kalerkantho


পুলিশপ্রধানদের সম্মেলন

৮২% জঙ্গি সৃষ্টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে

গুণারত্নের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করলেন আইজিপি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৪ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ঢাকায় ইন্টারপোলের দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক অফিস করার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। উদ্দেশ্য হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে গতি বাড়ানো এবং তথ্য আদান-প্রদান সহজ করা।

ইন্টারপোল প্রস্তাবে সাড়া দিয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর খুনি, মোস্ট ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল ও পলাতক জঙ্গি ধরার বিষয়েও একমত হয়েছে ইন্টারপোল ও বাংলাদেশ পুলিশ। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট দেশের প্রতিনিধিরা এসব অপরাধীকে ধরে বাংলাদেশে ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।

চিফস অব পুলিশ কনফারেন্সে যোগ দেওয়া কর্মকর্তাদের সঙ্গে আইজিপিসহ পুলিশ কর্মকর্তাদের আলোচনা থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

সোনারগাঁও হোটেলে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গতকাল সোমবার ছিল দ্বিতীয় দিন। কাল চারটি অধিবেশনে ১২টি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। বক্তারা জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস দমনে আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

কনফারেন্সে পুলিশ সদর দপ্তরের একটি গবেষণার তথ্য উপস্থাপন করা হয়।

২৫০ জন জঙ্গির ওপর এ গবেষণা চালানো হয়। জানানো হয়, শতকরা ৮২ ভাগ ফেসবুক ও টুইটারের মাধ্যমে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছে। ২২ শতাংশ মোবাইল ফোনে তথ্য আদান-প্রদান করে।

কনফারেন্সে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, মিয়ানমার থেকে প্রতিদিন ইয়াবার চালান আসছে। এটা বন্ধ করতে মিয়ানমারকে এগিয়ে আসতে হবে। সে দেশের ১৩টি ইয়াবা কারাখানা বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়।

গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার ঘটনা আইএস ঘটিয়েছে বলে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর পলিটিক্যাল ভায়োলেন্স অ্যান্ড টেররিজম রিসার্চের (আইসিপিভিটিআর) পরিচালক রোহান গুণারত্ন যে বক্তব্য দিয়েছেন তা প্রত্যাখ্যান করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক। তিনি বলেন, ‘গুলশান হামলার বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পুলিশ সমর্থন করে না। রোহান সাহেব একজন প্রফেসর। তিনি পুলিশ কর্মকর্তা নন। তাঁর বক্তব্য সমর্থন করি না। ’

পুলিশ সূত্র জানায়, গতকাল সকাল ৯টার দিকে সম্মেলন শুরু হয়। শুরুতে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নিয়ে আলোচনা করেন বক্তারা। প্রথম অধিবেশনে তিনটি প্রবন্ধ উপস্থাপিত হয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ কে এম আবদুর রহমান, শ্রীলঙ্কা পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল পুজিৎ জয়াসুন্দারা ও র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ প্রবন্ধ তিনটি উপস্থাপন করেন।

দ্বিতীয় অধিবেশনে চারটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল এ কে এম শহীদুল হক, এনএসআইয়ের পরিচালক কমোডর এম এন আবছার, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান ও পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (গোপনীয়) মো. মনিরুজ্জামান এগুলো উপস্থাপন করেন।

তৃতীয় অধিবেশনে দুটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। চীনের ডেপুটি হেড অব এনসিবি উ চেংতাও এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক (ডিআইজি) সৈয়দ তৌফিক উদ্দিন আহমেদ এগুলো উপস্থাপন করেন।

চতুর্থ ও শেষ অধিবেশনে তিনটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। স্পেশাল ব্রাঞ্চের ডিআইজি মো. মাজহারুল ইসলাম, পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (অপারেশনস্) ও হেড অব এনসিবি মাহবুবুর রহমান, যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআইয়ের সুপারভাইজরি স্পেশাল এজেন্ট ফেইরা জিমেনেস এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সাইবার টেরর ইনভেস্টিগেশন টিম লিডার চাং জুন-ওন প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

কনফারেন্সে আইজিপি শহীদুল হক বলেন, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ দমনে কমিউনিটির অংশগ্রহণ বিশেষ ভূমিকা রাখছে। সমাজের টেকসই নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য চরমপন্থার ভয়াবহ ফল সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ ও কমিউনিটির মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ জঙ্গিবাদ সমর্থন করে না। তারা শান্তিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে থাকতে পছন্দ করে। এ বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে মানুষকে জঙ্গিবাদের ব্যাপারে সচেতন করা সম্ভব হয়েছে। জঙ্গিবাদ নির্মূল করার জন্য জনসচেতনতা ও প্রচারণামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখা বিশেষ প্রয়োজন।

