kalerkantho


গোলমেলে ব্যাটিংয়ে বিসর্জনে ড্রয়ের স্বপ্ন

১২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



গোলমেলে ব্যাটিংয়ে বিসর্জনে ড্রয়ের স্বপ্ন

আউট সাকিব আল হাসানও, উচ্ছ্বাস রঙ্গনা হেরাথের। শ্রীলঙ্কান এই স্পিনারের মারাত্মক বোলিংয়েই ম্যাচ বাঁচানোর সম্ভাবনা বিলীন বাংলাদেশের। ছবি : ক্রিকইনফো

গল ইন্টারন্যাশনাল স্টেডিয়ামের ফটক বরাবর রাস্তার মাঝখানের ক্লক টাওয়ারের ঘড়িটা সুনামির সাক্ষী হয়ে থেকেছে দীর্ঘদিন। ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বরের সুনামি ঠিক যে সময়ে আঘাত হেনেছিল, সেই সকাল ৯টা বেজে ৫ মিনিটেই স্থির হয়ে ছিল ঘড়িটা। সারাইয়ের পর বহুদিন হয় ঘড়িটাও সময় দিচ্ছে ঠিকঠাক। কিন্তু ২০১৩ সালের সফরে ঠিকঠাক থাকা বাংলাদেশের ব্যাটিংটাই কেবল বিগড়ে গেল এবার। বলা যায়, গল এবার সাক্ষী হয়ে থাকল আরেক সুনামির; যে সুনামিটা সফরকারী দলের ব্যাটসম্যানদের সেধে আনাই!

তা নয়তো কী! একেই পঞ্চম দিনের উইকেট থেকে শ্রীলঙ্কান স্পিনারদের বাড়তি টার্ন পাওয়ার প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির সংযোগ ঘটেনি। তার ওপর উইকেট আগের চার দিনের মতোই ব্যাটিং উপযোগী ছিল। দুয়ে মিলে উইকেটে সারা দিন পার করে দিয়ে ম্যাচ বাঁচানোর চেষ্টায় উদ্যোগী হলে সুফল মিলতেও পারত। কিন্তু সেই উদ্যোগের জায়গায় দিনের প্রথম বল থেকেই দেখা গেল আউট হওয়ার চেষ্টা; যে চেষ্টা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সফলও।

সুবাদে আগের দিনের বৃষ্টির ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ১৫ মিনিট আগে শুরু হওয়া খেলা ঘণ্টাখানেক পেরোতে না পেরোতেই একরকম শেষ। বাংলাদেশের একের পর এক উইকেট পড়ার সুনামিতে মধ্যাহ্ন ভোজের আগেই ম্যাচ-ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়। ৪৫৭ রান তাড়ায় বিনা উইকেটে ৬৭ রান নিয়ে শুরু করা বাংলাদেশের তাই ১৩ ওভারে আর মাত্র ৩৭ রান যোগ করতেই নেই ৫ উইকেট।

ব্যাটিং মেরুদণ্ড ভেঙে যাওয়ার পর ম্যাচ বাঁচানোর আশার সমাধি। সেই থেকে কেবল অপেক্ষা ম্যাচটি শেষ হওয়ার এবং বাংলাদেশের হারের ব্যবধান জানার। সেটি জানা গেল মধ্যাহ্ন ভোজের বিরতির ৫০ মিনিট পর। সারা দিন ব্যাটিং করে ম্যাচ বাঁচানোর জায়গায় তিন ঘণ্টা পাঁচ মিনিটে লেখা হলো ২৫৯ রানের বিশাল হারই।

১৫ মার্চ থেকে কলম্বোর পি সারা ওভালে শুরু হতে যাওয়া বাংলাদেশের শততম টেস্টের আগে এমন হতাশার হারের পাণ্ডুলিপি লেখার শুরু সৌম্য সরকারকে দিয়েই। ফিফটি করে ফেলা এই ওপেনারকে আগের দিন বিকেলেই নড়বড়ে দেখাচ্ছিল অনিয়মিত বোলার আসেলা গুনারত্নের বিপক্ষে। তাঁর করা ১৬তম ওভারের সেই প্রথম বলটি ছিল নো। এ কারণেই সকালে তাঁকে দিয়ে শুরু করাতে হয় রঙ্গনা হেরাথকে। গুনারত্নে আসলে কোন ধরনের বোলার, তা বোঝাতে কাল ম্যাচের পরও লঙ্কান অধিনায়ককে বলতে শোনা গেছে, ‘ও আসলে স্পিনার ও পেসারের মাঝামাঝি কিছু একটা। ’ তা এই ‘মিশ্র’ বোলারের করা পঞ্চম দিনের প্রথম বলেই শর্ট লেগে ক্যাচের মতো তুলে দিয়ে বেঁচে যান সৌম্য।

