kalerkantho


দিনাজপুরে নারী মুরিদসহ পীর খুন

পুলিশ অন্ধকারে খাদেমসহ চারজন ‘নজরদারিতে’

সালাহ উদ্দিন আহমেদ, দিনাজপুর   

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



পুলিশ অন্ধকারে খাদেমসহ চারজন ‘নজরদারিতে’

স্বজনদের আহাজারি

দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলায় কথিত পীর ফরহাদ হোসেন চৌধুরী ও তাঁর নারী মুরিদ হত্যাকাণ্ডের এক দিন পার হলেও কারা, কী উদ্দেশ্যে তাঁদের হত্যা করেছে এ বিষয়ে কোনো সূত্রের নাগাল পায়নি পুলিশ। সন্দেহভাজন কাউকে আটকও করতে পারেনি তারা।

তবে ফরহাদ চৌধুরীর প্রতিষ্ঠা করা দরবার শরিফের প্রধান খাদেমসহ কয়েকজন মুরিদকে কয়েক দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পুলিশ মনে করছে, ধর্মীয় মতভেদের কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। তবে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার সন্দেহও উড়িয়ে দিচ্ছে না তারা। ঘটনা তদন্তে পুলিশের ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো মামলাও হয়নি।

গত সোমবার সন্ধ্যার দিকে উপজেলার আটগাঁও ইউনিয়নের দৌলা গ্রামে ঘরে ঢুকে ফরহাদ চৌধুরী (৬৫) ও তাঁর নারী মুরিদ রুপালি বেগমকে (১৮) কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। গ্রামের ভেতরে কারা, কখন এসে কিভাবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে চলে গেল সে বিষয়ে স্থানীয়রাও স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারছে না। তবে তারা বলছে, সোমবার সন্ধ্যার দিকে দুটি মোটরসাইকেলে অপরিচিত পাঁচজন আরোহীকে ঘটনাস্থল থেকে সরে যেতে দেখেছে তারা। রাত সাড়ে ৯টার দিকে খুনের ঘটনা জানাজানি হয়েছে।

তাই সন্ধ্যায় মোটরসাইকেলের অপরিচিত আরোহীদের গতিবিধি নিয়ে সন্দেহ জাগেনি কারো। এমনকি গুলিরও কোনো শব্দ পায়নি তারা।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, দরবারের খাদেম সাইদুর রহমানসহ চারজনকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে পুলিশের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।  

গতকাল মঙ্গলবার সকালে দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে দুজনের লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আমির উদ্দিন জানান, ফরহাদ চৌধুরীর বুকের ডান দিক দিয়ে গুলি ঢুকে বাঁ দিকে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। তার বুকসহ ডান হাতে তিনটি কোপের গভীর ক্ষত রয়েছে। রুপালির বুকে গুলি ঢুকে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। তাঁর শরীরেও ছুরিকাঘাতের ক্ষত চিহ্ন রয়েছে।

শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী গতকাল বিকেলে দিনাজপুরের বড় মাঠে জানাজা শেষে মাগরিবের নামাজের পর দৌলা গ্রামে নিজের দরবার শরিফের একাংশে দাফন করা হয়েছে ফরহাদ চৌধুরীকে।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, রুপালি পাশের মাধবপুর গ্রামের হাসের আলীর মেয়ে। তবে শিশু অবস্থা থেকেই তাঁকে মেয়ের মতো লালনপালন করেছেন ফরহাদ চৌধুরী। রুপালি তাঁকে ‘পীর বাবা’ বলে ডাকত। তার জন্য রান্নার কাজ করত সে (রুপালি)। গত বৃহস্পতিবার জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার তিলকপুর গ্রামের সফিকুল হকের সঙ্গে তাঁর বিয়ে (মোহর) দিয়েছেন ফরহাদ চৌধুরী। গতকাল মাধবপুর গ্রামে রুপালিকে দাফন করা হয়।

স্থানীয়রা জানায়, ২০১০ সালে পৈতৃক নিবাস দৌলায় কাদরিয়া মোহাম্মদিয়া দরবার শরিফ প্রতিষ্ঠা করেন ফরহাদ চৌধুরী। সেখানে তিনি নিয়মিত মাহফিল পরিচালনা করতেন। প্রতি বৃহস্পতিবার বড় মাহফিলের আয়োজন হতো। অন্য দিন রাত ৯টার দিকে মাহফিলে ভিড় করত নারী-পুরুষ মুরিদরা। তাঁকে ‘বাবা’ বলে ডাকত তারা। সোমবার রাতেও দরবারে অংশ নিতে হাজির হতে থাকে মুরিদরা। রাত ৯টার দিকে দরবার শরিফের কক্ষে ফরহাদ চৌধুরী ও রুপালির লাশ পায় তাঁরা। চাদর দিয়ে লাশ ঢেকে রেখেছিল দুর্বৃত্তরা।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, পীর হিসেবে দরবার শরিফ পরিচালনার আগে ফরহাদ চৌধুরী দিনাজপুর জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। পরে সাধারণ সম্পাদকও হয়েছিলেন। বিএনপির দিনাজপুর পৌর কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালনের সময় ঘড়ি প্রতীক নিয়ে পৌর মেয়র পদে নির্বাচনও করেছিলেন। তাতে পরাজিত হয়ে দলে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। এরপর দরবার শরিফ খুলে নিজেকে পীর হিসেবে প্রতিষ্ঠায় মনোযোগ দেন। তাঁর দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। বড় ছেলে এফ এম আশিকুর রহমান চৌধুরী পরিবহন ব্যবসায়ী, ছোট ছেলে আবু নাসের চৌধুরী ঢাকার একটি ফার্মে এবং মেয়ে ফাতিমা ফারহানা এ্যানি দিনাজপুরের হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। দিনাজপুর জেলা সদরের দক্ষিণ বালুয়াডাঙ্গা মহল্লায় সপরিবারে বসবাস করেন তাঁরা।

