kalerkantho


রপ্তানির সুযোগসহ ১২ নম্বর ব্লক পেল দাইয়ু

উৎপাদন অংশীদারি চুক্তি সই

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



রপ্তানির সুযোগসহ ১২ নম্বর ব্লক পেল দাইয়ু

ফাইল ছবি

তেল-গ্যাস বিদেশে রপ্তানির সুযোগ রেখে দক্ষিণ কোরিয়াভিত্তিক বহুজাতিক কম্পানি পসকো দাইয়ু করপোরেশনকে গভীর সমুদ্রের ১২ নম্বর ব্লক ইজারা দিয়েছে পেট্রোবাংলা। অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এই ব্লকে তেল-গ্যাস পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন পেট্রোবাংলা ও দাইয়ু করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

কারণ ব্লকটির পাশে মিয়ানমারের ৮৭ নম্বর ব্লকে দাইয়ু করপোরেশন গত বছরই গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে। মিয়ানমারের ওই গ্যাসক্ষেত্র এবং বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রের ১২ নম্বর ব্লকেরও ভূতাত্ত্বিক গঠন একই ধরনের। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর পেট্রোবাংলার পেট্রো সেন্টারে দাইয়ুর সঙ্গে উৎপাদন অংশীদারি চুক্তি (পিএসসি) সই অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ২০১২ সালের সংশোধিত পিএসসি অনুযায়ী চুক্তি সই হয়েছে দাইয়ুর সঙ্গে।

মিয়ানমারের ৮৭ নম্বর ব্লক সীমান্তের ১৬ ও ২১ নম্বর ব্লকও অচিরেই বিদেশি কম্পানির কাছে ইজারা দেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে চুক্তি সই অনুষ্ঠানে। চুক্তি সই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী।

১২ নম্বর ব্লকের গুরুত্ব সম্পর্কে পসকো দাইয়ুর প্রেসিডেন্ট ও সিইও ইয়ান সান কিং অনুষ্ঠানে বলেন, মিয়ানমারে দাইয়ু বড় একটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে। এটি বাংলাদেশের ১২ নম্বর ব্লকের লাগোয়া। ফলে বাংলাদেশের এই ব্লকে গ্যাস পাওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন ২০১০’ অনুসারে প্রাথমিক অনুসন্ধানের মেয়াদ পাঁচ বছর ধরে দাইয়ুর সঙ্গে চুক্তি করেছে পেট্রোবাংলা। তবে এই মেয়াদ আরো তিন বছর বাড়ানো যাবে। মডেল পিএসসি (সংশোধিত) ২০১২ অনুযায়ী এ চুক্তি সই হয়েছে। তিন হাজার ৫৬০ বর্গকিলোমিটারে এক হাজার মিটার গভীর থেকে দুই হাজার মিটারে দাইয়ু অনুসন্ধান করবে। এর মধ্যে দাইয়ু প্রথম তিন বছরে এক হাজার ৮০০ লাইন কিলোমিটার টুডি বা দ্বিমাত্রিক সাইসমিক জরিপ পরিচালনা করবে। এ জন্য দাইয়ুর ব্যয় হবে ৩০ লাখ থেকে ৫০ লাখ ডলার। এর পরবর্তী দুই বছর এক হাজার বর্গকিলোমিটার থ্রিডি বা ত্রিমাত্রিক সাইসমিক জরিপ করবে দাইয়ু। এ জন্য ব্যয় হবে ৫০ লাখ থেকে ৭০ লাখ ডলার। এরপর দক্ষিণ কোরিয়ার এই প্রতিষ্ঠান একটি অনুসন্ধান কূপ খনন করবে, যার জন্য ব্যয় হবে পাঁচ কোটি থেকে সর্বোচ্চ ১০ কোটি ডলার। সব মিলিয়ে পাঁচ বছরে দাইয়ু করপোরেশন পাঁচ কোটি ৮০ লাখ থেকে ১১ কোটি ২০ লাখ ডলার ব্যয় করবে। দাইয়ুর বিনিয়োগ উঠে যাওয়ার পর পেট্রোবাংলা বা সরকারের গ্যাস বা তেল থেকে তেলে ৬৫ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশ এবং গ্যাসে ৬০ শতাংশ থেকে ৮৫ শতাংশ লভ্যাংশ থাকবে।

চুক্তি সই অনুষ্ঠানে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী বলেন, প্রথমে দাইয়ু গ্যাস বিক্রি করার প্রস্তাব দেবে পেট্রোবাংলার কাছে। যদি পেট্রোবাংলা সেই গ্যাস কিনতে না চায় তবে দেশের মধ্যে কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি  করতে পারবে দাইয়ু। যদি দেশের মধ্যে কোনো প্রতিষ্ঠান গ্যাস কিনতে না চায় বেঁধে দেওয়া দামে তাহলে বিদেশে রপ্তানি করতে পারবে।

পেট্রোবাংলা প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাস দাইয়ুর কাছ থেকে কত দামে কিনবে জানতে চাইলে ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী বলেন, এখনই গ্যাসের দাম কত, তা বলা যাবে না। তবে স্থলভাগে যে দামে বিদেশি কম্পানির কাছ থেকে পেট্রোবাংলা গ্যাস কিনে থাকে সাগরভাগের গ্যাসের দাম তার চেয়ে বেশি হবে। কারণ সাগরভাগে বিনিয়োগ বেশি হয়। তা ছাড়া গ্যাস সাগর থেকে স্থলভাগে আনতেও খরচ বেশি হয়।

