kalerkantho


‘গোষ্ঠীবাজে’ ছড়াচ্ছে দ্বন্দ্ব-সংঘাত

পার্থ সারথি দাস   

১৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



‘গোষ্ঠীবাজে’ ছড়াচ্ছে দ্বন্দ্ব-সংঘাত

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের চেয়ে নিজেরাই নিজেদের শত্রু—সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন চিত্র দেখা গেছে একাধিক ঘটনায়। ব্যক্তিস্বার্থ, কমিটি গঠন, আপন বলয় তৈরি—এ ধরনের বিভিন্ন কারণে দলের প্রভাবশালী নেতারাই ‘কোন্দল’ তৈরি করে রেখেছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

এর প্রভাব পড়ছে দলের কেন্দ্র থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত।

‘গোষ্ঠীবাজ’ ওই নেতাদের কারণে তৃণমূলে দলের উদ্যমী, ত্যাগী নেতারা ক্ষুব্ধ। বড় নেতাদের মধ্যে রেষারেষির কারণে কোথাও দলের একাধিক কার্যালয়, কোথাও আলাদাভাবে কর্মসূচি পালন করতেও দেখা গেছে।

জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়নকে কেন্দ্র করেও দলের বিভিন্ন কমিটিতে বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোন্দলের জন্য এক দশক ধরে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা সম্ভব হচ্ছে না বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

এমনকি ঢাকা বার নির্বাচন এবং সদ্য অনুষ্ঠিত সিলেট, সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের তিন উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন। দলের নেতারা বলছেন, দলীয় গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কারণেই এসব নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয় হাতছাড়া হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে আবার সরকার গঠনের লক্ষ্যে কোন্দল মিটিয়ে এক হয়ে কাজ করার নির্দেশ দিচ্ছেন বারবার।

দলীয় সূত্র জানায়, গত সোমবার সচিবালয়ে অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে সাম্প্রতিক কিছু নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পরাজয়ের বিষয়ে মন্ত্রী-এমপিদের কাছে জানতে চেয়েছেন শেখ হাসিনা।

তিনি মন্ত্রী-এমপিদের নিজ নিজ এলাকায় দলের কোন্দল ও বিরোধ মেটানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

এর আগে ২৩ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভায়ও শেখ হাসিনা অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক করেছেন, দলে দ্রুত শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আগামী অক্টোবরের মধ্যেই সাংগঠনিক প্রস্তুতি শেষ করবে দলটি। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগীয় শহর ও জেলায় দলীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সফরও শেষ হবে। দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা আশা করছে, এসব সফরের মধ্য দিয়ে কোন্দল বা বিরোধ নিরসন হবে।

কালের কণ্ঠের পক্ষ থেকে সারা দেশ থেকে সংগ্রহ করা তথ্যে জানা গেছে, চলতি বছর শুরুর পর দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা বিরোধের জের ধরে সহিংসতার পাশাপাশি একাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। গত ১ ফেব্রুয়ারি দলের কোন্দলে খুন হন নড়াইলের ভদ্রবিলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রভাষ রায়। এর পরদিন সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান দৈনিক সমকালের প্রতিনিধি আবদুল হাকিম শিমুল। ওই দিনই কুষ্টিয়া আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে মারা যান আরেকজন। এ ছাড়া শেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধা আতাউর রহমান মডেল কলেজের অধ্যক্ষ গোলাম হাসান খান প্রতিপক্ষের হাতে জখম হন।

গত ১৭ জানুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে জলমহাল দখলকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনজনের প্রাণহানি ঘটে। এভাবে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ঘটে চলেছে।

তাই দলীয় কোন্দল নিরসনে এখন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে কঠোর অবস্থান নেওয়া শুরু হয়েছে। সম্প্রতি দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জেলা পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতা ও সংসদ সদস্যকে ঢাকায় ডেকে সাবধান করে দিয়েছেন। কোন্দল এড়িয়ে চলতে না পারলে অনেক সংসদ সদস্যকে আগামী সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন দেওয়া হবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ওবায়দুল কাদের গত দুই মাসে খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মোহাম্মদ নুরুল হক, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনের গোলাম রাব্বানী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের আব্দুল ওদুদ, নড়াইল-১ আসনের কবিরুল হক মুক্তিসহ বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্যকে দলীয় সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে ডেকে সতর্ক করে দিয়েছেন।

চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ : চট্টগ্রাম থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক নূপুর দেব জানান, নেতায় নেতায় কোন্দলে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ স্থবির হয়ে পড়েছে। সংসদ সদস্যদের সঙ্গে দলীয় নেতাদের দূরত্ব বেড়েছে। এর প্রভাবে তৃণমূলে কমে গেছে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড। অনেক থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়নে দীর্ঘদিন ধরে সম্মেলন হচ্ছে না।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে বিভিন্ন ইস্যুতে দূরত্ব রয়েছে একই কমিটির সহসভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ডা. আফছারুল আমীন ও নির্বাহী সদস্য সংসদ সদস্য এম এ লতিফের। এ ছাড়া প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানা ইস্যুতে মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তবে মহিউদ্দিন ও নাছির একসঙ্গে দলীয় কর্মসূচিতে থাকলেও ডা. আফছারুল আমীন ও এম এ লতিফকে নগর আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে দেখা যায় না।

নেতাদের মধ্যে দূরত্ব প্রসঙ্গে মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খোরশেদ আলম সুজন বলেন, ‘তৃণমূলের সঙ্গে নগর আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার দূরত্ব বেড়েছে তা ঠিক। ’ কেন এই দলাদলি—জানতে চাইলে মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এম রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের চেয়ে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, স্বার্থ, নিজস্ব বলয় সৃষ্টির মনমানসিকতা এবং নানা আশা-আকাঙ্ক্ষার কারণে নেতাদের মধ্যে কারো কারো সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। এ দূরত্ব না কমলে আগামী নির্বাচনে দলের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ’

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান বলেন, ‘সম্প্রতি মহিলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের পর সমস্যা কিছুটা কমতে শুরু করেছে। তবে এখনো কারো কারো সঙ্গে দূরত্ব থাকলেও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ আসলে তা মিটে যাবে। ’

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও রাউজান পৌরসভার চেয়ারম্যান দেবাশীষ পালিত বলেন, ‘উপজেলা ও পৌরসভাগুলোতে দলের নেতৃত্ব নিয়ে স্থানীয় বিভিন্ন নেতার মধ্যে দ্বন্দ্ব আছে। এর মধ্যে জেলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাও আছেন। ’ তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, তৃণমূলে নেতারা যদি ঐক্যবদ্ধ না হন তাহলে দলের জন্য ক্ষতি হতে পারে।

সিলেট আ. লীগ : সিলেট থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক আহমেদ নূর, সুনামগঞ্জ থেকে শামস শামীম এবং মৌলভীবাজার থেকে আবদুল হামিদ মাহবুব জানান, সিলেট বিভাগের চার জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি কোন্দল সুনামগঞ্জে। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা উপেক্ষা করে কর্মসূচি পালন করছে বিভক্ত নেতাকর্মীরা। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমনের নেতৃত্বে তৈরি হয়েছে দুটি পক্ষ।

১৬ বছর পর গত বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করা হয়েছিল। এরপর এই দুজন একসঙ্গে মাত্র দুটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। আর সব কর্মসূচিই তাঁরা পৃথকভাবে পালন করছেন। সর্বশেষ গত জেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমনের বিরুদ্ধে গিয়ে নির্বাচন করেন জেলা সভাপতি মতিউর রহমান।

এদিকে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুর পর আগামী ৩০ মার্চ অনুষ্ঠেয় সুনামগঞ্জ-২ আসনের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে মনোনয়ন কিনেছিলেন মতিউর রহমান।

মৌলভীবাজারে ২০০৬ সালের ১৪ জুলাই জেলা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগে জন্ম নেয় মহসীন ও শহীদ গ্রুপের। মৌলভীবাজার শহরে দলীয় কার্যালয়ও দুটি। মহসীন আলী মারা গেলেও তাঁর গ্রুপটি কেন্দ্রীয় কর্মসূচি পালন করে শ্রীমঙ্গল সড়কে তাঁর বাসভবনে।

সিলেট জেলা আওয়ামী লীগে অর্থমন্ত্রী, সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক মেয়র এবং মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে তিনটি বলয়।

জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শাহ মোসাহিদ আলী বলেন, ‘সিলেটে দলের কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে। প্রকাশ্যে বিভক্তি না থাকলেও সাম্প্রতিক উপজেলা নির্বাচন এবং এর আগে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের পরাজয়ের মূল কারণ অভ্যন্তরীণ কোন্দল। ’

মোসাহিদ আলী আরো বলেন, ‘দলের নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীরা কাজের সুযোগ পাচ্ছে না। তারা বিক্ষুব্ধ ও হতাশ। ’

রাজশাহী আ .লীগ : রাজশাহী থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক রফিকুল ইসলাম জানান, রাজশাহী অঞ্চলের আট জেলায় প্রকাশ্য কোন্দল সবচেয়ে বেশি রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগে। তবে বিভাগের উপজেলাগুলোতে অধিকাংশ এমপির সঙ্গে দলের নেতাকর্মীদের কোন্দল রয়েছে।

রাজশাহীতে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদের সঙ্গে অন্তত তিন এমপির কোন্দল রয়েছে। বিশেষ করে এমপি আয়েন উদ্দিন ও এমপি আব্দুল ওয়াদুদ দারার সঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদের কোন্দল প্রকাশ্য।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল ওদুদের সঙ্গে শিবগঞ্জ আসনের এমপি গোলাম রাব্বানির দ্বন্দ্ব। আর সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে তো সমকালের সাংবাদিক শিমুল খুনই হলেন।

রংপুরে বিভাগ আ. লীগ : রংপুর থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক স্বপন চৌধুরী জানান, রংপুর বিভাগের আট জেলার সব কটিতে আওয়ামী লীগের কোন্দল তীব্র রূপ নিয়েছে। রংপুর জেলা আওয়ামী লীগে আছে তিনটি পক্ষ। এর মধ্যে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম রাজুর নেতৃত্ব রয়েছে বড় অংশটি। মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাফিউর রহমান সফি ও সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মণ্ডলের নেতৃত্বে রয়েছে অন্য দুটি পক্ষ।

জেলা পরিষদ নির্বাচনে বিভক্ত হয়ে পড়ে নীলফামারী জেলা আওয়ামী লীগ। একটি পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পৌর মেয়র দেওয়ান কামাল আহমেদ। অন্য পক্ষের নেতৃত্বে দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক জেলা পরিষদের প্রশাসক মমতাজুল হক।

কুড়িগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগে পনির উদ্দিন আহমেদ ও জাফর আলীর দুই ধারা।

লালমনিরহাটে জেলা আওয়ামী লীগে দ্বন্দ্ব সাধারণ সম্পাদক আ্যাাডভোকেট মতিয়ার রহমান, সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আবু সালেহ মো. সাঈদ দুলাল এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল হক পাটোয়ারী ভোলার।

গাইবান্ধায় সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ মাহাবুব আরা বেগম গিনি এবং জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ শামছুল আলম হিরুর দুই ধারা।

খুলনা আ. লীগ : খুলনা থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক গৌরাঙ্গ নন্দী জানান, খুলনা জেলা আওয়ামী লীগেও দুটি পক্ষ। এক পক্ষের নেতৃত্বে দলের জেলা শাখার সভাপতি, খুলনা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শেখ হারুনার রশিদ। অন্য পক্ষে নেতৃত্ব দেন জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক এস এম মোস্তফা রশিদী সুজা এমপি।

খুলনা মহানগর শাখাও একটি সাংগঠনিক জেলা। সেখানেও সভাপতি তালুকদার আব্দুল খালেক এমপি ও সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজানের নেতৃত্বে দুটি ধারা।

বাগেরহাটে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শেখ কামরুজ্জামান টুকু, ডা. মোজাম্মেল হোসেন, পৌর মেয়র খান হাবিবুর রহমান ও এমপি মীর শওকাত আলী বাদশারও আলাদা পক্ষ রয়েছে।

সাতক্ষীরায় এক পক্ষের নেতৃত্বে জেলা সভাপতি সাবেক জেলা পরিষদ প্রশাসক মো. মুনসুর আলী। অন্যটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন বর্তমান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম। নজরুল ইসলামের সঙ্গে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক ও ইঞ্জিনিয়ার মজিবুর রহমান।

