kalerkantho


দেশের জন্য প্রয়োজনে বাবার মতো জীবন দেব

কাজল কায়েস লক্ষ্মীপুর   

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



দেশের জন্য প্রয়োজনে বাবার মতো জীবন দেব

উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ গড়তে প্রয়োজন হলে বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো নিজের জীবন উৎসর্গ করার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। প্রায় ২০ বছর পর লক্ষ্মীপুরে এসে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে জেলা স্টেডিয়ামে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় তিনি এ কথা বলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য, স্বাধীনতার জন্য, অর্থনৈতিক মুক্তি আনতে গিয়ে আমার বাবা, মা, ভাইয়েরা জীবন দিয়ে গেছেন। আমিও জনগণের স্বার্থে, জনগণের কল্যাণে প্রয়োজনে জীবন দেব। ’

লক্ষ্মীপুরবাসীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘লক্ষ্মীপুরের উন্নয়নের জন্য দাবিদাওয়া করতে হবে না, কিছু বলতে হবে না। বাংলাদেশকে আমি চিনি, আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কন্যা। এ দেশের মাঠ-ঘাট, নদী-নালা, খাল-বিল সবই আমার পরিচিত। ’ তিনি বলেন, ‘বাংলার মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নত সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলব। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে মধ্যম আয়ের দেশ। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে উন্নত সমৃদ্ধ দেশ। আপনাদের দোয়া চাই, ভালোবাসা চাই, আগামী প্রতিটি নির্বাচনে নৌকা মার্কায় ভোট চাই।

শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। মা-বাবা, ভাইসহ পরিবারের ১৮ জন সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। এরপর বাংলাদেশে কী হয়েছে? হত্যা ও ক্যুর রাজনীতি। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের রাজনীতি। একের পর এক খুন হয়েছে। নিরীহ নেতাকর্মীর ওপর জেল-জুলুম অত্যাচার শুরু হয়েছে। দেশ পিছিয়ে গেছে। গরিব আরো গরিব হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলে জাতির পিতা আদর্শ গ্রাম শুরু করেছিলেন, গুচ্ছ গ্রাম শুরু করেছিলেন, নদীভাঙ্গা মানুষের পুনর্বাসন করতে শুরু করেছিলেন। বাংলাদেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু জাতির পিতাকে হত্যার পর প্রায় সব কাজই স্থবির হয়ে যায়। ২১ বছর এ দেশের মানুষ কষ্ট পেয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা ’৯৬ সালে সরকার গঠন করে বাংলার মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের কাজ শুরু করি। আমরা দেশের মানুষের জন্য কাজ করি। কৃষক ভাইয়েরা বর্গাচাষিরা ঋণ পেত না; আওয়ামী লীগ সরকার তাদের ঋণের ব্যবস্থা করেছে। এ বাংলাদেশের মানুষ যারা গৃহহারা, নদী ভাঙা তারা ভূমিহীন ও গৃহহীন থাকবে না। প্রত্যেককে আমরা বিনা মূল্যে বাসস্থান তৈরি করে দেব। একটি মানুষও যাতে কষ্ট না পায় সে জন্য আমরা ব্যবস্থা করছি। ’

মেঘনা নদীর ভাঙন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রামগতি ও কমলনগরে মেঘনা নদীর তীর রক্ষা বাঁধের (প্রথম পর্যায়) উদ্বোধন করেছি। শিগগিরই দ্বিতীয় পর্যায় শুরু করব। আমরা নদী ভাঙন থেকে লক্ষ্মীপুরকে রক্ষা করব। ’ ওই সময় লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করার ঘোষণা দেন তিনি।

আওয়ামী লীগের সভাপতি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য দেশকে উন্নত করা। কিন্তু বিএনপি কী করেছে এ দেশে? এ লক্ষ্মীপুরে যেভাবে তারা অত্যাচার করেছে আমাদের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ঘরে থাকতে পারেনি। বিএনপি আসা মানেই জঙ্গিবাদ সন্ত্রাস সৃষ্টি করা। তারা ক্ষমতায় আসা মানেই দেশের মানুষের জীবনের নাভিশ্বাস ওঠা। ’

শেখ হাসিনা বলেন, জোট সরকার (২০ দলীয়) যখন ক্ষমতায় ছিল এ লক্ষ্মীপুরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ১৩ নেতাকর্মীকে নির্মমভাবে তারা হত্যা করেছিল। বিএনপি ধর্মে বিশ্বাস করে না। ২০১৫ সালে বায়তুল মোকাররমে শত শত কোরআন শরিফ পুড়িয়েছে। মসজিদে আগুন দিয়েছে। কৃষকলীগ নেতা আযম কোরআন শরিফ পড়তেছিলেন সেখানে তাঁকে খুন করা হয়েছে। যারা এভাবে মানুষ খুন করে, যারা কোরআন শরিফ পোড়ায়, যারা মসজিদে আগুন দেয় তারা কিসের জনকল্যাণে কাজ করবে। ওই বিএনপির নেত্রী হুকুম দিয়ে দিয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে আওয়ামী লীগ নেত্রী অভিযোগ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দেশের মানুষের কল্যাণ চাই। ইসলাম ধর্ম শান্তির ধর্ম। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি প্রতিটি উপজেলায় এবং জেলায় একটি করে মসজিদ এবং ইসলামিক কালচারাল সেন্টার তৈরি করে দেব। সেখানে ইসলামের সত্যিকারের শিক্ষা মানুষ পাবে। ’

