হক। দলটি ঘটনাস্থলে পৌঁছার পর আলোচনা করে অভিযানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ’

পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, ‘রাতের অন্ধকারে অভিযান চালানোর সম্ভাবনা কম। প্রয়োজনে আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) সকালে চালাব। সারা রাত বাড়িটি ঘেরাও করে রাখবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। জঙ্গিদের পরিচয় সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে জঙ্গিরা বোমাসহ অবরুদ্ধ রয়েছে সে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত। ’

তবে রাত সোয়া ৯টার দিকে পুলিশের সঙ্গে থেমে থেমে গোলাগুলি চলছিল। দুজন পুরুষ ছাদে উঠে পুলিশকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছোড়ে ও গুলি করে। তাদের ছাদে হাঁটাহাঁটি করতেও দেখা যাচ্ছিল।

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার নূরে আলম মিনা বলেন, আস্তানার ভেতরে অস্ত্র-গুলি, হ্যান্ডগ্রেনেড ও বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক রয়েছে। সীতাকুণ্ড থানার ও জেলার রিজার্ভ টিম অভিযানে যোগ দিয়েছে। চট্টগ্রাম নগর পুলিশের বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট ও সোয়াত টিম ঘটনাস্থলে আছে।

পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় দুই মাস আগে জঙ্গিরা ছায়ানীড় ভবনের নিচতলার বাসাটি ভাড়া নিয়েছিল।

সাধন কুটিরে অভিযান : ভাড়াটিয়া তথ্য ফরম পূরণের জন্য জসীম ও আর্জিনা পরিচয় দেওয়া ভাড়াটিয়া দম্পতির কাছে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি চান বাড়ির মালিক। কিন্তু ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র দেখাতে গিয়েই বাড়ির মালিকের কাছে ধরা পড়েন তাঁরা।

প্রত্যক্ষদর্শীদের কয়েকজন জানায়, সাধন কুটির ভবনটির মালিক সুভাষ নামের এক ব্যক্তি। বেশ কিছুদিন আগে তিনি জামালপুরে বেড়াতে যান। এ ফাঁকে তিনজন পুরুষ ও একজন নারী এসে বাসা ভাড়া চাইলে সুভাষের স্ত্রী তাঁদের দোতলা ভবনটির নিচতলার বাসা ভাড়া দেন। মঙ্গলবার রাতে ভাড়াটিয়া তথ্য ফরম পূরণের জন্য তাঁদের কাছে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি চান সুভাষের স্ত্রী। এ কথা শুনে রাতেই পুরুষদের দুজন পালিয়ে যান।

গতকাল দুপুরে আবার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি চাইলে বাসায় থাকা এক নারী ও পুরুষ বাড়িওয়ালার স্ত্রীকে একটি কাগজ ধরিয়ে দেন। সুভাষদের পাশের বাসায় থাকেন সাগর নামের এক যুবক। তিনি কম্পিউটারের ব্যবসা করেন। সাগরের কাছে কাগজটি নিয়ে গেলে কম্পিউটারে চেক করার পর সেটি যে ভুয়া তা ধরা পড়ে।

সঙ্গে সঙ্গে নিচতলার বাসায় গিয়ে দুই জঙ্গিকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন সুভাষের স্ত্রী ও সাগর। এ সময় সুভাষের স্ত্রী বলেন, ‘তোমরা তো ভুয়া কাগজ দিয়েছ। তোমাদের তো সমস্যা আছে। ’ এর আগে ওই বাসায় বোমা তৈরির সরঞ্জামও দেখেছিলেন সুভাষের স্ত্রী।

এরপর জঙ্গিদের ধরতে গেলে নারী জঙ্গিটি সুভাষের স্ত্রীর হাতে কামড় দেন ও পুরুষ জঙ্গির সঙ্গে ধস্তাধস্তির ফলে সাগরের শার্ট ছিঁড়ে যায়। শোরগোল শুনে আশপাশের মানুষ এসে জঙ্গিদের আটক করে ও পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ এসে জঙ্গিদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। এ সময় দুজন জানান, তাঁরা আগে কলেজ রোডের ছায়ানীড় ভবনে ভাড়া ছিলেন। এর পরই ছায়ানীড় ভবনে অভিযান শুরু করে পুলিশ।

পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি শফিকুল ইসলাম জানান, সাধন কুটির থেকে উদ্ধার করা সুইসাইড ভেস্ট ও গ্রেনেডগুলো বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে।


মন্তব্য