kalerkantho


ওজনে কারচুপির শাস্তি বাড়ছে

ইউরিয়া সারের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে নাখোশ প্রধানমন্ত্রী

আশরাফুল হক রাজীব   

১৪ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ইউরিয়া সারের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে নাখোশ প্রধানমন্ত্রী

ইউরিয়া সারের দাম বাড়ানোর বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সম্প্রতি শিল্প মন্ত্রণালয় টনপ্রতি সারের দর চার হাজার টাকা বাড়িয়ে ১৮ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাবটি গতকাল সোমবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠক শেষে অনানুষ্ঠানিক অলোচনায় স্থান পেলে একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে সার নিয়ে এত আন্দোলন, এত প্রাণদান, তার দাম এভাবে বাড়তে পারে না।

বৈঠকে শিল্পসচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইয়া সারের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের ব্যাখ্যা দেন। এ সময় শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু জানান, এ বিষয়ে তিনি অবগত নন। এর পরই প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের কোনো উদ্যোগ কোনো সচিব নিতে পারেন না।

ইউরিয়া সারের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব গত জানুয়ারি মাসের হলেও এত দিন পরে এ নিয়ে শোরগোলের কারণ হচ্ছে একটি বেসরকারি টেলিভিশন। গত সপ্তাহে শিল্পসচিব একটি বেসরকারি টেলিভিশনকে জানান, তাঁরা ইউরিয়া সারের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব কৃষি মন্ত্রণালয়কে দিয়েছেন। এ খবর প্রচার হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে ডিলাররা সারের মজুদ বাড়াতে থাকেন। এখন বোরো মৌসুম চলছে। এ কারণে ইউরিয়া সারের চাহিদা অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।

মজুদের খবর কৃষি মন্ত্রণালয়ে পৌঁছানোর পরই বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। এর অংশ হিসেবেই বিষয়টি মন্ত্রিসভা বৈঠকে স্থান পায়।

মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থিত একজন সিনিয়র মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে সার নিয়ে আলোচনার বিষয়টি জানান।

কৃষি ও শিল্প মন্ত্রণালয় যৌথভাবে সারের দাম নির্ধারণ করে। উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে—এ কারণে ইউরিয়া সারের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়। এ বছরের শুরুতে শিল্প মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে সারের দাম টনপ্রতি চার হাজার টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। যদিও ওই বৈঠকে উপস্থিত কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি সারের দাম বৃদ্ধিতে সম্মতি দেননি।

সরকার দীর্ঘদিন ধরেই ইউরিয়া সারে ভর্তুকি দিয়ে আসছে। কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে এ ভর্তুকিকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়। কৃষি ও অন্যান্য সেক্টরে বছরে ২৫ লাখ টন ইউরিয়া সার ব্যবহার করা হয়। নিজস্ব উৎপাদন ও আমদানির মাধ্যমে এ সারের চাহিদা মেটানো হয়।

কেন সারের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, জানতে চাইলে শিল্প মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গ্যাস সংকটের কারণে বছরে প্রায় সাত মাস সার কারখানাগুলো বন্ধ থাকে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় সারে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এতে আগের চেয়ে লোকসান বাড়ছে সার কারখানাগুলোর। এর সঙ্গে বিসিআইসিতে নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের কারণে বেতন-ভাতাও বেড়েছে অনেক বেশি। লোকসান কমাতেই ইউরিয়া সারের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সারের মূল্য না বাড়ানো হলে বিসিআইসির লোকসানের পরিমাণ আরো বাড়বে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ২৪টি গুদাম রয়েছে। আমদানিকৃত ইউরিয়া সার এসব গুদামে রেখে বিতরণ করা হচ্ছে। এসব গুদামের রক্ষণাবেক্ষণে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় হচ্ছে। পাশাপাশি গ্যাস সংকটের কারণে সার উৎপাদন কমছে, আর উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। উৎপাদন ব্যয় থেকে কম মূল্যে বিক্রি করায় লোকসানের চাপে সার কারখানাগুলোর আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। অর্থের অভাবে কারখানাগুলো সংস্কারও করা যাচ্ছে না।

