kalerkantho


সাভার চামড়া শিল্প নগরী

মালিকদের শত অভিযোগ কর্তৃপক্ষ বলছে সব হবে

তায়েফুর রহমান, সাভার   

১৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



মালিকদের শত অভিযোগ কর্তৃপক্ষ বলছে সব হবে

বরাদ্দ নেওয়া প্রায় অর্ধশত প্লটে কারখানার অবকাঠামো নির্মাণকাজ এগিয়ে চলছে। বেশ কিছু প্লটে নামমাত্র কাজ শুরু হয়েছে।

ট্যানারি কারখানাগুলোর তরল বর্জ্য পরিশোধনের জন্য সদ্য চালু হওয়া কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারের (সিইটিপি) আংশিক চালু হয়েছে। তবে কঠিন (সলিড) বর্জ্য শোধনের জন্য বাস্তবে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। চামড়া শিল্প নগরীর এক কোণে কঠিন বর্জ্য ফেলে রাখা হয়েছে, যা পাশের জনবসতির পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত করছে। সিইটিপির কার্যকারিতা নিয়েও এলাকাবাসীর অভিযোগের অন্ত নেই। পরিবেশ দূষণের অভিযোগে এলাকায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশও করেছে স্থানীয়রা। হয়েছে গণশুনানিও। গতকাল রবিবার সাভারে ‘চামড়া শিল্প নগরী-ঢাকা’ প্রকল্প ঘুরে জানা গেল এসব কথা। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) বাস্তবায়ন করছে এ প্রকল্প।

মেসার্স ইকবাল ব্রাদার্স ট্যানারির প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন কালের কণ্ঠকে জানান, গত ডিসেম্বরে সাভার চামড়া শিল্প নগরীতে তাঁদের প্রতিষ্ঠান স্থানান্তর করে  উৎপাদন শুরু করেছেন।

এখনো গ্যাস সংযোগ পাননি।

অন্য মালিকরা কেন সাভারে আসছেন না জানতে চাইলে ইকবাল হোসেন বলেন, ‘একটি অভিন্ন সমস্যা রয়েছে। তা হলো—সাভার চামড়া শিল্প নগরীতে প্লট নেওয়ার পর ১০ বছর ধরে তাঁরা কিস্তির টাকা পরিশোধ করছেন। কিন্তু এখনো নিজেদের প্লটের রেজিস্ট্রেশন বুঝে পাননি। ফলে কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারছেন না। তাঁরা কারখানা স্থানান্তরের ক্ষতিপূরণ বাবদ ৬০ ভাগ টাকা পেয়েছেন। এখনো বাকি টাকা পাননি। এ বিষয়ে তিনি বিসিকের কাছেও আরো সহযোগিতা চান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকটি চামড়া শিল্প কারখানার মালিক অভিযোগ করেন, অনেক ট্যানারি আছে, যারা আড়াই থেকে তিন লাখ স্কয়ার ফুট আকৃতির প্লট নিয়ে নামমাত্র অবকাঠামো তৈরি করে স্বল্প আয়তনে উৎপাদন প্রক্রিয়া চালু করেছে। তারা অনেক জায়গা বরাদ্দ নিয়ে জমি ফেলে রেখেছে। অথচ স্বল্প আয়তনের একজন প্লটের মালিক কারখানা স্থানান্তর না করায়ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা দিচ্ছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেকজন ট্যানারি মালিক বলেন, সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে এখনো সিইটিপি তৈরি হয়নি। ড্রেনেজ ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। হাজারীবাগে যেখানে বড় বড় ড্রেনেই পানি উপচে পড়ে সেখানে সাভারে ১৮ ইঞ্চি পাইপ দিয়ে ড্রেনেজ চালু করা হয়েছে। ইতিমধ্যে যে কটি ট্যানারি ওয়েট ব্লুর কাজ শুরু করেছে, তাতেই ওভার ফ্লো হচ্ছে। সেই পানি ধলেশ্বরীতে পড়ে মাছ মারা যাচ্ছে। সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট ইয়ার্ডের কাজও শুরু হয়নি। সেখানে সলিড বর্জ্যে এলাকার পরিবেশদূষণ হচ্ছে। ক্রোম ট্রিটমেন্ট প্লান্টের কাজ এগিয়েছে মোটে ৬০ ভাগ। ফলে স্থানটি পুরোপুরি স্থানান্তরের জন্য প্রস্তুত নয়। এ অবস্থায় পুরো ট্যানারি স্থানান্তর হলে হিতে বিপরীতই হবে।

