kalerkantho


আবু ফয়েজ কেনু

প্রথম বড় সাফল্য ছিল বসুর বাজার ক্যাম্প দখল

হাফিজুর রহমান চয়ন, হাওরাঞ্চল   

১৪ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



প্রথম বড় সাফল্য ছিল বসুর বাজার ক্যাম্প দখল

‘অক্টোবরের শেষ দিকে আমাদের নির্দেশ দেওয়া হয় কেন্দুয়ার বসুর বাজারে রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ করে সেখানকার ব্রিজটি ধ্বংস করে দিতে। জায়গাটিকে অনেকে বৌসের বাজারও বলে। নেত্রকোনা-কেন্দুয়া সংযোগ সড়কের বসুর বাজার ব্রিজ পাহারা দিতেই রাজাকারদের ওই ক্যাম্প বসানো হয়েছিল। আমার নেতৃত্বে একদল মুক্তিযোদ্ধা কয়েকটি নৌকায় করে মহেশখলা থেকে রওনা দিয়ে আমাদের গ্রামের বাড়ি হয়ে দুই দিন পর কেন্দুয়ার রামশীদ গ্রামে গিয়ে হাইড আউট করি। সময়টা কার্তিক মাস হওয়ায় নৌকায় সোজা পথে চলাচল করা কঠিন ছিল। রামশীদ গ্রামের হাইড আউটে রাত কাটিয়ে পরের দিন ছদ্মবেশে গিয়ে ব্রিজ ও ক্যাম্প এলাকা রেকি করে আসি। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আমরা অতর্কিতে আক্রমণ করে ব্রিজটি ভেঙে রাজাকার ক্যাম্প দখল করি। এক-দেড় ঘণ্টার আক্রমণে নাস্তানাবুদ হয়ে বেশির ভাগ রাজাকার পালিয়ে যায়, মারাও যায় কয়েকজন। আমরা পাঁচজন রাজাকারকে জীবিত আটক করতে সক্ষম হই। অপারেশন শেষ করে অন্য সহযোদ্ধাদের আটপাড়া থানার বড়তলী গ্রামে রেখে আমি ও সহযোদ্ধা অলয় সাংমা আটক রাজাকারদের নিয়ে মহেশখলা ক্যাম্পের উদ্দেশে রওনা করি। ’ কথাগুলো বলছিলেন নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার চানপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আবু ফয়েজ কেনু।

মরহুম মনির উদ্দিন তালুকদারের ছোট ছেলে কেনু যুদ্ধদিনের স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘আটক পাঁচ রাজাকারকে দিয়ে নৌকা বাওয়ার কাজ করিয়ে দ্বিতীয় দিন সন্ধ্যায় আমি আর অলয় সাংমা আমাদের গ্রামের বাড়িতে আসি। পথে রাজাকাররা নৌকা ডুবিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিল একবার। তখন অলয় সাংমা গুলি করার ভয় দেখিয়ে তাদের নিবৃত্ত করে। আমরা গ্রামের বাড়িতে পৌঁছার পর আটক রাজাকারদের দেখতে আশপাশের গ্রাম থেকে শত শত মানুষ এসে ভিড় জমায়। রাতে বাড়িতে থেকে পরের দিন ভোরে রওনা দিয়ে সন্ধ্যায় গিয়ে মহেশখলা ক্যাম্পে পৌঁছে আটক রাজাকারদের বিএসএফের হাতে সোপর্দ করি। ট্রেনিং শেষে দেশে ঢোকার পর বসুর বাজার ক্যাম্প দখল করাই ছিল আমাদের প্রথম বড় সাফল্য। এরপর কেন্দুয়া, আটপাড়া, মদন থানার বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু খণ্ডযুদ্ধে অংশ নেই। ডিসেম্বরের ৮ তারিখে আটপাড়া থানা স্বাধীন করে দলবল নিয়ে হেঁটে রওনা দেই কিশোরগঞ্জ মুক্ত করার লক্ষ্যে। ভারতীয় মিত্র বাহিনীর ক্যাপ্টেন চৌহান ও মুক্তিবাহিনীর সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন হামিদের (মতিউর রহমান) নেতৃত্বে ১৬ ডিসেম্বর রাতভর যুদ্ধ করে ১৭ ডিসেম্বর সকালে কিশোরগঞ্জ শহর মুক্ত করি। মুক্তিযোদ্ধাদের বেশ কয়েকটি গ্রুপ এই যুদ্ধে অংশ নেয়। ’

