kalerkantho


ইয়াকুব আলী

আড়াইটা রাইফেল দিয়ে যুদ্ধের শুরু

সাব্বিরুল ইসলাম সাবু, মানিকগঞ্জ   

১৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



আড়াইটা রাইফেল দিয়ে যুদ্ধের শুরু

‘শুরুতে আমাদের লুডু বাহিনীর হাতে ছিল ম্যাগাজিনসহ দুটি আর ম্যাগাজিন ছাড়া একটি ৩০৩ রাইফেল। তাই আমরা বলতাম আড়াইটা রাইফেল। আড়াই রাইফেল দিয়েই যুদ্ধ শুরু করি। ৯ মাসের যুদ্ধে আমি আধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রও ব্যবহার করেছি। দেশের ভেতরে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। ৯ মাসে বেশ কয়েকটি অপারেশনে অংশ নিয়েছি, প্রতিটিতেই সফল হয়েছি। ’

মুক্তিযোদ্ধা ইয়াকুব আলী যুদ্ধদিনের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে এভাবেই শুরু করেন। মানিকগঞ্জের গড়পাড়া গ্রামের আহাজউদ্দিন আহমেদের ছেলে তিনি। ১৯৭১ সালে ঢাকার সলিমুল্লাহ কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন (নৈশ বিভাগ)। বাবা অসুস্থ থাকায় তাঁকে সংসারের হাল ধরতে হয়েছিল। রাতে ক্লাস করতেন, আর দিনে বাদামতলীতে একটি ছোট দোকান চালাতেন।

ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

ইয়াকুব আলী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের বক্তৃতা শুনতে বন্ধুদের সঙ্গে গিয়েছিলাম রেসকোর্স ময়দানে। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো—বঙ্গবন্ধুর এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনেকের মতো আমিও ঢাকার আরমানিটোলা মাঠে লাঠি হাতে প্যারেড করতাম। ২৫ মার্চ ঢাকায় পাকিস্তানি হানাদারদের ক্র্যাকডাউনের রাতে আরো অনেকের সঙ্গে বাবুবাজার, বাদামতলী, ইসলামপুরে ঠেলাগাড়ি, গাছপালা ফেলে ব্যারিকেড সৃষ্টি করেছি। কিন্তু

এসব ব্যারিকেডে কোনো কাজ হয়নি। পরের দিন রাস্তায় দেখেছি অগুনিত মানুষের লাশ। ভয় পেয়েছি যেমন, তেমনি বুকের ভেতর আগুনও জ্বলেছে। বুঝতে পারলাম, এই পশুদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। পরের দিন বুড়িগঙ্গা নদী পার হয়ে চলে গেলাম জিঞ্জিরায়। সেখান থেকে হেঁটে মানিকগঞ্জে। ’

‘মানিকগঞ্জে তখন অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন আবদুল হালিম চৌধুরীর নেতৃত্বে বিপ্লবী পরিষদ গঠন করা হয়েছে। বিপ্লবী পরিষদের নেতৃত্বে মানিকগঞ্জ মহকুমা ট্রেজারির তালা ভেঙে লুট করা হয় বেশ কিছু ৩০৩ রাইফেল। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তোবারক হোসেন লুডুর নেতৃত্বে ২৬টি রাইফেল নিয়ে গড়পাড়া গ্রামে আমাদের গ্রুপের প্রশিক্ষণ শুরু হয়। কিন্তু দুই দিন পরই নেতৃবৃন্দ রাইফেল ফেরত নিয়ে যান। আমরা গোপনে ম্যাগাজিনসহ দুটি ও ম্যাগাজিন ছাড়া একটি রাইফেল রেখে দিই। আমরা এই আড়াই রাইফেল দিয়েই প্রশিক্ষণ চালিয়ে গেছি। ’

‘এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি মানিকগঞ্জ শহরে ঢুকে পড়ে পাকিস্তানি মিলিটারি। মুক্তিযোদ্ধারা শহর ছেড়ে দুর্গম অঞ্চল হরিরামপুরে ঘাঁটি গাড়ে। ক্যাপ্টেন হালিম চৌধুরীর সঙ্গে আলোচনা করে সিংগাইর থানার দায়িত্ব দেওয়া হয় লুডু বাহিনীকে। ৯ মাস সেখান থেকেই লুডু বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে বিভিন্ন অপারেশন চালিয়েছি। সেসবের মধ্যে গোলাইডাঙ্গার যুদ্ধ, ঢাকা-আরিচা সড়কের নয়াডিঙ্গি সেতু উড়িয়ে দেওয়া, মানিকগঞ্জ শহরে পুলিশ ক্যাম্পে আক্রমণ, বেতিলার যুদ্ধ, চারিগ্রামের যুদ্ধ ও মানরার যুদ্ধ উল্লেখযোগ্য। সবচেয়ে বেশি সফলতা পাই গোলাইডাঙ্গার যুদ্ধে। এই যুদ্ধ হয় ২৯ অক্টোবর। তার আগের দিন বিকেলে আমরা ক্যাম্প করি গোলাইডাঙ্গা স্কুলে। রাতে আমার মনে সন্দেহ হওয়ায় কমান্ডার লুডুকে ক্যাম্প থেকে সরে যেতে বলি। ভোর রাতে ক্যাম্প গুটিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন কমান্ডার। কয়েক মাইল দূরে একটি গ্রামে পৌঁছে সকালের খাবার খাওয়ার সময় আমাদের ইনফরমার এসে খবর দেয়, সিংগাইর থানা সদর থেকে ১০-১২টি নৌকায় করে শতাধিক পাকিস্তানি সৈন্য গোলাইডাঙ্গার দিকে আসছে। ’