বাঁচেননি পরের বলে, গুনারত্নের অফব্রেক খেলবেন কি খেলবেন না করতে করতেই ব্যাট চালান এই বাঁহাতি। কিন্তু বল তাঁর ব্যাট ফাঁকি দিয়ে পেছনে যাওয়ার সময় বেলসও ফেলে দিয়ে যায়। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো সৌম্য (৫৩) সেটি টের তো পানইনি, উল্টো আম্পায়ার কট বিহাইন্ড দিয়েছেন ভেবে ‘রিভিউ’ও নিয়ে নেন! এরপর মমিনুল হকও (৫) আরেক অফস্পিনার দিলরুয়ান পেরেরার শিকার। তা-ও আবার মিডল স্টাম্পের ওপর সোজা ডেলিভারিতে শট খেলার দোটানাতেই এলবিডাব্লিউয়ের ফাঁদে পড়েছেন তিনি। একই বোলারের অফস্টাম্প বরাবর সামান্য টার্ন করা বলে তামিম ইকবালের (১৯) ব্যাটের কানা নিয়ে যাওয়া বল স্লিপ ফিল্ডারের হাতে জমতেই বিপর্যয় আরো ঘনীভূত বাংলাদেশের; যেটি আরো গভীর থেকে গভীরতর সাকিব আল হাসানের (৮) বিদায়ে। হেরাথের টার্ন করা বল সামনে বেড়ে কবজির মোচড়ে ঘোরাতে গেলেও বল তাঁর গ্লাভস ছুঁয়ে জমা পড়ে লেগ স্লিপের ফিল্ডারের হাতে। ১ বল পরই নিজেকে হারিয়ে খুঁজতে থাকা টেস্টের মাহমুদ উল্লাহ (০) বড্ড আলসেমিতে হেরাথের সোজা বল ডিফেন্স করতে গিয়ে হন এলবিডাব্লিউ। ব্যস, বিনা উইকেটে ৬৭ থেকে ৫ উইকেটে ১০৪ রান! 

সেখান থেকে লিটন কুমার দাশকে নিয়ে ৫৪ রানের পার্টনারশিপে মধ্যাহ্ন ভোজের বিরতি পর্যন্ত গেলেন মুশফিকুর রহিম। এবং বিরতির পর দ্বিতীয় বলে গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসালেন অধিনায়কও। চায়নাম্যান লাকশান সান্দাকানের লেগ স্টাম্পের ফুটখানেক বাইরের বল চালাতে গিয়ে উইকেট দিয়ে এলেন মুশফিকও (৩৪)। এরপর বাজে শটে উইকেট বিলানো লিটন (৩৫) হয়ে গেলেন হেরাথের অনন্য এক মাইলফলক পেরোনো শিকার। নিউজিল্যান্ডের ড্যানিয়েল ভেট্টোরিকে (২৬২) পেরিয়ে ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বোচ্চ উইকেটধারী বাঁহাতি স্পিনার যে এখন হেরাথই। তাঁর সার্বিক বোলিং পারফরম্যান্সও এই উপলক্ষকে স্মরণীয় করে রাখার মতোই। ৫৯ রানে ৬ শিকার, এ নিয়ে ২৯তম বারের মতো ইনিংসে পাঁচ বা ততোধিক উইকেট নিলেন লঙ্কান অধিনায়ক।

যাঁর কারণে তুলনায় অনেক কম টেস্ট খেলেছেন হেরাথ, সেই মুত্তিয়া মুরালিধরনের ৮০০তম টেস্ট উইকেটের সাক্ষীও এই গল স্টেডিয়াম। প্রাকৃতিক বিপর্যয় আর ক্রিকেটীয় অনেক কীর্তিধন্য এ স্টেডিয়াম এবার সাক্ষী হলো বাংলাদেশের ব্যাটিং গোলমালেরও!


মন্তব্য