১৯৭১ সালে আবু ফয়েজ কেনু ছিলেন ১১ নম্বর সেক্টরের মহেশখালী সাব-সেক্টরের অধীন মুক্তিবাহিনীর ইলিয়াস গ্রুপের সেকেন্ড ইন কমান্ড। ৬৭ বছর বয়সী এই মুক্তিযোদ্ধা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘১৯৭১ সালে আমি ময়মনসিংহে নাসিরাবাদ কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে পড়তাম। এপ্রিল মাসের তৃতীয় সপ্তাহে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী শহরে প্রবেশ করার পর শহর থেকে লোকজনকে বের হতে নিষেধ করে। সেই অবস্থায় শম্ভুগঞ্জ যাওয়ার কথা বলে গৌরীপুর কলেজের শিক্ষক ভুলু মিল্কী সাহেবের কাছ থেকে একটি বাইসাইকেল সংগ্রহ করি। ব্রহ্মপুত্রে তখন খেয়া ছিল। এক কাপড়ে লুকিয়ে সাইকেল নিয়ে খেয়া পার হয়ে শম্ভুগঞ্জ হয়ে সোজা চলে যাই আঠারবাড়ী। সেখান থেকে কেন্দুয়া, তেলিগাতী, নাজিরগঞ্জ, জয়পুর, পাইলাটি, ছেচড়াখালী হয়ে রাত ১০টায় নিজ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছাই। ’

কেনু বলেন, ‘বাড়িতে আসার পর জানতে পারি, চাচাতো ভাই গোলাম রব্বানী চৌধুরীর নেতৃত্বে আমার বড় ভাই আব্দুল খালেক তালুকদার, ফুফাতো ভাই জানু মিয়া ও আবু সিদ্দিক, মান্দারবাড়ী গ্রামের মনোয়ার হোসেন, জয়নাল এবং গাগলাজুর গ্রামের বন্ধু গোলাম মৌলা তালুকদারসহ আরো অনেকে বন্দুক ও লাঠিসোঁটা নিয়ে পাশের দুই থানা এলাকায় দুটি অভিযান চালিয়ে সফল হয়। ধর্মপাশা থানার ধানকুনিয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের রেস্টহাউসে একজন পাকিস্তানি মিলিটারি ওয়্যারলেসসহ অবস্থান করতেছে—এমন খবর পেয়ে মার্চের শেষ দিকে বন্দুক ও লাঠিসোঁটা নিয়ে নৌকাযোগে গিয়ে তারা ওই রেস্টহাউস ঘিরে ওয়্যারলেসসহ মিলিটারিকে ধরে আনে। তবে ফেরার পথে রাজাপুরের প্রভাবশালী ব্যক্তি মারাজ মিয়া মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ওই মিলিটারিকে তাঁর বাড়িতে রেখে দেন। ওই ঘটনার এক দিন বা দুই দিন পর দিরাই থানার ফৈজনপুর থেকে আরেকজন মিলিটারিকে ওয়্যারলেস ও অস্ত্রসহ ধরে আনে আমাদের গ্রামের লোকজন। যদিও পথে দিরাই থানার এক দারোগাসহ স্থানীয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা কৌশলে অস্ত্র-বুলেট রেখে দেয়। তবে জামালগঞ্জ থানার আমানীপুর গ্রাম থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা একটি স্টেনগান উদ্ধার করে আনে আমাদের গ্রামের লোকজন। ওই সব ঘটনার বর্ণনা শুনে আমার মনোবল চাঙ্গা হয়ে ওঠে। ’