‘গোলাইডাঙ্গা স্কুলে আমাদের ক্যাম্প করার খবর পেয়ে গিয়েছিল পাকি মিলিটারি। যাই হোক, আমি ও লোকমান হোসেন এবং আরো কয়েকজন কমান্ডার লুডুকে বললাম, পাল্টা আক্রমণ করতে হবে। কিন্তু ওদের সংখ্যা ও ভারী অস্ত্রের কথা শুনে কেউ কেউ রাজি হচ্ছিল না। আমি আর লোকমান অস্ত্র নিয়ে জয় বাংলা বলে দাঁড়িয়ে যেতেই সবাই উঠে দাঁড়ায়। ঘুরপথে দৌড়ে আমরা হাজির হই নদীর তিন মাথার সংযোগস্থলে। একটি শাখা গেছে গোলাইডাঙ্গা স্কুলের দিকে, একটি মানিকগঞ্জের দিকে, অন্যটি সিংগাইরের দিকে। সিংগাইরের দিক থেকে আসছিল পাকিস্তানি মিলিটারিরা। নদীর ওই সংযোগস্থলকে বলা হতো গোলাইডাঙ্গার কুম। তখন সেখানে প্রচণ্ড স্রোত আর ঘূর্ণি। আখক্ষেত, গাছপালার আড়ালে দাঁড়িয়ে আমরা দেখতে পেলাম, পাকি মিলিটারির ১১টি নৌকা গোলাইডাঙ্গা স্কুলের দিকে চলে গেল। আমরা ভাগ হয়ে নদীর তিন পাড়ে অবস্থান নিই। বুঝতে পারছিলাম, স্কুলে আমাদের না পেয়ে আবার এ পথেই তারা ফিরে আসবে। পরে জানতে পেরেছি, স্কুলে পৌঁছে মুক্তিবাহিনীর কাউকে না পেয়ে পাকিস্তানি মিলিটারি হাসাহাসি করেছে স্থানীয়দের সঙ্গে; বলেছে, ভাগ গিয়া মুক্তিবাহিনী। ’

‘ফিরতি পথে ওরা যখন কুমের কাছে তখনো তারা গান গাইছিল বেশ ফুরফুরে মেজাজে। তারা ভাবতেও পারেনি, আমরা ওখানে ফাঁদ পেতে বসে আছি। ওদের অসর্তকতা, কুমের প্রবল স্রোত ও ঘূর্ণি আমাদের অনেকটাই সহায়তা করেছে। কুমের মাঝ বরাবর আসা মাত্র আমরা তিন দিক থেকে ফায়ার শুরু করি। প্রথম ধাক্কাতেই ১১টি নৌকার ১০টি ডুবে যায়। এই ১০ নৌকার আর্মিরা ফায়ার করার সুযোগই পায়নি। গুলি খেয়ে আর সাঁতার না জানায় ডুবে মরেছে সবাই। একটি নৌকা বেশ কিছুটা পেছনে ছিল। সেই নৌকা থেকে পাল্টা গুলি ছুড়তে থাকে পাকি মিলিটারি। তবে শেষ পর্যন্ত একই পরিণতি হয় ওদেরও। পরে জেনেছি, ৮১ জন পাকিস্তানি মিলিটারি ওই যুদ্ধে মারা গিয়েছিল। আমরা বেশ কিছু অস্ত্র ও গোলা নদী থেকে উদ্ধার করি। এতে আমাদের অস্ত্রের ভাণ্ডার অনেকটাই বেড়ে যায়। ’

ইয়াকুব আলী বলেন, ‘মানিকগঞ্জ শহরের পুলিশ ক্যাম্পে আক্রমণ ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তখন শহরে মুসলিম লীগ আর দালালরা মিছিল-মিটিং করে প্রচারণা করত—মুক্তিযোদ্ধা বলে কিছু নেই। আমাদের উপস্থিতি জানাতেই শহরের পুলিশ ক্যাম্পে আক্রমণ করি, আগস্ট মাসের প্রথম দিকে। ক্যাম্পের পাশের খালে অবস্থান নিই আমি ও লোকমানসহ ১০-১২ জন। ভোর রাতে গ্রেনেড ছুড়ি, রাইফেল দিয়ে গুলি করি। তারপর নিরাপদে ফিরে যাই। শহরবাসী বুঝতে পারে, আশপাশেই মুক্তিযোদ্ধারা আছে। তাদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসে। ’