প্রসঙ্গত, ২০০১ সালে হাইকোর্টের নির্দেশের পর রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে চামড়া কারখানাগুলো সরানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। সেই লক্ষ্যে সাভারের হেমায়েতপুরের হরিণধরা এলাকায় ১৯৯ দশমিক ৪০ একর জমির ওপর পরিবেশবান্ধব চামড়া শিল্প নগরী নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

জানা যায়, রাজধানীর পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে সরকার ‘চামড়া শিল্প নগরী-ঢাকা’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের লক্ষ্যে প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৭৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা। ২০০৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৭ সালের জুন মেয়াদে এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় বিসিক ইতিমধ্যে ২০০ একর জমি অধিগ্রহণ করে তা চামড়া শিল্প সংশ্লিষ্ট দুটি উদ্যোক্তা সমিতির (বিটিএ এবং বিএফএলএলএফইএ) সদস্যভুক্ত ১৫৫টি ট্যানারি শিল্প প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ দিয়েছে।

তবে শিল্প মালিকদের ক্ষতিপূরণ প্রদান ও শিল্পপার্ক গড়ে তুলে নতুন কারখানা স্থাপনে ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত না হওয়ায় কারখানা স্থানান্তর করছিলেন না ট্যানারি মালিকরা। শেষ পর্যন্ত সরকার তাদের দাবি মেনে ক্ষতিপূরণের ২৫০ কোটি টাকা দেয় এবং সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিট করার আশ্বাস দেয়। এর পরই সাভারে কারখানা স্থাপন শুরু করেন ট্যানারি মালিকরা।

চামড়া শিল্প নগরী প্রকল্পের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোস্তফা মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, নির্মাণাধীন কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারের সিভিল কাজ এখনো চলমান রয়েছে। তরল বর্জ্য পরিশোধনকাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। তবে কার্যকারিতা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে সমালোচনা রয়েছে। নির্মাণাধীন চারটি মডিউলের কাজ প্রায় শেষ। ইতিমধ্যে ৪৫টি ট্যানারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন শুরু করেছে। শিগগির আরো ২০-২৫টি ট্যানারি উৎপাদনে যাবে। উৎপাদনে যাওয়া ট্যানারিগুলোতে বিদ্যুতের স্থায়ী সংযোগ দেওয়া হয়েছে। যারা কারখানায় স্থায়ী বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য বিদ্যুৎ সমিতি বরাবর আবেদন করেছে তাদের অনুকূলে বিদ্যুৎ সমিতি ডিমান্ড নোট ইস্যু করেছে।

সাভার চামড়া শিল্প নগরীর পরিবেশ সম্পর্কে মুহাম্মদ মোস্তফা মজুমদার বলেন, ‘উৎপাদন চলাকালে এখানকার পরিবেশ কিন্তু ভালো। এখন ট্যানারি মালিকরা কেন আসছেন না তার উত্তর আমাদের কাছে নেই। হাজারীবাগ থেকে তাঁদের সাভার চামড়া শিল্প নগরীতে আনার জন্য আমাদের পক্ষ থেকে কোনো কিছু করার বাকি আছে বলে মনে করি না। যেহেতু ওনাদের আসতেই হবে, চলে আসাই ভালো। আমরা এখন রেডি। ’

চালু কারখানাগুলো সম্পর্কে প্রকল্পের এই অতিরিক্ত ব্যবস্থাপক বলেন, বর্তমানে চালু ৪৫টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কিছু কিছু মাঝে-মধ্যে বন্ধ থাকে। কারণ, হাজারীবাগেও তাদের কারখানা আছে। প্যারালাল দুই জায়গায় কারখানা চালু রাখলে সমস্যা হতেই পারে। গ্যাস সংযোগের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘গ্যাস অফিস ও ট্যানারি মালিকরাই এ ব্যাপারে ভালো বলতে পারবেন। মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান গ্যাসের জন্য আবেদন করেছে। সংযোগ প্রদানের জন্য রাস্তা কাটা হয়েছে। তবে এখনো গ্যাস সংযোগ পায়নি। আর সিইটিপি বিষয়টি আমাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। চামড়া শিল্প নগরীর মালিকরা বর্জ্যটা কী করবেন সেটা সরকারের ব্যাপার। সেটা মালিকদের বিষয় না। অনেক কাজ বাকি রয়েছে, স্টেপ বাই স্টেপ আগাচ্ছে। সমস্যা যদি কোথাও থেকে থাকে তাহলে সেটা সম্মিলিতভাবে সমাধান করতে হবে। আমরা চাচ্ছি সিইটিপি চলুক। একদিন বসে থাকা মানে জাতীয় লস। ’

 


মন্তব্য