kalerkantho


মূল্যস্ফীতি ৫%-এর নিচে হলে বেতন বাড়বে না

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



মূল্যস্ফীতি ৫%-এর নিচে হলে বেতন বাড়বে না

বেতন কাঠামো অনুযায়ী চলতি অর্থবছর শেষে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) সুবিধা পাবেন। তবে আগামী অর্থবছর থেকে মূল্যস্ফীতির হার ৫ শতাংশের কম হলে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন বাড়বে না। এ খবর শুনে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) মূল্যস্ফীতির যে হার প্রকাশ করে, তার সঠিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।

গতকাল চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি-সংক্রান্ত এক সভা শেষে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এ তথ্য জানিয়ে বলেছেন, আগামী অর্থবছর থেকে কী হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ জন্য একটি আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হচ্ছে। কমিটি তিন মাসের মধ্যে সুপারিশ জমা দেবে।

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালকে সঙ্গে নিয়ে সচিবালয়ে বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বিদ্যমান পদ্ধতি অনুযায়ী গত অর্থবছরের ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি ৪ শতাংশ হলে বেতন বাড়বে না। এটি আমরা আলোচনা করেছি। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

এ জন্য তিন মাস সময় দিয়ে একটি কমিটি করা হচ্ছে। ’

ড. ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ২০১৫ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করে সরকার। তাতে প্রতি বছর ১ জুলাই সব সরকারি চাকরিজীবীদের ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার কথা বলা আছে। সে মোতাবেক গত অর্থবছর শেষে ২০১৬ সালের ১ জুলাই সব চাকরিজীবী ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট পেয়েছেন। চলতি অর্থবছর শেষে আগামী ১ জুলাইতেও তাঁদের বিদ্যমান বিধান অনুযায়ী ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হবে। তবে আগামী অর্থবছর শেষে অর্থাৎ ২০১৮ সালের ১ জুলাই

মূল্যস্ফীতির হার ৫ শতাংশের কম থাকলে চাকরিজীবীদের কোনো ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হবে না বলে গতকালের বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। আগামী বছর মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের কম হলে, সে ক্ষেত্রে সরকার কী করবে—তা নির্ধারণের জন্য কমিটি গঠন করা হচ্ছে। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী সরকার তা চূড়ান্ত করবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে চাকরিজীবীদের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি জড়িত। প্রতি বছরই জিনিসপত্রের দাম বাড়ে, বাড়ে জীবনযাত্রার ব্যয়। তাই প্রতি বছর ইনক্রিমেন্ট এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়, যাতে চাকরিজীবীদের জীবনমান আগের বছরের চেয়ে খারাপ না হয়। ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার অর্থ চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার মান আগের বছরের চেয়ে উন্নত করা নয়। তাই মূল্যস্ফীতির হার ৫ শতাংশের কম হলে ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার যৌক্তিকতা থাকে না।

ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, বৈঠকে আলোচনা হয়েছে, কোনো একটি নির্দিষ্ট অর্থবছর মূল্যস্ফীতির হার ৫ শতাংশের কম হলে সেই অর্থবছর কোনো ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হবে না। তবে পরের অর্থবছরও যদি মূল্যস্ফীতির হার ৫ শতাংশের কম হয়, সে ক্ষেত্রে দুই অর্থবছরের মূল্যস্ফীতির হার বিবেচনায় নিয়ে ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হবে। সে ক্ষেত্রে ইনক্রিমেন্টের হার নির্ধারণের পদ্ধতি কী হবে, সে সুপারিশের জন্য কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ভবিষ্যতে ইনক্রিমেন্টের ধরন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতেই বসেছিলেন তাঁরা। এখন একটি পদ্ধতিতে চলছে, ভবিষ্যতে কিভাবে হবে, তা নির্ধারণে আলোচনা হয়েছে। ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য একটি পদ্ধতি রেখে যাওয়ার তাগিদ থেকেই এটি করা হচ্ছে। না হলে নতুন সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তরা বলবেন, আমরা মেয়াদ শেষ করে গেলাম, তাদের জন্য কোনো করণীয় রেখে গেলাম না।

বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৫ শতাংশ। ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতির হার আরো কমলে কী হবে—এমন প্রশ্নে মুহিত বলেন, এক বছর হবে না। এক বছর হবে। মূল্যস্ফীতি না বাড়লে বেতনও বাড়বে না। বর্তমান পদ্ধতিতে ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হচ্ছে। মূল্যস্ফীতির হার ৪ শতাংশ হলে বেতনও বাড়বে না। এটিই আলোচনা হয়েছে, চূড়ান্ত হয়নি। তিন মাস সময় দিয়ে একটি কমিটি করা হচ্ছে। কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা কমিটিতে থাকছেন। ফলে স্থায়ী পে- কমিশনের দরকার নেই।

এদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ধারণা ছিল, আগামী জুলাই মাসে ৮ শতাংশ হারে বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হতে পারে। গতকাল বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রীর মতামত শুনে তাঁরা হতাশ হয়েছেন। খোদ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠ’র কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার কয়েক দফায় গ্যাস-বিদ্যুতের বিল বাড়িয়েছে। চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দামও বেশি। পরিবহন ও সন্তানদের শিক্ষাব্যয়ও অনেক বেড়েছে। এ অবস্থায় বিবিএস মূল্যস্ফীতির যে হার ঘোষণা করেছে, তা ‘বিশ্বাসযোগ্য নয়’ উল্লেখ করে ওই কর্মকর্তা বলেন, এবার যা-ই করুক। ২০১৯ সালের নির্বাচন সামনে রেখে আগামী অর্থবছর ঠিকই বেশি হারে ইনক্রিমেন্ট দিতে হবে সরকারকে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে কর্মরত পঞ্চম গ্রেডের একজন কর্মকর্তা হিসাব দেখিয়ে বলেন, তিনি সব মিলিয়ে প্রায় ৭০ হাজার টাকা বেতন পান। বাসা ভাড়া, দুই সন্তানের শিক্ষা খরচসহ অন্যান্য খরচ যোগ করলে তাঁর সঞ্চয় বলে কিছু থাকে না। বছর শেষে ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট পাওয়ার খবরে মুখ কালো করে ওই কর্মকর্তা বলেন, বাজারে গেলে দেখা যায়, মূল্যস্ফীতির হার আসলে কত। বিবিএস মূল্যস্ফীতির যে হার ঘোষণা করে, তার প্রতি মোটেও বিশ্বাস নেই ওই কর্মকর্তার।

 


মন্তব্য