মেজর জেনারেল এ কে এম আব্দুর রহমান বলেন, চরমপন্থা ও জঙ্গিবাদকে বিশেষ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা নতুন বিষয় নয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এর বাইরে নয়। এ অঞ্চলের বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থানের (সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট, নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী, ধর্মীয় সম্প্রদায় প্রভৃতি) কারণে এ অঞ্চলের জঙ্গিবাদকে আঞ্চলিকভাবেই মোকাবিলা করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এ সত্য অনুধাবন করেই সার্ক, বিমসটেক বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

শ্রীলঙ্কার পুলিশপ্রধান জঙ্গিবাদ দমনে শ্রীলঙ্কা পুলিশের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেন। দক্ষিণ এশিয়ার পুলিশ বাহিনীগুলোর সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্কের বিষয়ে তিনি আলোকপাত করেন।

র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ বলেন, বিশ্বায়ন ও তথ্য-প্রযুক্তির এ যুগে সন্ত্রাসবাদ ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ নেই। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। সন্ত্রাসীদের আন্তর্দেশীয় যোগাযোগ শুধু আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার জন্যই হুমকি নয়, এটি রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের জন্যও বিশাল হুমকি। জঙ্গিবাদ দমনে আঞ্চলিক সহযোগিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

পুলিশপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠক : বিকেলে আইজিপিসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ইন্টারপোলের মহাসচিব ড. ইয়ুর্গেন স্টক, মালয়েশিয়ার আইজিপি খালিদ বিন আবু বকর, মিয়ানমারের আইজিপি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিও সোয়ে উইন, আফগানিস্তানের সিনিয়র ডেপুটি মিনিস্টার ফর সিকিউরিটি আবদুল রহমান, চীনের এনসিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট উ চেংতাও, কোরিয়া পুলিশের চিফ সুপারিনটেনডেন্ট জেনারেল কিম কুই চান, শ্রীলঙ্কা পুলিশের আইজি পুজিৎ সেনাধি বান্দারা এবং ফেসবুকের ট্রাস্ট অ্যান্ড সেফটি ম্যানেজার ভিক্রাম লেংগের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন।

বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফেরত প্রসঙ্গ : ইন্টারপোল মহাসচিবের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। বৈঠকে বলা হয়, নূর চৌধুরী, এ এম রাশেদ চৌধুরী, শরিফুল হক ডালিম, আবদুর রশিদ, ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদ ও রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন বিভিন্ন দেশে পালিয়ে আছে। তাদের ধরে ফেরত আনার ব্যাপারে ইন্টারপোলের পাশাপাশি অন্য দেশের পুলিশপ্রধানরাও একমত পোষণ করেছেন। ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার পলাতক আসামিদের ফেরত আনার বিষয়েও আলোচনা হয়। এ ছাড়া সিটিটিসি, সিআইডি, এসবি, ট্যুরিস্ট পুলিশ, নৌ পুলিশ, পিবিআইয়ের অফিসারদের প্রশিক্ষণ, ওয়ার্কশপ, সেমিনারে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর জন্য ইন্টারপোল মহাসচিবকে অনুরোধ জানান আইজিপি।

ঢাকায় ইন্টারপোলের আঞ্চলিক অফিস : ইন্টারপোলের সঙ্গে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর তথ্য আদান-প্রদান আরো সহজ করতে ঢাকায় ইন্টারপোলের একটি শাখা অফিস খোলার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। প্রস্তাবের বিষয়ে ইন্টারপোলের মহাসচিব ইতিবাচক সাড়া দেন। আইজিপিকে তিনি বলেন, ‘আপনারা অফিস তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন। আমরা দ্রুত সিদ্ধান্ত দেব। ’

গুণারত্নের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান : সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সিঙ্গাপুরের নানিয়াং প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রোহান গুণারত্নে বলেছিলেন, গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলা চালিয়েছিল আইএস। হামলা ও হত্যার ধরন দেখে তাই মনে হয়। বাংলাদেশ তাদের অস্বীকার করে ক্ষতি করছে। তাঁর এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় গতকাল সকালে প্রেস ব্রিফিংয়ে আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক বলেন, গুলশান হামলার পর আইএস দাবি করে হামলাকারীরা তাদের লোক। এরপর এত অপারেশনে এত লোক মারা গেল, কিন্তু আইএস দাবি করেনি যে তারা আইএসের সদস্য। এসব প্রপাগান্ডার কোনো ভিত্তি নেই। তিনি বলেন, ‘গুণারত্নে একজন অধ্যাপক। তাঁর একাডেমিক রিসার্চ অনুযায়ী তিনি মত বলেছেন। কিন্তু তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। তিনি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট জানেন না। তিনি যাদের আইএস বলেছেন, আমরা তাদের অনেককে গ্রেপ্তার করেছি। কিন্তু কেউ স্বীকার করেনি যে তারা আইএসের সঙ্গে জড়িত। ’ আইজিপি বলেন, তবে এই জঙ্গিদের সঙ্গে আইএসের ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ডে ‘নেটওয়ার্ক’ থাকতে পারে।


মন্তব্য