kalerkantho


ঢাকায় বসে কমিটি তৃণমূলের ‘না’

শফিক সাফি   

১৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ঢাকায় বসে কমিটি তৃণমূলের ‘না’

গেল বছরের ১৯ মার্চ বিএনপির কাউন্সিলে তৃণমূলের দাবি ছিল, কেন্দ্র থেকে কোনো কমিটি যেন না চাপিয়ে দেওয়া হয়। দলীয় প্রধান খালেদা জিয়া সারা দেশ থেকে আসা কাউন্সিলরদের এ বিষয়ে আশ্বস্ত করেছিলেন।

বলেছিলেন, আলোচনা করে কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে কমিটি হবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটছে উল্টো ঘটনা। গঠনতন্ত্রের লঙ্ঘন ঘটিয়ে কেন্দ্র থেকে জোর করে কমিটি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিএনপির ৭৫টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৩৩টির কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭ থেকে ১০টিতে কাউন্সিল বা কর্মিসভা হয়েছে। বাকিগুলো কেন্দ্র থেকে ঘোষিত। ফলে দল গোছানোর এ প্রক্রিয়ায় তৃণমূলের কোন্দল তো মিটছেই না, বরং তা আরো জটিল হচ্ছে।

জানতে চাইলে দলটির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নানা কারণে কাউন্সিল বা কর্মিসভা করা যাচ্ছে না। যেমন ধরুন আমরা সাতক্ষীরা জেলা কাউন্সিল করতে চেয়েও পুলিশি বাধায় পারিনি।

আমরা চেষ্টা করছি কাউন্সিলের মাধ্যমে জেলা কমিটিগুলো গঠন করতে। ’

কাউন্সিলের মাধ্যমে জেলা ও মহানগর নেতৃত্ব নির্বাচনের বিধান রয়েছে বিএনপির গঠনতন্ত্রে। তাতে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, দলের জেলা কাউন্সিল প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক জেলাভুক্ত প্রতিটি উপজেলা/থানা, পৌরসভার নির্বাহী কমিটির সদস্যদের নিয়ে গঠিত হবে। দুই বছর মেয়াদে জেলা কমিটি নির্বাচিত হবে। একইভাবে প্রতিটি ওয়ার্ডের নির্বাহী কমিটির সদস্যদের নিয়ে মহানগর কাউন্সিল গঠিত হবে দুই বছর মেয়াদে। দলের চেয়ারপারসনের পরামর্শক্রমে জেলা বা মহানগর কমিটি মহাসচিব অনুমোদন দেবে। কিন্তু সরাসরি গঠনতন্ত্রের বিধান ভেঙে কেন্দ্র থেকে এসব ইউনিটের ‘সুপার ফাইভ’ (সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, প্রথম যুগ্ম সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক) কমিটি করে দেওয়া হচ্ছে।

এখন পর্যন্ত জয়পুরহাট, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, সাতক্ষীরা, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ মহানগর, নোয়াখালী, মেহেরপুর, চট্টগ্রাম মহানগরসহ ৩৩টি জেলার আংশিক কমিটি করা হয়েছে। এর মধ্যে সিলেট, কিশোরগঞ্জ, নোয়াখালী, জামালপুর, দিনাজপুর, ঝিনাইদহ, ঝালকাঠিসহ ৭ থেকে ১০টিতে কাউন্সিল বা কর্মিসভা হয়েছে। বাকি জেলাগুলোর কমিটি বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়, গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয় অথবা দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা মোহাম্মদ শাহজাহানের বাড্ডার বাসায় বৈঠকের মাধ্যমে গঠন করা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে শাহজাহান জানান, এতে গঠনতন্ত্র লঙ্ঘিত হচ্ছে না। কারণ তাতে চেয়ারপারসনকে একক ক্ষমতা দেওয়া আছে। সেই ক্ষমতাবলে কমিটি অনুমোদন করছেন দলীয় মহাসচিব।

