kalerkantho


উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় নাম তোলার প্রক্রিয়া শুরু

আরিফুর রহমান   

১৪ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় নাম তোলার প্রক্রিয়া শুরু

জাতিসংঘের শর্ত পূরণ করে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে পা রাখতে চলছে বাংলাদেশ। তিনটি শর্তের মধ্যে ইতিমধ্যে দুটি অর্জিত হয়েছে, বাকিটাও অর্জনের খুব কাছাকাছি।

এ অবস্থায় সরকার জাতিসংঘের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। চলতি মাসেই সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি দল জাতিসংঘের সদর দপ্তরে গিয়ে সংস্থাটির অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত করার প্রস্তাব দেবে। বাংলাদেশ দুটি সূচক অর্জন করেছে—এ-সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত সিডিপির নীতিনির্ধারকদের সামনে তুলে ধরা হবে।

পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদলটি ১৯ মার্চ নিউ ইয়র্কের উদ্দেশে রওনা দেবে। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য ড. শামসুল আলম। অন্যান্যের মধ্যে রয়েছেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) ভারপ্রাপ্ত সচিব কাজী শফিকুল আযম, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মহাপরিচালক আমীর হোসেন, বিবিএসের উপপরিচালক তোফায়েল আহমেদ এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেন। সিডিপির সঙ্গে বৈঠক হবে ২১ মার্চ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) দেওয়া সর্বশেষ তথ্য মতে, এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণে জাতিসংঘের দেওয়া তিনটি সূচকের মধ্যে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে দুটি সূচক অর্জন করেছে। মানবসম্পদ সূচক (এইচএআই) ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—এ দুই শর্ত পূরণ হয়েছে।

আর মাথাপিছু জাতীয় আয়ের (জিএনআই) সূচকে জাতিসংঘের দেওয়া শর্তের চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। তবে ২০১৮ সালের মধ্যে সে সূচক অর্জনের সুযোগ রয়েছে। বিবিএস থেকে সবুজ সংকেত পাওয়ার পরপরই স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। বাংলাদেশের পাশাপাশি এবার নেপাল ও ভুটান স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হওয়ার আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেছে।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. শামসুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিয়মানুযায়ী তিনটির মধ্যে দুটি সূচক পূরণ হলে একটি দেশকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের করে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত করা হয়। আমরা সে যোগ্যতা অর্জন করেছি। নিউ ইয়র্কে গিয়ে বিষয়টি সিডিপিকে জানাব। তাদের সামনে আমরা একটি প্রতিবেদন তুলে ধরব, যেখানে বাংলাদেশের সর্বশেষ অবস্থানের চিত্র থাকবে। এরপর তারা বাংলাদেশকে নিয়ে পর্যালোচনা করবে। ’

প্রতিনিধিদলের একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থান নিয়ে ইতিমধ্যে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। সেটি উপস্থাপনের জন্য আধাঘণ্টা সময় পাবে বাংলাদেশ।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলেছে, স্বল্পোন্নত দেশের ধারণাটি আসে জাতিসংঘ থেকে ১৯৬০ সালে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর তালিকা তৈরি করা হয় ১৯৭১ সালে। কোনো দেশ এলডিসির তালিকা থেকে বের হতে চাইলে তিনটি সূচক পূরণের শর্ত নির্ধারণ করে দেওয়া হয় ওই সময়। সেগুলো হলো মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা। উন্নয়নশীল দেশে যেতে হলে একটি স্বল্পোন্নত দেশে পর পর তিন বছর গড় মাথাপিছু জাতীয় আয় (জিএনআই) এক হাজার ২৪২ ডলার হতে হবে। মানবসম্পদ সূচকে ৬৬ বা তার চেয়ে বেশি অর্জন করতে হবে। আর অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে একটি দেশকে ৩২ বা তার চেয়ে নিচে থাকতে হবে। সিডিপি প্রতি তিন বছর পর এসব সূচক পর্যালোচনা করে। যেসব দেশ শর্ত পূরণ করতে পারে তাদের এলডিসির তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। বিবিএসের তথ্য বলছে, মানবসম্পদ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ৭০, দরকার ছিল ৬৬। মূলত একটি দেশের জনগোষ্ঠীর পুষ্টি, মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বয়স্ক শিক্ষা ক্ষেত্রে উন্নয়নকে মূল্যায়ন করে জাতিসংঘ। বাংলাদেশের মানুষের পুষ্টি, মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বয়স্ক শিক্ষা ক্ষেত্রে জাতিসংঘের দেওয়া শর্ত পূরণ করে আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে গেছে।

অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে একটি দেশকে ৩২ বা তার চেয়ে নিচে থাকার কথা বলা হলেও বাংলাদেশের অবস্থান ২৫.০৩। বিবিএসের তথ্য বলছে, এ ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ শর্ত পূরণে সক্ষম হয়েছে। অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা নির্ভর করে কৃষি উৎপাদন, পণ্য ও সেবা রপ্তানি, প্রচলিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ছাড়াও জিডিপিতে সম্পূর্ণ পণ্য উৎপাদন ও আধুনিক সেবার অংশীদারত্ব এবং ছোট অর্থনীতির প্রতিবন্ধকতা দূর করার ওপর।

জাতিসংঘের শর্তানুযায়ী, একটি দেশে পর পর তিন বছর গড় মাথাপিছু আয় থাকতে হবে এক হাজার ২৪২ ডলার। কিন্তু বিবিএসের তথ্য বলছে, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের গড় মাথাপিছু আয় এক হাজার ১৫৬ ডলার।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি বাস্তবায়নবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাথাপিছু জাতীয় আয় আমরা হিসাব করি অর্থবছর দিয়ে, আর তারা করে ক্যালেন্ডার বছর। সে জন্য পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। অবশ্য দুই পক্ষ একমত হয়েছে যে দুটোর মাঝামাঝি হিসাব হবে। যদি তা হয় তাহলে ২০১৮ সালের মধ্যে আমরা মাথাপিছু জাতীয় আয় সূচক অর্জন করতে সক্ষম হব। ’ 

সরকারের একাধিক নীতিনির্ধারক কালের কণ্ঠকে জানান, কোন কোন দেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ করা হবে, সিডিপির সে বৈঠক হবে ২০১৮ সালে। ওই বৈঠকেই শর্ত পূরণ করা স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে উন্নীত করার বিষয়টি বিবেচনা করবে সিডিপি। আগামী নির্বাচনের আগে তিনটির মধ্যে সব কটি শর্ত পূরণ করে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার পথে থাকা দেশের তালিকায় থাকতে চায় বাংলাদেশ। সিডিপির পরের বৈঠক হবে ২০২১ সালে। তত দিন পর্যন্ত এ তিনটি শর্ত পূরণ থেকে দেশটি পিছিয়ে পড়ছে কি না তা পর্যবেক্ষণে রাখবে। ২০২১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ তার অবস্থান ধরে রাখতে পারলে ২০২৪ সালে জাতিসংঘের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পাবে বাংলাদেশ। অর্থাৎ বাংলাদেশকে ছয় বছর পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। এ ক্ষেত্রে এলডিসি হিসেবে শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধাসহ বিভিন্ন সুবিধা ২০২৭ সাল পর্যন্ত ভোগ করতে পারবে বাংলাদেশ। তবে এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ অনেক সুযোগ হারাবে বাংলাদেশ, এমন কথা বলেছেন পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরাও চাই বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হোক। তবে এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে আমাদের অনেক প্রতিবন্ধকতার সামনে পড়তে হবে। আমাদের কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নতির পাশাপাশি আরো অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। ’

এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. শামসুল আলম বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশে যেতে পারলে আমাদের সম্মান বাড়বে, আত্মমর্যাদা বাড়বে। বিশ্বব্যাপী আমাদের ওপর আস্থা বাড়বে। আমাদের জন্য এখন সেটি জরুরি। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও আসবে।   এখন যেমন কম সুদে ঋণ পাই, উন্নয়নশীল দেশ হলে তখন আর কম সুদে ঋণ পাওয়া যাবে না। শুল্কমুক্ত সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। তবে এসব বিষয়ে আমরা প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছি। আমাদের হাতে এখনো এক দশক সময় আছে। ’ সে ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।


মন্তব্য