kalerkantho


ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে প্রতিকার মিলছে

এম সায়েম টিপু ও শওকত আলী   

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে প্রতিকার মিলছে

রাজধানীর আইটি সিরামিক নামের একটি দোকান থেকে ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে ‘বাথ ও বেসিন’-এর এক সেট পানির কল পাঁচ হাজার ৫০০ টাকায় কিনেছিলেন আনোয়ারুল ইসলাম। কল দুটির ওপর পাঁচ বছরের ওয়ারেন্টি ছিল।

বছর তিনেক ব্যবহার করার পর একটি কল থেকে ঠিকমতো সার্ভিস পাচ্ছিলেন না তিনি। কলের জয়েন্ট থেকে পানি লিক করছিল। সে অবস্থায় ওয়ারেন্টির কাগজ নিয়ে ক্রেতা দোকানির কাছে যান সার্ভিসিং সুবিধার জন্য। সমস্যার কথা তুলে ধরে তিনি প্রাপ্য সেবা দাবি করেন। কিন্তু দোকানি তাঁকে সেবা দিতে অস্বীকৃতি জানান। তখন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের সুযোগ নিয়ে আনোয়ারুল ইসলাম ডকুমেন্টসহ লিখিত অভিযোগ করেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে। এতে আইন অনুযায়ী শাস্তি এড়াতে বিক্রেতা মিস্ত্রি পাঠিয়ে আনোয়ারুল ইসলামের কল সারিয়ে দেন।

একইভাবে সম্প্রতি এক ক্রেতার একটি ফ্রিজ কেনার এক মাসের মধ্যে নষ্ট হয়ে পড়লে বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ক্রেতার চাহিদামতো সেটির বদলে নতুন ফ্রিজ না দিয়ে আগেরটি সারিয়ে দিতে চাইলেও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে মামলা করার সুবাদে ক্রেতা নতুন ফ্রিজই পেয়েছেন। এভাবে ওই আইনের আওতায় প্রতিকার চেয়ে সুফল পাওয়ার ঘটনা দিন দিন বাড়ছে।

২০১৬ সালে সারা বছরে যতসংখ্যক অভিযোগ জমা পড়েছিল তার চেয়ে বেশি অভিযোগ পড়েছে এ বছরের প্রথম দুই মাসেই। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের আওতায় অভিযোগ করা হলে সাধারণত সাত দিনেই তা নিষ্পত্তি করা হয়। এ ক্ষেত্রে বিক্রেতাকে জরিমানা করা হলে সেই অর্থের ২৫ শতাংশ নগদ সহায়তা হিসেবে দেওয়া হয় অভিযোগকারী তথা ভোক্তাকে।

তবে এখনো দেশের বেশির ভাগ মানুষ এ আইন বা এর কার্যকারিতা সম্পর্কে জানেই না। যারা জানে তাদেরও বড় অংশ মনে করে, অভিযোগ করে লাভ নেই। ভোক্তা অধিকার আইন বিষয়ে নাগরিক সমাজের ধারণা ও সচেতনতা জানার জন্য কনজ্যুমারস ফোরামের (সিএফ) পক্ষ থেকে সম্প্রতি ঢাকা নগরের  ২৩টি এলাকায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ৪০৮ জনের ওপর একটি জরিপ পরিচালনা করা হয়। জরিপের ফলে দেখা যায়, এখনো দেশের ৩৬.২০ শতাংশ মানুষ জানে না দেশে ক্রেতা-ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণমূলক একটি আইন কার্যকর আছে। ৪৭.৫৫ শতাংশ মানুষ জানে না ক্রেতা-ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে সরকারিভাবে একটি অধিদপ্তর স্থাপন করা হয়েছে। পণ্য ও সেবা গ্রহণ করে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ৩৩.৩৩ শতাংশ মানুষ কোথাও কোনো অভিযোগ করে না।