দুই দফা ব্যর্থতার পর দ্রুত সংগঠন শক্তিশালী করে আবারও আন্দোলনে নামার ঘোষণা দিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু ঘর গোছাতে গিয়ে তা আরো অগোছালো হয়ে যাচ্ছে। কাউন্সিলের এক বছরেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন থেকে শুরু করে কোনো সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন করতে পারেনি দলটি। ঘোষিত কমিটির মধ্যে সাতক্ষীরা জেলার সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে খোদ জেলার এক শীর্ষ নেতাকে হত্যার অভিযোগ আছে। জয়পুরহাট জেলার কমিটি ঘোষণার পরপরই কার্যালয়ে আগুন দেয় বিক্ষুব্ধরা। দিনাজপুর জেলায় আংশিক কমিটি হয়েছে ছয় মাস আগে, কিন্তু কোনো কর্মকাণ্ড নেই। সাত বছর পর রাজশাহী জেলা ও মহানগর কমিটি হলেও যোগ্যদের স্থান দেওয়া হয়নি অভিযোগ এনে মহানগর কার্যালয়ে তালা দেওয়াসহ পরস্পরের বিরুদ্ধে বিবৃতিযুদ্ধ চলছে। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির কমিটি হওয়ার পর নেতারা পরস্পরের বিরুদ্ধে আদাজল খেয়ে নেমেছেন। বিষয়গুলো আমলে নিলেও খুব একটা চিন্তিত নন শাহজাহান। তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এটিই স্বাভাবিক। সবাইকে তো আর খুশি করা যাবে না।

তবে দলটির নীতিনির্ধারকদের দাবি, সাবেক এমপি ও প্রভাবশালীদের সিন্ডিকেট ভাঙতে এবং সক্রিয় ও যোগ্য নেতাদের কমিটিতে জায়গা করে দিতেই নীতিগতভাবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, মাত্র তিন সদস্যের কমিটি ঘোষণা হওয়ার পর সাত মাসেও চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি। ফলে ঝিমিয়ে পড়েছে নেতাকর্মীরা। অভিযোগ উঠেছে, নেতাদের বিরোধেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি হচ্ছে না।

গত বছর ৬ আগস্ট মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির দীর্ঘদিনের চার সদস্যের অপূর্ণাঙ্গ কমিটি ভেঙে দিয়ে তিন সদস্যের নতুন কমিটি ঘোষণা করেন। এতে সভাপতি করা হয় ডা. শাহাদাত হোসেনকে। আবু সুফিয়ানকে সিনিয়র সহসভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক করা হয় নগর যুবদলের সভাপতি আবুল হাশেম বক্করকে। এর মধ্যে ডা. শাহাদাত সম্পাদক থেকে সরাসরি সভাপতি এবং বক্কর যুবদল থেকে সরাসরি নগর বিএনপির সম্পাদক পদ পেয়ে যান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মহানগর বিএনপির কয়েকজন নেতা বলেন, সাত বছর আগেও চট্টগ্রাম নগর বিএনপির কমিটি অপূর্ণাঙ্গ ছিল। এবার মাত্র তিনজনের কমিটি হলো। এঁদের মধ্যেও কোন্দল। আর ‘ত্যাগী’ নেতাদেরও মূল্যায়ন হলো না। এ নিয়ে দলের মধ্যেই অসন্তোষ চলছে।

নেতারা আরো জানান, শুধু নগর বিএনপি নয়, নগর যুবদল, ছাত্রদলের কমিটি নিয়ে রয়েছে বিরোধ। এই দুই সংগঠনেরও পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই। বিএনপির সিনিয়র নেতা আবদুল্লাহ আল নোমানকে কেন্দ্রে কিংবা নগর বিএনপির কোথায় মূল্যায়ন না করায় তাঁর অনুসারীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।