তবে পেট্রোবাংলার একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম সাড়ে ছয় ডলার ধরা হয়েছে। প্রতিবছর ২ শতাংশ করে গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে।

এর আগে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, গভীর সমুদ্রের ১৫টি ব্লকের মধ্যে আজ একটি ব্লকে অনুসন্ধানের জন্য চুক্তি সই হলো। বাকিগুলোতে অনুসন্ধান চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। অগভীর সমুদ্রের ১১টি ব্লকের মধ্যে এরই মধ্যে তিনটিতে কাজ চলছে, বাকিগুলোয় অনুসন্ধান চালানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। স্থলভাগে ১০৮টি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জুলাই ২০১৮-এর মধ্যে ২৮টি কূপ খনন সম্পন্ন করা হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার কিছুই নেই। সরকার যথাসময়ে সবার জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রায় সমান সমুদ্র বিজয়ের পর আমরা পেয়েছি। এই সমুদ্রের সম্পদ অনুসন্ধানের জন্য আমরা একটি জরিপ জাহাজ কেনার প্রক্রিয়ায় রয়েছি। আমরা ব্লু ইকোনমি সেল গঠন করেছি। সমুদ্র অর্থনীতির জন্য দেশের মানবসম্পদ তৈরির কাজে হাত দিয়েছি। অগভীর সমুদ্রে আমরা দুটি ব্লক ইজারা দিয়েছি। সেখান থেকেও আমরা সুসংবাদ পাব বলে আশা করছি। ’

চুক্তিতে সই করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগের পক্ষে উপসচিব খাদিজা নাজনীন, পসকো দাইয়ুর পক্ষে কম্পানিটির সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়াং সাং কিম এবং পেট্রোবাংলার সচিব মো. আসফাকুর রহমান।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. তাজুল ইসলাম, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব নাজিমউদ্দিন চৌধুরী, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মোহাম্মদ ফয়জুল্লাহ এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত এ এইচ এন সিয়ং দুও।

এর আগে সর্বশেষ ২০১৪ সালে ভারতের ওনজিসি ৪ ও ৯ নম্বর ব্লক, সিঙ্গাপুরের কম্পানি ক্রিস এনার্জি এবং অস্ট্রেলিয়ার কম্পানি সান্টোস যৌথভাবে ১১ নম্বর ব্লকের ইজারা পায়। ওই তিনটি ব্লকই অগভীর সমুদ্রের। ওই তিনটি ব্লক থেকে প্রাপ্ত গ্যাসের ১০ শতাংশ মালিকানা রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের। এই মালিকানার জন্য বাপেক্সকে কোনো অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে না। তবে দাইয়ু করপোরেশনের সঙ্গে গতকালের চুক্তিতে বাপেক্সের কোনো মালিকানা রাখা হয়নি।

সংশোধিত পিএসসি অনুযায়ী লাভ যাবে বিদেশি কম্পানির পকেটে : জানা গেছে, ২০১২ সালের মডেল পিএসসি অনুযায়ী কোনো বিদেশি কম্পানি গ্যাস বা তেল পেলে ওই ক্ষেত্রে বিনিয়োগ উঠে না আসা পর্যন্ত মোট তেল-গ্যাসের ৫৫ শতাংশ পাবে ইজারা পাওয়া কম্পানিটি। বাকি ৪৫ শতাংশ গ্যাসের সমান অনুপাতে ভাগ করা হবে পেট্রোবাংলা ও ইজারাদার বিদেশি কম্পানির মধ্যে। আর বিনিয়োগ উঠে গেলে ৮০ শতাংশ গ্যাসের মালিকানা থাকবে পেট্রোবাংলার হাতে, বাকি ২০ শতাংশ পাবে ইজারাপ্রাপ্ত বিদেশি কম্পানি। কিন্তু ওই পিএসসি সংশোধন করে কস্ট রিকভারি বা বিনিয়োগ না উঠে আসা পর্যন্ত তেল-গ্যাসের হার ঠিক করা হয়েছে ৭০ শতাংশ। অর্থাৎ বিনিয়োগ না ওঠা পর্যন্ত বিদেশি কম্পানি পাবে ৭০ শতাংশ তেল-গ্যাস। বাকি ৩০ শতাংশের অর্ধেক পাবে পেট্রোবাংলা বা মোট গ্যাসের ১৫ শতাংশ, যা পূর্বের পিএসসি থেকে অন্তত সাড়ে ৭ শতাংশ কম গ্যাস পাবে পেট্রোবাংলা।

এর আগের মডেল পিএসসি ২০০৮-এ কম্পানির ‘অদক্ষতা, অযত্ন ও অবহেলা’র কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে ‘উপযুক্ত’ ক্ষতিপূরণের বিধান রাখা হয়েছিল। এ ধারাটি সংশোধন করে ‘অদক্ষতা’র অংশটি বাদ দিয়ে শুধু অযত্ন ও অবহেলার কারণে দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণের কথা বলা হয়েছে। যদিও কোনো আইন লঙ্ঘন করে কী ক্ষতি করলে কী হারে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে সে বিষয়ে কিছুই বলা নেই।


মন্তব্য