kalerkantho


রোহান গুনারত্নের অভিমত

গুলশান হামলা আইএসের অভিযানে দেরি ভুল ছিল

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



গুলশান হামলা আইএসের অভিযানে দেরি ভুল ছিল

গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে আইএস জঙ্গিরাই হামলা করেছিল। জঙ্গিদের হামলা প্রতিরোধে কমান্ডোদের জন্য ১২ ঘণ্টা অপেক্ষা করাও ছিল ভুল সিদ্ধান্ত। কারণ জঙ্গিরা তাদের টার্গেটদের প্রথমেই হত্যা করে ফেলে। পরের সময়টুকু তারা আইএসের সঙ্গে যোগাযোগ ও প্রোপাগাণ্ডা চালানোর কাজ করে। সাধারণ অপরাধীরা পুলিশ দেখে বাঁচতে পালায়। কিন্তু জঙ্গিরা মরতে চায়। তারা হলি আর্টিজান দখল করে কোনো ধরনের দরকষাকষিতে যায়নি। কাজেই বিশেষ কোনো বাহিনীর জন্য পুলিশের অপেক্ষা করার দরকার ছিল না। সিঙ্গাপুরের নানিয়ং টেকনোলজিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর পলিটিক্যাল ভায়োলেন্স অ্যান্ড টেররিজম রিসার্চের (আইসিপিভিটিআর) অধ্যাপক ড. রোহান গুনারত্নে এসব কথা বলেন।

গতকাল রবিবার চিফস অব পুলিশ কনফারেন্স অব সাউথ এশিয়া অ্যান্ড নেইবারিং কান্ট্রিস অন রিজিওনাল কো-অপারেশন ইন কার্ভিং ভায়োলেন্ট এক্সট্রিমিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম সম্মেলনের প্রথম দিন প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে গুনারত্নে ওই কথা বলেন। গতকাল পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) প্রধান মনিরুল ইসলামও একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন, যার শিরোনাম ছিল ‘Resurgence of Terrorism in Bangladesh’।

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বিস্তারকে দুই ভাগে ভাগ করে বর্তমান সময়কে ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের কর্মকাণ্ড বলে অভিহিত করেন তিনি।

গুনারত্নে বলেন, ইতালির নাগরিক সিজারে তাভেল্লাকেও আইএস জঙ্গিরাই হত্যা করে। হামলাকারীরা হোম গ্রোন, জেএমবি নয়। হামলা চালিয়েছিল আইএস। বর্তমানে পুলিশ যাদের নব্য জেএমবি বলছে, তারা মূলত আইএসের সদস্য। হলি আর্টিজানে গত বছরের ১ জুলাই হামলার সময় হামলাকারীরা যেসব মাধ্যমে যোগাযোগ করে সেগুলোর প্রতি আইসিপিভিটিআর নজর রেখেছিল।

‘Deradicalization of Militants : An Approach for Disengagement and Reintegration into Society’  শীর্ষক উপস্থাপনায় মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের অপতৎপরতা বাংলাদেশ পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে মন্তব্য করেন গুনারত্নে। বলেন, ‘পুলিশ, র‌্যাব, এনএসআই, ডিজিএফআইসহ বিভিন্ন সংস্থা জঙ্গি দমনে কাজ করছে। তারা আলাদা ডাটাবেইস করেছে। এটি ভালো উদ্যোগ। তবে এই কাজ সমন্বিতভাবে না হলে জঙ্গি দমন সম্ভব নয়। সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ’

অধ্যাপক ড. রোহান গুনারত্নে আরো বলেন, পৃথিবীতে তিন ধরনের হুমকি রয়েছে। প্রথমত, বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হুমকি, দ্বিতীয়ত, সন্ত্রাসবাদীদের হুমকি; তৃতীয়ত, ভাবাদর্শগত উগ্রপন্থীরা সন্ত্রাসবাদী গ্রুপের আদলে কাজ করছে। এতে এশিয়া-প্যাসিফিক এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জঙ্গিবাদের সঙ্গে সবাই ইসলামের নাম জড়ায়। অথচ বিশ্বে হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, তামিল, খ্রিস্টান নানা ধর্মাবলম্বী জঙ্গি ও সন্ত্রাসী রয়েছে। শ্রীলঙ্কার দিকে তাকান, সেখানকার জঙ্গিদের অধিকাংশ হিন্দু।

বাংলাদেশের কওমি মাদরাসাগুলো জঙ্গিবাদের বড় ক্ষেত্র উল্লেখ করে সিঙ্গাপুরের এই অধ্যাপক ও শ্রীলঙ্কার নাগরিক বলেন, ‘এখানে বড় বড় মাদরাসা থেকেই জঙ্গিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। ইসলাম কখনোই সন্ত্রাসবাদকে পছন্দ করে না, প্রশ্রয়ও দেয় না। জঙ্গিরা ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করছে। আমার দেশ শ্রীলঙ্কায়ও উগ্রপন্থী আছে যারা ভিন্ন ধর্মের। মধ্যপ্রাচ্যের সিরিয়া, ইরাকে আমরা ইসলামের নামে ভিন্ন কর্মকাণ্ড দেখি। ’ গুনারত্নের এ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে উপস্থিত পুলিশের এক কর্মকর্তা তাত্ক্ষণিকভাবে বলেন, ‘একতরফাভাবে কওমিপন্থীদের জঙ্গি বলা ঠিক হবে না। তাদের সঙ্গেও মিশতে হবে, কথা বলতে হবে। তাদেরও কথা বলতে দিতে হবে। ’ 

পরে সাংবাদিকরা জানতে চান বাংলাদেশ যদি এসব জঙ্গিদের আইএস বলে স্বীকার না করে তাতে সমস্যা কোথায়? জবাবে গুনারত্নে বলেন, ‘বাংলাদেশ পুলিশও জানে তারা যাদের সঙ্গে লড়াই করছে তারা আইএস। তাই সেটা স্বীকার করেই লড়াই করতে হবে। ’

মনিরুল ইসলাম তাঁর উপস্থাপনায় বলেন, বাংলাদেশ সরকার সর্বদাই জঙ্গিবাদ নির্মূলের ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করে আসছে। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান হয়েছে দুটি ভাগে। প্রথমত, বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে উগ্রপন্থী অর্থাৎ বামপন্থীদের উত্থান এবং দ্বিতীয়ত, সমসাময়িককালে বিপথগামী ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের দ্বারা সৃষ্ট জঙ্গিবাদ। ২০১৩ সালে ব্লগার হত্যাসহ ২০১৬ সালে ‘হলি আর্টিজান’ হামলা ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের মাধ্যমে তৈরি জঙ্গিবাদের কাজ। জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশ পুলিশ ও নবগঠিত ‘কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম’ ইউনিট কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ও সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি এন বি কে ত্রিপুরা অনুষ্ঠানে সঞ্চালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

 


মন্তব্য