রাজশাহী অফিস জানায়, মামলা-মোকদ্দমায় জেরবার বিএনপি নেতারা অনেকটা ঘাপটি মেরে থাকলেও নতুন কমিটি ঘিরে বিভিন্ন জেলায় লবিং-গ্রুপিং মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। রাজশাহীতে সাবেক মেয়র ও কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মিজানুর রহমান মিনুর সঙ্গে মহানগরীর বর্তমান সভাপতি মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের দ্বন্দ্ব এখন প্রবল। গত ২৭ জানুয়ারি নতুন কমিটি ঘোষণার পরপরই বিএনপি রক্ষা কমিটি করে মিনুপন্থীরা। অন্যদিকে জেলার সাবেক সভাপতি নাদিম মোস্তফার সঙ্গে দূরত্ব বেড়েছে বর্তমান সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন তপুর অনুসারীদের।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে জেলা বিএনপির সভাপতি হারুন অর রশিদের সঙ্গে যুবদল নেতা আমিনুল ইসলামের দ্বন্দ্ব রয়েছে। নওগাঁয় সাবেক সভাপতি শামসুজ্জোহার সঙ্গে বিরোধ আছে বর্তমান সভাপতি নাজমুল হক সনির।

তবে সবচেয়ে বেশি কোন্দল দেখা দিয়েছে জয়পুরহাটে। এখানে জেলা কমিটি গঠনের পরপরই দুই গ্রুপের নেতাকর্মীরা পাল্টাপাল্টি কুশপুত্তলিকাও দাহ করেছে। অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে জেলা বিএনপি কার্যালয়েও। বর্তমান জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নাফিজুর রহমান পলাশ গ্রুপের সঙ্গে সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমানের দ্বন্দ্বের কারণে এ পরিস্থিতি।

বগুড়ায় জেলা বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলামের সঙ্গে অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের কোনো যোগাযোগ নেই বলে জানা গেছে।

সিলেট অফিস জানায়, সেখানে বিএনপির অবস্থা তথৈবচ। কোন্দল করারও লোক নেই এখন দলটিতে। নেতারা মামলা মাথায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। দলীয় কর্মসূচিও পালন করতে পারছেন না পুলিশি বাধার কারণে। দলের সাংগঠনিক তত্পরতা ঘরোয়ভাবে চলছে। গত বছর জানুয়ারিতে জেলা ও মহানগর বিএনপির সম্মেলন হলেও এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি।

দলের অবস্থা বিষয়ে সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ বলেন, ‘পুলিশি বাধায় আমরা রাজপথে দাঁড়াতেই পারছি না। ’ পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রসঙ্গে বলেন, ‘দলের গঠনতন্ত্র পরিবর্তনের কারণে এত দিন কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা যায়নি। মাস দুয়েক আগে কেন্দ্রে কমিটি পাঠানো হয়েছে। আশা করছি, শিগগিরই তা ঘোষিত হবে। ’

মৌলভীবাজার থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, জেলা বিএনপির বর্তমান সভাপতি সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী মরহুম এম সাইফুর রহমানের জ্যেষ্ঠপুত্র এম নাসের রহমান। সাধারণ সম্পাদক চারবারের মহিলা সংসদ সদস্য খালেদা জিয়ার প্রিয়ভাজন বেগম খালেদা রব্বানী। সভাপতির বয়স সাধারণ সম্পাদকের চেয়ে ২৪-২৫ বছর কম। অসম বয়সের দুজনকে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়ায় দলে শুরু হয় দ্বন্দ্ব-কোন্দল।

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, তিন বছর ধরে জেলা বিএনপির আহ্বায়কের দায়িত্বে নাছির উদ্দিন চৌধুরী। এখনো সব উপজেলায় কাউন্সিল হয়নি। কারণ কাউন্সিল করতে গিয়ে গ্রুপিংয়ের কারণে ১৪৪ ধারার মুখোমুখি হয় নেতাকর্মীরা। তা ছাড়া দাঙ্গা-হাঙ্গামার ঘটনাও ঘটেছে। নাছির উদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি এবং জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ফজলুল হক আছপিয়ার নেতৃত্বে একটি গ্রুপ পৃথক কর্মসূচি পালন করছে।

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সেখানে বিএনপিতে কোন্দল প্রবল হয়ে উঠেছে। এখন জেলায় তিনটি গ্রুপ সক্রিয়।