তবে কৃষিসচিব মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সারের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। ’

২০০৮-০৯ অর্থবছরে কৃষক পর্যায়ে ইউরিয়া সার ১২ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। ২০১১ সালে ইউরিয়া সারের দাম বৃদ্ধি করে ২০ টাকা করা হয়েছিল। ২০১৩ সালে ইউরিয়া সারের দাম ২০ টাকা থেকে কমিয়ে ১৬ টাকা করা হয়।

সারের দাম বৃদ্ধি ছাড়াও গতকাল মন্ত্রিসভার বৈঠকে ঢাকা বারের নির্বাচন নিয়ে কথা হয়েছে। এ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্যানেল হেরে গেছে। এ জন্য একজন মন্ত্রীকে দায়ী করা হয়েছে বৈঠকে। সামনে সুপ্রিম কোর্ট বারের নির্বাচনে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

বৈঠকের একপর্যায়ে রাজধানীর মালিবাগে ফ্লাইওভারের গার্ডার পড়ে একজন নিহত হওয়ার বিষয়টিও স্থান পায়। প্রধানমন্ত্রী আরো সতর্কতার সঙ্গে ফ্লাইওভার নির্মাণকাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন।

ওজনে কারচুপির শাস্তি বাড়ছে : অনুমোদনহীন বাটখারা উৎপাদন ও ব্যবহারের দায়ে সাজার পরিমাণ বাড়িয়ে ‘স্ট্যান্ডার্স ওজন ও পরিমাপ আইন-২০১৭-এর খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। একই আইনে পণ্যের ওজনে অনিয়ম করার সাজা বাড়ানোর প্রস্তাবও রয়েছে। ১৯৮২ সালের এ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশটি ইংরেজিতে করা হয়। আদালতের নির্দেশে বাংলায় রূপান্তরের সময় শাস্তি বাড়ানোসহ কিছু বিষয়ে পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

মন্ত্রিসভা বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদসচিব শফিউল আলম সাংবাদিকদের জানান, ‘খসড়া আইনে আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে শুধু সাজার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। মানহীন বাটখারা ব্যবহারে শাস্তি ছয় মাসের কারাদণ্ডের বিধান অপরিবতিত থাকলেও অর্থদণ্ড তিন হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া আরো কিছু অপরাধের অর্থদণ্ড বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মান সংস্থাসহ (আইএসও) অন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নিয়মকানুন এ আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এ ছাড়া করপোরেশনের মূলধন নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারের হাতে রেখে ‘বাংলাদেশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ আইন-২০১৭-এর খসড়াও নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভ। এ-সংক্রান্ত আইনটি ১৯৭২ সালের। এর পরও আরো কিছু সংশোধনী আনা হয় অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে। এসব অধ্যাদেশ সামরিক শাসনামলে হওয়ায় আইনটি পরিমার্জনসহ বাংলায় করা হচ্ছে। আগের আইনের তফসিলে জাতীয়করণ করা আড়াই শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তালিকা ছিল। বর্তমান খসড়ায় সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে রাখা হয়েছে। যেগুলো বিরাষ্ট্রীয়করণ বা বিক্রি করা হয়েছে সেগুলোর খসড়া আইনের তফসিলে রাখা হয়নি। নতুন আইনের তফসিলে জাতীয়করণ করা ১০৯টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নাম তালিকায় রয়েছে।

গতকালের মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন আইন-২০১৭’-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

বৈঠকে সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও ব্রাজিলে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মিজারুল কায়েস এবং আইনমন্ত্রীর ছোট ভাই রফিকুল ইসলামের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করেছে মন্ত্রিসভা।


মন্তব্য