আবু ফয়েজ কেনু বলেন, ‘বাড়িতে পৌঁছার কয়েক দিন পর আমি ও চাচাতো ভাই মুকুল চলে যাই সীমান্তের ওপারে মহেশখলা ইয়ুথ ক্যাম্পে। তখন নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ মহকুমার কিছু অংশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে আগ্রহী তরুণদের জন্য মহেশখলাই ছিল প্রবেশদ্বার। পাকিস্তানি দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের লক্ষ্যে তরুণদের নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য তখন ওখানে একটি ইয়ুথ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল। ক্যাম্প পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন আমাদের এলাকার এমপিএ শ্রদ্ধেয় ডা. আখলাকুল হোসেন আহমেদ, ধর্মপাশার এমপিএ শ্রদ্ধেয় আব্দুল হেকিম চৌধুরী, ছাতকের এমপিএ জনাব সামসু মিয়া চৌধুরী ও নেত্রকোনার আটপাড়ার এমপিএ জনাব আব্দুল খালেক সাহেব। সবাই ছিলেন আমার পূর্বপরিচিত। ’

কেনু বর্তমানে মোহনগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক। তিনি বলেন, ‘এক মাস মহেশখলা থাকার পর আমাদের তোড়া ট্রেনিং সেন্টারে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। বাঘমারা ক্যাম্পে এক দিন বিরতি দিয়ে ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে অবশেষে তোড়া ট্রেনিং সেন্টারে গিয়ে পৌঁছাই। পরের দিন সকালে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের পর দেওয়া হয় হালকা নাশতা। পরে থ্রি নট থ্রি রাইফেল চালানো শেখাতে নিয়ে যায় প্যারেড মাঠে। এক মাসের ট্রেনিংয়ে পর্যায়ক্রমে শেখানো হয় এসএলআর, স্টেনগান, এলএমজি ও দুই ইঞ্চি মর্টার চালনা। তারপর সাত দিন জঙ্গলে প্যারেড করিয়ে যার যার ধর্মগ্রন্থের ওপর হাত রেখে শপথ করানো হয়। শপথ অনুষ্ঠান শেষে আমাদের ফেরত পাঠানো হয় বাঘমারা ক্যাম্পে। তখন আগস্ট মাস। বাঘমারা ক্যাম্পে আসার পর আমাদের প্রত্যেকের নামে অস্ত্র ইস্যু করে যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে আদেশ দেন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের ক্যাপ্টেন মুরারি। ’

কেনু আরো বলেন, ‘আমরা ৩৬০ জন মুক্তিযোদ্ধা একটি উইংয়ের অধীনে ছিলাম। উইং কমান্ডার ছিলেন আমাদেরই ইউনিয়নের ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী ভাই। পরের দিন ক্যাপ্টেন মুরারি আদেশ দেন বাংলাদেশের দুর্গাপুর থানার বিজয়পুরে পাকিস্তানি মিলিটারি ক্যাম্প আক্রমণ করতে। বলা হয়, বিজয়পুর সীমান্তের ভারতীয় অংশে পালংপাড়ায় গিয়ে হাইড আউট করে সেখান থেকে গিয়ে ভোর ৪টায় পজিশন নিতে হবে। আমাদের কাছে একটি এলএমজি ও একটি দুই ইঞ্চি মর্টার ছাড়া আর কোনো ভারী অস্ত্র না থাকায় ভারতীয় গোলন্দাজ বাহিনীর ফায়ারিং ওপেন করে সাপোর্ট দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের এক ঘণ্টা পর বিএসএফের ফায়ারিং পার্টি না যাওয়ায় পাকিস্তানি সেনাদের গোলার আঘাতে টিকতে না পেরে আমরা ক্যাম্পে ফিরে যাই। সেখানে গিয়ে ফায়ারিং পার্টি না পাঠানোর কারণ জানতে চাইলে ক্যাপ্টেন মুরারির সঙ্গে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে উইং কমান্ডারসহ আমাদের চারজনকে কোয়ার্টার গার্ডে পাঠানো হয়। তখন বাইরে সহযোদ্ধারা আমাদের ছাড়ার দাবিতে এবং ক্যাপ্টেন মুরারির বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকে। এ অবস্থায় রাতে আমাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। ’


মন্তব্য