একটি গ্রুপের নেতৃত্বে দলের সাধারণ সম্পাদক ও কিবরিয়া হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি হবিগঞ্জ পৌরসভার সাময়িক বরখাস্তকৃত মেয়র জি কে গউছ। আরেকটির নেতৃত্বে জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমিনুর রশীদ এমরান। অন্যটির নেতৃত্বে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট এনামুল হক সেলিম। দলের বিভিন্ন কর্মসূচি তাঁরা আলাদাভাবে পালন করেন। দলের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়সলকে তেমন একটা সক্রিয় দেখা যায় না। ২০০৯ সালে গঠিত উপজেলা কমিটিগুলো এখন স্থবির। দলটির অঙ্গসংগঠনগুলোতেও বিরোধ চলছে।  

শেরপুর প্রতিনিধি জানান, জেলা বিএনপিতে দুটি গ্রুপ সক্রিয়। এর প্রভাব পড়ছে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোতেও। জেলা সভাপতি সাবেক এমপি মাহমুদুল হক রুবেল ও সাধারণ সম্পাদক হযরত আলী রয়েছেন একদিকে। আর জেলা বাস-কোচ মালিক সমিতির সভাপতি জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম স্বপন ও সাবেক সভাপতি প্রয়াত অ্যাডভোকেট ছাইফুল ইসলাম কালামের ছেলে মামুনুর রশীদ পলাশের নেতৃত্বাধীন আরেকটি গ্রুপ আছে। দ্বন্দ্বের কারণে দলীয় অনেক কর্মসূচিই ঠিকমতো পালিত হয় না। দীর্ঘ প্রায় এক যুগ পর গত ডিসেম্বরে জেলা বিএনপির কমিটি গঠন নিয়ে শহরে ঝাড়ু মিছিলও হয়েছে। দ্বন্দ্বের জেরে গত পৌর নির্বাচনে আব্দুর রাজ্জাক আশীষ হেরে যান। দলীয় নেতারাই গোপনে তাঁর বিরুদ্ধে কাজ করেছেন। কোন্দলের কারণে মেয়াদোত্তীর্ণ উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড বিএনপির সব সম্মেলন শেষ করা যায়নি। ঘোষণা হয়নি জেলা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি। ছাত্রদল, শ্রমিক দল, মহিলা দলসহ অঙ্গসংগঠনে চলছে স্থবিরতা।

বরিশাল অফিস জানায়, কেন্দ্রীয় বিএনপির যগ্ম মহাসচিব মজিবর রহমান সরোয়ারের সঙ্গে দলের একটি অংশের প্রবল বিরোধ চলছে। ওই অংশের নেতৃত্বে রয়েছেন জেলা বিএনপির (উত্তর) সভাপতি এবায়দুল হক চান। কেন্দ্রীয় নেতা সেলিমা রহমান এবং বরিশাল বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান তাঁর পক্ষে রয়েছেন। এ বিরোধের জেরে মজিবর রহমান সরোয়ার মহানগর বিএনপির সভাপতির পদ ছাড়ছেন না। পাশাপাশি জেলা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটিও হচ্ছে না।  

ঝালকাঠি প্রতিনিধি জানান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর (বীর-উত্তম) এবং কেন্দ্রীয় বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুল হক নান্নুর মধ্যে তুমুল বিরোধ চলছে। সম্প্রতি জেলা বিএনপির কমিটি হয়েছে। তাতে নান্নুর অনুসারীরা কোনো পদ পায়নি। ফলে ওই পক্ষ কমিটি প্রত্যাখ্যান করেছে।

পটুয়াখালী প্রতিনিধি জানান, কেন্দ্রীয় বিএনপির সহসভাপতি আলতাফ হোসেন চৌধুরীর বিপক্ষে তিন নেতা একাট্টা হয়েছেন। তাঁরা হলেন জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আব্দুর রশিদ চুন্নু, সাবেক সাধারণ সম্পাদক স্নেহাংশু সরকার কুট্টি এবং পটুয়াখালী পৌরসভার সাবেক মেয়র মোস্তাক আহমেদ পিনু।  