‘ঢাকা-আরিচা সড়কে নয়াডিঙ্গি সেতু ধ্বংস করার কাজটিও ছিল অত্যন্ত কঠিন। তখন ঢাকা-আরিচা সড়কের প্রতিটি সেতুতে পাকিস্তানি মিলিটারির সঙ্গে রাজাকাররাও পাহারা দিত। তাদের চোখ এড়িয়ে সেতুতে বিস্ফোরক স্থাপন করা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বেশ কয়েকটি সেতু রেকি করে অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ নয়াডিঙ্গি সেতু ধ্বংসের সিদ্ধান্ত নিই আমরা। সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি একদিন রাতে আমরা প্রায় দেড় কেজি বিস্ফোরক স্থাপন করি ওই সেতুতে। অভিজ্ঞতা না থাকায় সঠিকভাবে কাজটি করতে পারিনি। তবে পুরোপুরি বিধ্বস্ত না হলেও বেশ বড় ধরনের ক্ষতি হয়। কয়েক দিন যানবাহন চলাচল বন্ধ রেখে মেরামত করা হয় সেতুটি। ’

বেতিলার যুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘তখন রাজাকাররা বেতিলা, মিতরা, পালোরাসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে ঢুকে মানুষজনের ওপর বিভিন্নভাবে নির্যাতন করছিল। তখন আমাদের ক্যাম্প ছিল চারিগ্রামে। লোক মারফত এ খবর জানতে পেরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, রাজাকারদের শায়েস্তা করতে হবে। এক দিন খবর পেলাম, ধলেশ্বরী নদী দিয়ে নৌকায় করে বেশ কয়েকজন রাজাকার মানিকগঞ্জ শহর থেকে বেতিলার দিকে আসছে। অ্যামবুশ করলাম বেতিলার কাছে নদীর পাড়ে। রাজাকাররা নৌকা থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে গুলি চালালাম আমরা। কয়েকজন গুলি খেয়ে পড়ে গেল। বাকিরা সারেন্ডার করল। এরপর ওই সব গ্রামে রাজাকারদের অত্যাচার বন্ধ হয়ে যায়। ’

মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে মৃত্যুর হাত থেকে কোনো মতে বেঁচে যাওয়ার কাহিনি শোনালেন তিনি। বললেন, ‘তখন লুডু বাহিনীর ক্যাম্প বালিরটেকের কাছে এক হিন্দুবাড়িতে। পাশের গ্রামের এক দালাল খুব অত্যাচার করছিল হিন্দুদের। সিদ্ধান্ত হলো, ওই দালালকে ধরে আনতে হবে। একদিন রাতে আমরা চার-পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধা ওই দালালকে ধরে আনতে রওনা দিই। আমাদের জানা ছিল না যে দালালের বাড়িতে রাজাকাররা পাহারা বসিয়েছে। বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছতেই গুলি শুরু করে রাজাকাররা। অপ্রস্তুত আমরা অন্ধকারে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। আমি নেমে পড়ি একটি বিলে। অন্যরা আমাকে না পেয়ে ক্যাম্পে ফিরে যায়। আমি বিলের পানি থেকে উঠতে পারছিলাম না রাজাকারদের পাহারার কারণে। প্রচণ্ড ঠাণ্ডার মধ্যে কোনো রকমে মুখ উঁচিয়ে পানিতে লুকিয়ে রইলাম। একসময় মনে হলো, ঠাণ্ডায় মরে যাব। কিন্তু উঠতে পারছিলাম না গুলি খাওয়ার ভয়ে। শেষ রাতের দিকে রাজাকাররা ফিরে গেলে সাঁতরে বিলের অন্য পাশের এক হিন্দুবাড়িতে আশ্রয় নিই। তারা আমাকে আগুনে তাতিয়ে গরম দুধ খেতে দেয়। বেঁচে যাই আমি। ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে একটি ভুলই করেছিলাম, আর মৃত্যুর মুখে পড়েছিলাম। আল্লাহকে ধন্যবাদ। তাঁর রহমতে বেঁচে ফিরেছি। ’

ইয়াকুব আলী জানান, উচ্চ রক্তচাপসহ নানা শারীরিক সমস্যায় কিছুদিন ধরে খুব ভুগছেন তিনি। দিনদুয়েক আগে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের একজন সৈনিক হিসেবে নিজেকে ধন্য মনে করি। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমাকে যে সম্মান দেওয়া হয় তার জন্য সবার কাছে কৃতজ্ঞ। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আমাকে প্রতিবছর মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার নির্বাচন করা হয়। মুক্তিযোদ্ধারা আমাকে ভালোবাসে বলেই তারা আমাকে দায়িত্ব দেয়। বঙ্গবন্ধু আমার আদর্শ। যত দিন বেঁচে থাকব, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিয়েই বেঁচে থাকতে চাই। ’


মন্তব্য