kalerkantho


মঈন উদ্দিন

অস্ত্র হাতে তোলার আগেই যুদ্ধ শুরু

মানিক আকবর, চুয়াডাঙ্গা   

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



অস্ত্র হাতে তোলার আগেই যুদ্ধ শুরু

‘১৯৭০ সালের মে মাসের প্রথম সপ্তাহ; ইয়াহিয়া খান মার্শাল ল জারি করেন। অন্যদিকে ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন শুরু হয় ঢাকা ও চট্টগ্রামে। পথে নেমে আসে শ্রমিকরা। সামরিক জান্তার গুলিতে মারা যায় অনেক শ্রমিক। এ সংবাদ  প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ শুরু হয় সারা দেশে; চুয়াডাঙ্গাতেও। ৪ মে থেকে ৬ মের মধ্যে কোনো একদিনের ঘটনা—চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রতিবাদ মিছিল বের করা হয়। ওই মিছিলে ছিলাম আমি, তখন ম্যাট্রিক (এসএসসি) পরীক্ষার্থী। ব্যবসায়ীরাও দোকান বন্ধ করে মিছিলে আসেন। আমার হাতে কালো পতাকা। প্রতিবাদের অংশ হিসেবে কালো পতাকা তোলা হচ্ছিল বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তরে। ’

মুক্তিযোদ্ধা মঈন উদ্দিন বলে যাচ্ছিলেন একনাগাড়ে।

চোখের পাতা পড়ছিল না, চোখের মণি স্থির। কথা বলতে বলতে তিনি যেন ফিরে গিয়েছিলেন সেই দিনগুলোতে। তাঁর সামনে কেউ বসে আছে, সেটা মনেই হচ্ছিল না। তিনি যেন ফিরে গেছেন যুদ্ধের দিনগুলোতে।

‘মিছিলের আগে আগে কালো পতাকা হাতে নিয়ে ঢুকে পড়লাম আলমডাঙ্গা থানায়। থানায় উড়ছে পাকিস্তানি পতাকা। সেই পতাকা অর্ধনমিত করে পাশে কালো পতাকা তুলতে চাইলাম। বাধা দেন এসআই সিরাজুল ইসলাম। জোর করেই পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দিলাম। এ অপরাধে ২১ জুন রাত ২টায় পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তার করে। রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হয়, আমাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ১৮ ডিসেম্বর কুষ্টিয়া কারাগার থেকে মুক্তি পাই। কিছুদিন পরই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়, আমিও শামিল হই যুদ্ধে। ’

‘বেশ কিছু যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়েছি। তার পরও আমার মনে হয়, আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ শুরুর আগে পতাকা পুড়িয়ে যে যুদ্ধ শুরু করেছিলাম সেটাই জীবনের সেরা ঘটনা। ওই ঘটনা আমাকে সরাসরি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রেরণা জুগিয়েছে, সাহস জুগিয়েছে। ’

মুক্তিযোদ্ধা মঈন উদ্দিন বলেন, ‘১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের ১০-১২ তারিখে ভারতের করিমপুর ক্যাম্পে যাই। পরে বেতাই ও আসামে যুদ্ধের ট্রেনিং নিই। আমাকে দুই ধরনের ট্রেনিং দেওয়া হয়। সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার ট্রেনিং ও আগ্নেয়াস্ত্র চালনার ট্রেনিং। আসাম থেকে ফিরি দমদমে। বারাকপুরেও ছিলাম। বারাকপুরে তোফায়েল আহমেদ ও নূরে আলম জিকুর অধীনে ছিলাম। কিছু দিন পর সেখান থেকে দেশে প্রবেশ করি। ’

‘দেশে এসে কুষ্টিয়ার মিরপুরের মারফত আলীর নেতৃত্বে যুদ্ধে অংশ নিই। খলিসাকুণ্ড, কাকিলাদহ, আলমডাঙ্গা, হালসাসহ বিভিন্ন স্থানে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। আলমডাঙ্গায় যুদ্ধ করেছি কাজী কামালের নেতৃত্বে। ’