বরগুনা, পিরোজপুর ও ভোলা বিএনপিও সংগঠিত নয়। নেতারা যে যাঁর মতো আছেন।

খুলনা অফিস জানায়, সেখানে দুটি সাংগঠনিক জেলা আছে। একটি খুলনা জেলা, অন্যটি খুলনা মহানগর শাখা। জেলা শাখায় দুটি গ্রুপ। একটির নেতৃত্বে সদ্য ঘোষিত জেলা কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট শফিকুল আলম মনা। অন্যটির নেতৃত্বে পদ হারানো খুলনা জেলা শাখার সাবেক সভাপতি মাজেদুল ইসলাম।

খুলনা মহানগর শাখায়ও দুটি গ্রুপ। একটির নেতৃত্ব দেন মহানগর শাখার সভাপতি সাবেক এমপি নজরুল ইসলাম মঞ্জু ও মনিরুজ্জামান মনি। অন্যটির নেতৃত্বে সাহারুজ্জামান মোর্তজা।

বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, এ জেলায়ও বিএনপির দুটি গ্রুপ সক্রিয়। একটিতে আছেন এম এ সালাম ও খায়রুজ্জামান শিপন। অন্যটিতে নেতৃত্ব দেন খান মনিরুল ইসলাম, শেখ ফরিদুল ইসলাম ও এম মুজিবুর রহমান।

সাতক্ষীরায় বিএনপির দুটি গ্রুপের একটিতে নেতৃত্ব দেন সাবেক এমপি হাবিবুল ইসলাম হাবিব। অন্যটির নেতৃত্বে তাসকিন আহমেদ চিশতি।

নড়াইল বিএনপির দুটি গ্রুপের একটির নেতৃত্বে জয়েন্ট সেক্রেটারি আবু হাসান, অন্যটিতে জাহাঙ্গীর আলম বিশ্বাস।

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি জানান, জেলা বিএনপিতে বিরোধ না থাকলেও কালীগঞ্জ উপজেলায় দুটি শক্তিশালী গ্রুপ আছে। এর একটির নেতৃত্বে সাবেক এমপি শহীদুজ্জামান বেল্টু; অন্যটির নেতৃত্বে সাবেক পৌর চেয়ারম্যান মাহবুব হোসেন।

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জানান, জেলায় ক্রিয়াশীল দুটি গ্রুপের একটিতে নেতৃত্ব দেন কেন্দ্রীয় নেতা শামসুজ্জামান দুদু। এর বিপরীতে আছেন স্থানীয় নেতা অহিদুল ইসলাম বিশ্বাস।

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, জেলায় বিএনপিতে তিনটি ভাগ। প্রতিটি ভাগেই আছেন সাবেক এমপিরা। তাঁরা হলেন শহিদুল ইসলাম, সৈয়দ মেহেদী আহমদ রুমী ও সোহরাবউদ্দিন।  

মাগুরা প্রতিনিধি জানান, এ জেলায় দুটি গ্রুপ সক্রিয়। এর একটিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সৈয়দ মোকাদ্দেস আলী। অন্যটিতে আলী করিম।

রংপুর অফিস জানায়, এ জেলায় বিএনপির নিয়ন্ত্রণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শিল্পপতি মো. সামসুজ্জামানের হাতে। তিনি ঢাকায় থাকেন। মাসে দু-একবার এলাকায় আসেন। কয়েকজন নেতা জানান, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঘিরে দলের অসংখ্য নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হওয়ায় তাঁরা হতাশাগ্রস্ত। এখানে প্রকাশ্য কোনো গ্রুপিং নেই। তবে একটি পক্ষ দলীয় কোনো কর্মকাণ্ডে থাকে না।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা পরিষদের উপনির্বাচনে মনোনয়নকে কেন্দ্র করে বিএনপিতে পুরনো বিরোধ আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। জেলা বিএনপির সভাপতি তাসভিরুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান রানার নেতৃত্বে এক গ্রুপ আর সহসভাপতি সাবেক পৌর মেয়র আবু বকর সিদ্দিকের নেতৃত্বে অন্য পক্ষে।