ওই জরিপে অংশ নেওয়া নাগরিকরা মনে করেন, ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে ভোক্তা অধিকার আন্দোলনে সম্পৃক্ত ও সচেতন করতে পত্রপত্রিকা ও রেডিও-টেলিভিশনে নিয়মিত প্রচার চালানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে নাগরিকরা পাড়া-মহল্লায় ভোক্তা সংগঠন গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা যদিও দাবি করেছেন, অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ক্রেতা-ভোক্তাদের অভিযোগ অধিদপ্তরে দায়ের করার জন্য কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞাপন এবং মোবাইল ফোনে মেসেজ প্রচার করা হয়েছে। বাস্তবে এসব প্রচার জনগণের মধ্যে তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি। সিএফ জরিপের ফল অনুযায়ী ৬৯.৬০ শতাংশ মানুষ জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এসব প্রচার সম্পর্কে অবগত নয়। জরিপে অংশ নেওয়া নাগরিকরা মনে করেন, এ বিষয়ে গণমাধ্যমে ধারাবাহিক ও নিয়মিত প্রচার চালানোর জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভোক্তা অধিকার নিশ্চত করতে হলে সবার আগে জোর দিতে হবে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরির ওপর। সারা দেশে ভোক্তার স্বার্থ সুরক্ষার বার্তা পৌঁছে দেওয়াটা জরুরি। সেটি কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের একক প্রচেষ্টা কিংবা সক্ষমতা দিয়ে সম্ভব হবে না। সরকারের আন্তরিকতা থাকতে হবে। পাশাপাশি সুধীসমাজকেও উদ্যোগী হতে হবে। এগিয়ে আসতে হবে সাধারণ মানুষকেও। এ ছাড়া ভোক্তা অধিকার-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো বেশ দুর্বল। এগুলোকে আরো ভোক্তা-সহায়ক করতে হবে। পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে বিএসটিইআইকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। ’

বাংলাদেশ অ্যাসোশিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) সভাপতি মোস্তাফা জব্বার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভোক্তারা জানেই না তাদের অধিকারের জন্য একটি আইন আছে এবং প্রতিষ্ঠানও আছে। তাই অভিযোগ জানাতে সে কোথাও যায় না। অভিযোগ করার প্লাটফরমটি সহজ করা না গেলে প্রতি বছরই একটা হতাশার চিত্রই উঠে আসবে। তথ্য-প্রযুক্তিই পারে অভিযোগের জায়গাটিকে সহজ করতে। এ জন্য কল সেন্টারসহ মোবাইল ফোনে কোনো প্রযুক্তির ব্যবহার করা যেতে পারে। ’

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০০৯ সালে আইনটি কার্যকর হওয়ার পর ২০১০ সালে ওই আইনের আওতায় অধিদপ্তরে অভিযোগ এসেছিল মোট ৭৩টি। সব কটিই নিষ্পত্তি হয়েছে। পরের তিন বছর অভিযোগের হার ছিল আরো কম। তবে এর পর থেকে বছর বছর বাড়ছে অভিযোগ তথা মামলা। সেই সঙ্গে প্রতিকারও পাচ্ছে ভোক্তারা। ২০১৪ সালে অভিযোগ জমা পড়ে ৫৩৭টি, সব কটিই নিষ্পত্তি হয়। ২০১৫ সালে ২২৫টি অভিযোগ জমা পড়ে, যার মধ্যে একটি ছাড়া সবই নিষ্পত্তি হয়। ২০১৬ সালে অভিযোগ পড়ে এক হাজার ৬২২টি, যার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে এক হাজার ৬০৬টি। ২০১৭ সালের প্রথম দুই মাসেই এক হাজার ৬৮২টি অভিযোগ জমা পড়েছে। নিষ্পন্ন না হওয়া অভিযোগের মধ্যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অভিযোগ জমা দেওয়ার পর অভিযোগকারী আর সাড়া দেননি। ফলে অভিযোগগুলো ‘নথিভুক্ত’ করে রাখা হয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, মামলার সব কটিই ভোক্তার অনুকূলে গেছে। ভোক্তাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ বাবদ আদায় করা হয়েছে ১৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এ ছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠানকে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সার্ভিসিং সেবা দিতে বাধ্য করা হয়েছে।