‘কুষ্টিয়ার মিরপুর থানার কাকিলাদহে যুদ্ধ হয় ২৮ নভেম্বর। তাতে অংশ নিয়েছি। ওই যুদ্ধে চারজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ১৩ পাকিস্তানি সেনা ও ছয় রাজাকার মারা যায়। ’

মুক্তিযোদ্ধা মঈন উদ্দিন আলমডাঙ্গার কালিদাসপুর গ্রামের গঞ্জের আলীর ছেলে। তাঁর বাবার ছিল মুদির দোকান। ১৯৮৩ সালে বাবা মারা গেলে তিনি সংসারের হাল ধরেন। ফার্নিচারের ব্যবসা শুরু করেন। স্ত্রী, দুই ছেলে, এক ছেলের স্ত্রী ও মেয়ে—ছয় সদস্যের সংসার তাঁর। বড় ছেলে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। ২০১৫ সালে ট্রেন দুর্ঘটনায় তিনি গুরুতর আহত হন। তাঁর চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে ছোট ছেলের মুরগির খামার বন্ধ হয়ে যায়, নিজের ফার্নিচারের ব্যবসাও বন্ধ হয়ে যায়। এখন মুক্তিযোদ্ধা ভাতার ওপর চলছে তাঁর সংসার। তাঁর বয়স এখন ৬৫ বছর।

মুক্তিযোদ্ধা মঈন উদ্দিন বলেন, ‘ভারতে যুদ্ধের ট্রেনিং শেষে আমাকেসহ ৫০-৫৫ জনকে একটি নৌকায় তুলে দেওয়া হয়। অস্ত্র হাতে আমরা বাংলাদেশে ঢুকি। টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছিল তখন। ওই দলে কুষ্টিয়ার একদল যোদ্ধা ছিলাম। এলাকার মানুষের সহযোগিতা নিয়ে আমরা লড়াই করেছি। কিন্তু নিরস্ত্র অবস্থায় পাকিস্তানি পতাকায় অগ্নিসংযোগ করে যে লড়াইয়ের সূচনা করেছিলাম, তা বারবার আমাকে নাড়া দেয়। বুকের ভেতর থেকে কেউ যেন বলে, তুমি ওখান থেকেই শুরু করেছ তোমার যুদ্ধ। ’

আরেকটি ঘটনার কথা জানালেন তিনি। বললেন, ‘কুষ্টিয়ার মিরপুর এলাকায় হানাদার বাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। রাখালের ছদ্মবেশ ধরলাম। হাতে গরু চড়ানো লাঠি। মাথায় রাখালের মাথাল। একটি গরুকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। যা আশা করেছিলাম একসময় তাই ঘটল। পাকিস্তানি সেনারা আমাকে আটক করল। কিছু সময় পরে সত্যি সত্যি রাখাল ভেবে চড়-থাপ্পড় মেরে ছেড়ে দিল। লাঠি হাতে মাঠ পেরিয়ে ফিরে এলাম সহযোদ্ধাদের কাছে। সঙ্গে নিয়ে এলাম হানাদার বাহিনীর অবস্থানের তথ্য। ’

মঈন উদ্দিন বলেন, ‘পাকিস্তানি পতাকা পোড়ানো ও মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদান রাখার জন্য আমাকে অগ্নিসেনা উপাধিতে ভূষিত করা হয়। দেওয়া হয় স্বর্ণপদক ও প্রশংসাপত্র। ২০০৮ সালে আলমডাঙ্গা পৌরসভা এভাবেই আমাকে সম্মানিত করে। পরে বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন সংগঠন আমাকে অগ্নিসেনা হিসেবে সংবর্ধিত করেছে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘অভাব নিত্যসঙ্গী হলেও আর্থিক সহায়তা চাই না। মৃত্যুর আগে যেন জানতে পারি, আমাকে অগ্নিসেনা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ’


মন্তব্য