যশোরে এক পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেলা সাধারণ সম্পাদক, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান শাহিন চাকলাদার। অন্য পক্ষের নেতৃত্বে সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ।

নড়াইলে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুভাষ চন্দ্র বোস ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সোহরাব হোসেন বিশ্বাস রয়েছেন এক পক্ষের নেতৃত্বে। অন্য পক্ষের নেতৃত্ব দেন নড়াইল পৌর মেয়র জাহাঙ্গীর হোসেন বিশ্বাস। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন খান নিলু।

ঝিনাইদহে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করীম মিন্টু একটি পক্ষের এবং শফিকুল ইসলাম অপু অন্য পক্ষের নেতৃত্ব দেন।

মেহেরপুরে জয়নাল আবেদীন, ফরহাদ হোসেন দোদুল এমপি এবং জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট মিয়া জান আলীর তিন পক্ষ।

চুয়াডাঙ্গায় জাতীয় সংসদের হুইপ সোলায়মান হক জোয়াদ্দার এবং আলী আজগার টগরের নেতৃত্বে রয়েছে দুই পক্ষ।

মাগুরায় এক পক্ষের নেতৃত্বে তানজেল হোসেন খান ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পঙ্কজ কুমার কুণ্ডু। অন্য পক্ষের নেতৃত্ব দেন মন্ত্রী বীরেন শিকদার এমপি ও আবু নাসের বাবলু।

বরিশাল আ. লীগ : বরিশাল থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক রফিকুল ইসলাম জানান, ঝালকাঠিতে আমির হোসেন আমুর এবং ভোলায় তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগে প্রকাশ্যে কোনো দ্বন্দ্ব কিংবা গ্রুপিং নেই। বরিশাল শহরেও আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহর প্রকাশ্য বিরোধ নেই। তবে আমির হোসেন আমুর একটি গ্রুপ আছে বরিশাল শহরে। তারা হাসনাতের কাছে যায় না। শহরে এই গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাবেক সিটি মেয়র শওকত হোসেন হিরনের স্ত্রী সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা আফরোজ।

পিরোজপুরে সংসদ সদস্য এ কে এম এ আউয়ালের সঙ্গে তাঁর ভাইদের বিরোধ রয়েছে। ব্যক্তিগত সেই বিরোধ এখন রাজনীতিতে ঢুকে পড়েছে। ভাইদের বিভক্তির কারণে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

শেরপুরে হুইপ-মন্ত্রীর অনুসারীরা দ্বন্দ্বে : শেরপুর প্রতিনিধি হাকিম বাবুল জানান, শেরপুরে আওয়ামী লীগের একপক্ষে আছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হুইপ আতিউর রহমান আতিক ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট চন্দন কুমার পাল। অন্যপক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জেলা চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবীর রুমান ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ছানুয়ার হোসেন ছানু। আর তাই তৃণমূল পর্যায়ে আতিক-চন্দন ও ছানু-রুমান গ্রুপের দ্বন্দ্ব ছড়িয়ে পড়েছে।

নেত্রকোনায় কমিটি নিয়ে বিভক্তি শুরু : নেত্রকোনা প্রতিনিধি মিজানুর রহমান নান্নু জানান, এক যুগ পর ২০১৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয়েছিল। সম্মেলনে মতিয়র রহমান খানকে সভাপতি এবং আশরাফ আলী খান খসরুকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন নিয়ে দলে বিভক্তি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।

কেন্দ্রের বক্তব্য : বিভিন্ন স্থানে দলীয় কোন্দল নিয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কোনো নেতার জন্য দল সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হোক সেটা আমরা চাই না। দলে নেতাকর্মীদের মধ্যে দূরত্ব ও কোন্দল দূর করতে আমরা উপজেলা পর্যায়েও প্রতিনিধি সম্মেলনের উদ্যোগ নিয়েছি। সারা দেশে দলকে শক্ত অবস্থানে নিতে আটজন সাংগঠনিক সম্পাদক ও চারজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘২০১৭ সালে আমরা কোন্দলের জন্য দায়ী কাউকে ছাড় দেব না। জেলা ও বিভাগ ধরে সম্মেলনও শুরু হয়েছে। সিলেট, সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জে এরই মধ্যে তিনজনকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে দলের নিয়ম না মানার জন্য। ’


মন্তব্য