kalerkantho


ফ্লাইওভারে দুর্ঘটনা

গার্ডার পড়ে শ্রমিক নিহত, পা হারালেন দুজন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৪ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



গার্ডার পড়ে শ্রমিক নিহত, পা হারালেন দুজন

রবিবার রাত ২টার দিকে রাজধানীর মালিবাগ রেলগেট সংলগ্ন এলাকায় নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের গার্ডার ধসে পড়ে। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজধানীর মালিবাগে নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের গার্ডারে চাপা পড়ে স্বপন (৪২) নামের এক শ্রমিক নিহত হয়েছেন। গুরুতর আহত হয়েছেন দুজন।

তাঁদের একটি করে পা কেটে ফেলতে হয়েছে। তাঁরা হলেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশনের প্রকৌশলী পলাশ বরণ ধর (৪০) ও শাহ সিমেন্টের গাড়িচালক নূর নবী হেলাল (৪৫)। গত রবিবার দিবাগত রাত ২টা থেকে ৩টার মধ্যে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।

স্থানীয়রা জানায়, মগবাজার-মালিবাগ ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্পের কাজে মালিবাগ রেলগেটের ওপর এক মাস ধরে গার্ডারটি পিলারের ওপর উঠিয়ে তার দিয়ে পেঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। রবিবার রাতে গার্ডারটি নির্দিষ্ট জায়গায় সরানোর সময় বিকট শব্দে নিচে আছড়ে পড়ে। এর নিচে চাপা পড়েন তিনজন। তাঁদের মধ্যে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যান স্বপন। অন্য দুজনের একটি করে পা চাপা পড়ে।

পরে ফ্লাইওভারের নির্মাণকর্মী, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ এসে উদ্ধারকাজ শুরু করে। ক্রেন দিয়ে ভাঙা গার্ডারের অংশ ওপরে তুলে বের করে আনা হয় চাপা পড়া তিনজনকে।

এদিকে গার্ডার ভেঙে পড়ার এ ঘটনায় আরো ব্যাপক প্রাণহানি ঘটতে পারত বলে স্থানীয়দের সূত্রে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। কারণ দুর্ঘটনার মাত্র ১০ মিনিট আগেই ওই লেভেলক্রসিং অতিক্রম করে যায় যাত্রাবাহী একটি ট্রেন। এ ছাড়া রেলগেট হয়ে যাত্রীবাহী বাস, ট্রাকসহ অন্যান্য গাড়ি চলাচলও অব্যাহত ছিল। রেললাইনের ওপর গার্ডার ভেঙে পড়ায় ট্রেন চলাচলও বিঘ্নিত হয়।

জানা গেছে, দুর্ঘটনায় নিহত স্বপনের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার কুমারপুর গ্রামে। বাবার নাম আজিম উদ্দিন। তিনি রেলগেটসংলগ্ন সততা ফার্নিচার নামের একটি দোকানে কাজ করতেন। থাকতেন মালিবাগ ডিআইটি রোডের একটি বাসায়।

সততা ফার্নিচারের মালিক পরিচয় দিয়ে গতকাল সোমবার মো. কবির নামের একজন কালের কণ্ঠকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তাঁর দোকানে কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন স্বপন। ওই কাজের ফাঁকে ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজ চলার সময় পথচারীদের চলাচল নিয়ন্ত্রণে চার ঘণ্টার চুক্তিতে কাজ নিয়েছিলেন তিনি। গ্রামের বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে দেখা করে রবিবার সকালেই ঢাকায় ফিরেছিলেন। এরপর রাতে গার্ডারচাপা পড়ে প্রাণ হারান।

স্বপনের স্বজন আবদুল কুদ্দুস বাবু বলেন, অভাবের সংসারে স্বপনই ছিলেন একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। স্ত্রী-সন্তানের জন্য ঢাকায় কঠোর পরিশ্রম করতেন। পরিবারের অভাবের কথা চিন্তা করেই ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্পে খণ্ডকালীন কাজ নিয়েছিলেন।

স্বপনের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে রাখা হয়েছে। সেখানে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তাঁর শ্যালক মাহাফুজ পাঠান কালের কণ্ঠকে জানান, তিন ছেলে ইমন (১৪), ইমরান (১০) ও ইকরাম (৩) এবং স্ত্রী রুবি আক্তারকে গ্রামের বাড়িতে রেখে অভাবের তাড়নায় ঢাকায় এসেছিলেন স্বপন। তাঁর এই অকালমৃত্যুতে এখন তাঁর স্ত্রী-সন্তানকে পথে বসতে হবে।

দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত প্রকৌশলী পলাশ বরণ ধরের বাড়ি চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার জলদি গ্রামে। বাসা বেইলি রোডে। গার্ডারচাপায় তাঁর বাঁ পা হাঁটুর নিচ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁর পা কেটে ফেলেন চিকিৎসকরা।

আহত অন্য ব্যক্তি নূর নবী হেলালের বাবার নাম ফিরোজ আলম। বাড়ি নোয়াখালীর  কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া গ্রামে। তিন সন্তান ও স্ত্রী নিয়ে তিনি গ্রামের বাড়িতেই থাকেন। নূর নবী পেশায় শাহ সিমেন্ট কম্পানির লরিচালক। দুর্ঘটনার আগমুহূর্তে তিনি সিমেন্টবাহী লরি গিয়ে ঘটনাস্থলে আসেন। পরে লরি থেকে নেমে পাশে দাঁড়িয়ে নির্মাণকাজ দেখছিলেন। আর তখনই ওপর থেকে আছড়ে পড়ে ফ্লাইওভারের গার্ডার। এতে তাঁর একটি পা চাপা পড়ে। পরে সেই পা কেটে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন চিকিৎসকরা।

গতকাল সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, গার্ডারটি নিচে আছড়ে পড়ে ভেঙে কয়েক টুকরো হয়ে গেছে। দেবে গেছে নিচের পিচঢালা সড়ক। বড় একটি অংশ রেললাইনের ওপর পড়ায় রেললাইনেরও বেশ ক্ষতি হয়েছে।

তদন্ত কমিটি : ফ্লাইওভারের গার্ডার আছড়ে পড়ে হতাহতের ঘটনা তদন্তে একটি কমিটি করা হয়েছে। তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটির প্রধান করা হয়েছে এলজিইডির অতিরিক্ত তত্ত্বাবধায়ক আবুল কালাম আজাদকে।

ঘটনাস্থলে ডিএসসিসি মেয়র : ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে থাকায় তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে মেয়র ঘটনাস্থলে যান। তিনি এটিকে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা উল্লেখ করে হতাহতের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেন এবং নিহত স্বপনের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দেন। মেয়র বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি মাননীয় মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি এ ঘটনায় ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। ঘটনায় কেউ দোষী প্রমাণিত হলে তাকে শাস্তির আওতায় আনা হবে। ’

মেয়র বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দোষী ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানকে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। নিহত ব্যক্তির পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। আর আহতদের সুচিকিৎসার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী তাঁকে জানিয়েছেন যে ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজ চলার সময় প্রকল্প এলাকার আশপাশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল।


মন্তব্য