মাসুদুল মান্নান নামের এক ক্রেতা হাউয়াই এক্সপেরিয়েন্স শপ নামের একটি দোকান থেকে টি-১-৭ মডেলের একটি ট্যাব কেনেন। সাত দিনের মধ্যে কোনো সমস্যা হলে সেটি মেরামত বা পরিবর্তন করে দেওয়ার লিখিত প্রতিশ্রুতি দেন বিক্রেতা। কিন্তু দুই দিনের মাথায় ট্যাবটিতে সমস্যা দেখা দিলে গ্রাহক বিক্রেতার কাছে যান। বিক্রেতা ট্যাবটি সারাতে গিয়ে আরো একটি পার্টস নষ্ট করে ফেলেন। তখন বিক্রেতা সেটিও ঠিক করে দিতে চান। কিন্তু ক্রেতা চান নষ্ট ট্যাবের বদলে নতুন ট্যাব। সমাধান না পেয়ে মাসুদুল মান্নান মামলা করেন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে। সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা দুই পক্ষের শুনানি শেষে ট্যাবটি পরিবর্তন করে দেওয়ার নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী বিক্রেতা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই ট্যাবটি পরিবর্তন করে দেন।

আশুলিয়ার জালালাবাদ হাউজিংয়ে বসবাসরত শহীদুল হকের বিদ্যুৎ বিল এক মাসে হঠাৎ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে কোনো সমাধান না পেয়ে তিনি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে মামলা ঠুকে দেন বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর বিরুদ্ধে। দুই পক্ষকে শুনানিতে ডাকা হলে দেখা যায় গ্রাহকের বিদ্যুতের লাইনের কিছু সমস্যার কারণেই মিটারে ভুল তথ্য উঠে আসে। সেটাও প্রায় ২০০ ইউনিটের মতো, যার দাম দুই হাজার চার টাকা। পরে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর পক্ষ থেকে বর্ধিত বিল বাদ দেওয়া হয়।

আগে অধিদপ্তরে গিয়ে অভিযোগ জমা দিতে হলেও এখন অনলাইনেই সেটি করা যাচ্ছে। অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে অন্যান্য অপশনের মধ্যে অভিযোগের ফরম রয়েছে। সেটি পূরণ করে মেইলের মাধ্যমে অভিযোগ দায়ের করা যায়।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, পানির কল কিনে কেউ তিন বছরের মাথায় এসে আবার সার্ভিসিং সুবিধা পাবে এটা অনেকে চিন্তাও করে না। কিন্তু তাদের সেবা প্রাপ্তির যে অধিকার রয়েছে, তারা যাতে সেটি যথাযথভাবে পায় সে জন্যই কাজ করে যাচ্ছে অধিদপ্তর।

অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম লস্কর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সব ধরনের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে তাদের আচরণের বিষয়ে সতর্কবার্তা পৌঁছে দিচ্ছি। কারণ কেউ অভিযোগ করলে আমরা শুধু জরিমানা নয়, দোকান সিলগালা করে দিতেও পিছপা হই না। এ জন্য ভোক্তাদের সাড়া প্রয়োজন। যদিও এখন অনেকে স্বপ্রণোদিত হয়ে আমাদের কাছে অভিযোগ করছে। আবার প্রতিকারও পাচ্ছে। আমাদের ১৩ জন তদন্ত কর্মকর্তা সার্বক্ষণিক অভিযান ও শুনানির কাজ করছেন। এখানে আরো বেশ কিছু কর্মকর্তা দেওয়া হচ্ছে। এতে কাজে আরো গতি আসবে বলে আশা করছি। ’

শফিকুল ইসলাম লস্কর আরো বলেন, ‘এখন শুধু ছোট দোকানিদের নয়, গ্রামীণফোনের মতো বড় কম্পানিকেও আমরা ছাড় দিচ্ছি না। কয়েক দিন আগে গ্রামীণফোনকে আড়াই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে, যা থেকে আবার ৬২ হাজার টাকা পাচ্ছেন অভিযোগকারী। আমরা এলাকাভিত্তিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকদের আমন্ত্রণ জানাই। প্রতি সপ্তাহে এক দিন গণশুনানি হয়। সেখানে তাঁদের আইন সম্পর্কে জানানো হয়। পরামর্শ দেওয়া হয় যাতে তাঁরা অসৎ উপায়ে ব্যবসা করা থেকে বিরত থাকেন। ’


মন্তব্য