রংপুরে জেলা বিএনপির সভাপতি এমদাদুল হক ভরসা ও সম্পাদক সামছুজ্জামান সামু। মহানগর  বিএনপিতে আছেন সভাপতি মোজাফফর হোসেন ও সম্পাদক সাইফুল ইসলাম। বর্তমানে তাঁদের তেমন কর্মকাণ্ড না থাকায় কোন্দল প্রকাশ্যে না এলেও হঠাৎ করে আসা জেলা সভাপতিকে মেনে নিতে পারেনি দলের নেতাকর্মীরা। সেই থেকে বিএনপি মূলত দুই ভাগ।

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানান, বিএনপির দুটি জেলা কমিটি। দক্ষিণ জেলা ও উত্তর জেলা। দুই জেলাতেই কমিটির মূল নেতাদের বিরোধ স্পষ্ট। আর জেলার মূল নেতৃত্বের বিরোধে উপজেলাতেও কমিটি ও নেতৃত্ব নিয়ে কোন্দল চলছে। প্রায় সব উপজেলাতেই বিএনপি কোন্দলে বিপর্যস্ত। বিশেষ করে হালুয়াঘাট, ফুলপুর, ঈশ্বরগঞ্জ, নান্দাইল, ভালুকা, ফুলবাড়িয়া, গৌরীপুরে চরম দুরবস্থা বিএনপিতে।

নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, জেলায় বিএনপি এখন ঝিমিয়ে আছে। মাঝেমধ্যে দলীয় কার্যালয়ের সামনে কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচি পালনে হাতে গোনা কয়েকজনকে ফটোসেশনে অংশ নিতে দেখা যায়। দীর্ঘদিন পর গত বছরের ৮ মার্চ ১৯২ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি কেন্দ্র অনুমোদন করে। নেতাদের মধ্যে কোন্দল এড়াতে কমিটিতে ২৮ জনকে সহসভাপতি করা হয়েছে। তবে এত বড় কমিটিতেও পরীক্ষিতদের ঠাঁই হয়নি। জেলার বারহাট্টা, কলমাকান্দা, মদন, পূর্বধলা, দুর্গাপুর পৌর বিএনপি, খালিয়াজুরী উপজেলা বিএনপিতে শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মধ্যে কোন্দল রয়েছে।

বিএনপির কেন্দ্রেও নেতায় নেতায় কোন্দল আর অব্যবস্থাপনা জটিল আকার নিয়েছে। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ দলের জাতীয় কাউন্সিলে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়। তবে এর অনেকগুলোই বাস্তবায়িত হয়নি।

গত ৬ আগস্ট ৫০২ সদস্যের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি, ১৭ সদস্যের স্থায়ী কমিটি এবং চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের ৭৩ সদস্যের নাম ঘোষণা করা হয়। এখনো স্থায়ী কমিটির তিনটি পদ ফাঁকা। ছাত্র ও সহ-ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক এবং যুব বিষয়ক সম্পাদক এখনো ঠিক হয়নি। এ ছাড়া জাতীয় কাউন্সিলের এক বছরেও দলীয় গঠনতন্ত্র বই আকারে প্রকাশ করতে পারেনি বিএনপি। ফলে বিএনপির নির্বাহী কমিটি কত সদস্যের, নতুন কী সংশোধনী এলো এসব ব্যাপারে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা অন্ধকারে। কাউন্সিলে বিষয়ভিত্তিক ২৬টি উপকমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত ছিল। তার প্রতিটিতে ১২ জন সদস্য রাখারও সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু এখনো এ কমিটি হয়নি।

এ ছাড়া যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, শ্রমিক দল ও জাসাসের কমিটি হলেও তা আংশিক। কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার জন্য যে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে তা নিয়ে সুপার ফাইভ বা সেভেনের নেতারা তেমন কার্যকর ভূমিকা নিচ্ছেন না।

কেন্দ্রীয় নেতা মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, দলের গঠনতন্ত্র এখনো প্রিন্ট হয়নি। শিগগিরই এটি চূড়ান্ত করে প্রকাশ করা হবে।

যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘যাঁরা পদ পাননি স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা নাখোশ হবেন। আমরা খোঁজ রাখছি। প্রয়োজনে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’


মন্তব্য