গতকাল ওই বাসায় গেলে ফাতিমা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা কিছু ধারণা করতে পারছি না। বাবার সঙ্গে কারো শত্রুতা ছিল না। কারা, কেন তাঁকে হত্যা করেছে তা তদন্তের মাধ্যমে বের করার আহ্বান জানাচ্ছি। ’ 

খুনের ঘটনার বিষয়ে দরবার শরিফের প্রধান খাদেম সাইদুর রহমান ও জনি নামের এক মুরিদ জানান, তাঁরা ভেবেছিলেন ‘পীর বাবা’ ঘুমিয়ে আছেন। ডাকাডাকিতে সাড়া না পাওয়ায় শরীরের চাদর সরিয়ে রক্তে ভেজা নিথর দেহ দেখতে পান। পরে অন্যদের খবর দেন। তবে কারা জড়িত তা জানতে পারেননি তাঁরা। গুলিতে জোড়া খুনের ঘটনা ঘটলেও গুলির কোনো শব্দ পায়নি স্থানীয়রা। এমনকি আশপাশের বাড়িঘরের কেউও কিছু বলতে পারছে না।

ফরহাদ চৌধুরীর ভাতিজা স্থানীয় বিএনপি নেতা সাদিক রিয়াজ পিনাক জানান, তিনিসহ গ্রামের অনেকেই স্থানীয় এক ব্যক্তির দাফনে অংশ নিতে সোমবার সন্ধ্যায় পাশের মাধবপুর গ্রামে অবস্থান করছিলেন। খুনের বিষয়টি টের পাননি তাঁরা।

খবর পেয়ে সোমবার রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন দিনাজপুরের এসপি হামিদুল আলম এবং র‌্যাব, কাউন্টার টেররিজম ইউনিটসহ জেলা পুলিশের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা। তাঁরা বলেছেন, ধর্মীয় নেতৃত্বের বিরোধের জের ধরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে কি না তা খতিয়ে দেখছেন তাঁরা। তবে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও উড়িয়ে দিচ্ছেন না। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহফুজ্জামান আশরাফকে প্রধান করে ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

গতকাল বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন পুলিশের রংপুর রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মঞ্জুরুল করিম। খুনের সঙ্গে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগের কোনো ঘটনায় চাপা থাকেনি। তদন্তের মাধ্যমে এ ঘটনায় জড়িতদের সম্পর্কেও তথ্য বের হয়ে আসবে।

পুলিশ বু্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) অতিরিক্ত সুপার মধুসূদন জানান, আলামত হিসেবে ঘটনাস্থল থেকে গুলির (৭.৬৫ মি.মি.) একটি খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। ক্লু উদ্ধারে প্রযুক্তিগত কারিগরি সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। ধর্মীয় মতভেদ, পারিবারিক বিরোধ, পূর্বশত্রুতা, অর্থ সম্পদ এবং জঙ্গি সংশ্লিষ্টতাসহ সব বিষয় খতিয়ে দেখতে ছায়া তদন্ত চালাচ্ছেন তাঁরা।

র‌্যাব-১৩ দিনাজপুর ক্রাইম প্রিভেনশন কম্পানি (সিপিসি)-১ ক্যাম্পের অধিনায়ক মেজর তালুকদার নাজমুল শাকিব জানান, পুলিশের পাশাপাশি ঘটনাস্থল পরিদর্শক করেছেন তাঁরা। ঘটনায় জড়িতদের খুঁজে বের করতে তাঁরাও তদন্ত করছেন।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, খাদেম সাইদুর, মুরিদ জনি, সুফিয়াসহ চারজনকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

তবে বোচাগঞ্জ থানার পরিদর্শক সাজ্জাদ হোসেন গতকাল জানান, সন্ধ্যা পর্যন্ত মামলা হয়নি। খাদেমসহ কয়েকজন মুরিদকে কয়েক দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে কাউকে আটক করা হয়নি। নজরদারিতেও রাখা হয়নি।


মন্তব্য