এর আগে প্রধানমন্ত্রী জনসভাস্থলের পাশে ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে ১০টি প্রকল্পের উদ্বোধন এবং ১৭টি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীদের বহনকারী হেলিকপ্টারটি দুপুর ১টার পর লক্ষ্মীপুরের দালালবাজার ডিগ্রি কলেজ হেলিপ্যাডে অবতরণ করে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘লক্ষ্মীপুরে লক্ষ্মী ফিরে এসেছেন। লক্ষ্মীপুরে বিএনপির মিছিল করার এখন আর ক্ষমতা নেই। ’ দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশ করে তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিন। পকেট কমিটি করবেন না। ত্যাগী নেতাকর্মীদের নিয়ে কমিটি করেন। প্রধানমন্ত্রী অন্যায় পছন্দ করেন না। অন্যায় করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম ফারুকের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়নের সঞ্চালনায় জনসভায় বক্তব্য দেন লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসনের এমপি এ কে এম শাহজাহান কামাল, লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি ও কমলনগর) আসনের এমপি আবদুল্লাহ আল মামুন, লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর ও সদরের একাংশ) আসনের এমপি মোহাম্মদ নোমান, লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনের এমপি লায়ন এম এ আউয়াল, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এ কে এম এনামুল হক শামীম, যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক হারুনুর রশিদ, কৃষি ও সমবায়বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন নাহার লায়লী, কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ দেবনাথ, লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শামছুল ইসলাম, লক্ষ্মীপুর পৌরসভার মেয়র আবু তাহের, আওয়ামী লীগ নেতা এম এ মমিন পাটোয়ারী প্রমুখ।

স্থানীয় নেতারা তাঁদের বক্তব্যে কমলনগর মেঘনা নদীর ভাঙন রোধে তীর রক্ষায় আরো সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ, কৃষি খামার, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন, চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা বাস্তবায়ন, লক্ষ্মীপুর-ঢাকা-লক্ষ্মীপুর-চট্টগ্রাম সড়ক চার লেনে উন্নীত করা ও নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপনসহ কয়েকটি দাবি জানান।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধন করা প্রকল্পগুলো হলো রামগতি ও কমলনগর মেঘনা নদীর তীর সংরক্ষণ প্রকল্প (প্রথম পর্যায়), চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন, যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা পরিষদ ভবন, সদর উপজেলা পরিষদ অডিটরিয়াম, কমলনগর উপজেলা পরিষদ ভবন, কমলনগর উপজেলা অডিটরিয়াম, লক্ষ্মীপুর পৌর আইডিয়াল কলেজ ভবন, মোহাম্মদিয়া বাজার পুলিশ তদন্তকেন্দ্র নির্মাণ (তৃতীয় ও চতুর্থ), কমলনগর উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও প্রাণী হাসপাতাল।

ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল, মজু চৌধুরীর হাট কোস্ট গার্ডের প্রশাসনিক ভবন ও নাবিক নিবাস, সদর পুলিশ ফাঁড়ির পুলিশ অফিসার্স মেস, আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস ভবন, সদর খাদ্যগুদামে ৫০০ টন ধারণক্ষতার নতুন গুদাম নির্মাণ, রামগঞ্জ উপজেলায় ১৩২/৩৩ কেবি গ্রিড উপকেন্দ্র নির্মাণ, পিয়ারাপুর সেতু, চেউয়াখালী সেতু, মজু চৌধুরীর হাটে নৌবন্দর, লক্ষ্মীপুর পৌর আধুনিক বিপণিবিতান, রামগঞ্জে আনসার ও ভিডিপি ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তর কমপ্লেক্স, লক্ষ্মীপুর পৌর আজিম শাহ (রা.) হকার্স মার্কেট, লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজ একাডেমিক ভবন কাম পরীক্ষা কেন্দ্র, লক্ষ্মীপুর পুলিশ লাইনস মহিলা ব্যারাক নির্মাণ, লক্ষ্মীপুর শহর সংযোগ সড়কে পিসি গার্ডার সেতু নির্মাণ, রায়পুর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন ও কমলনগর ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স স্টেশন।


মন্তব্য