kalerkantho


মো. ফজলুল হক ভূঁইয়া

মাইন ফাটিয়ে সাতটি জাহাজ ধ্বংস করেছি

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া   

১২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



মাইন ফাটিয়ে সাতটি জাহাজ ধ্বংস করেছি

‘নৌবাহিনীতে নিয়োজিত ছিলাম। দেশের কথা চিন্তা করে, পরিবারের কথা ভেবে এক মাসের ছুটি নিয়ে বাড়িতে আসি। ৩ মার্চ থেকে ছুটি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার কোড্ডা গ্রামের বাড়িতে সময় কাটাতে থাকি। ২৫ মার্চ রাতে পাক হানাদার বাহিনীর হামলার খবর শুনে আর বসে থাকতে পারিনি। ২৬ মার্চ দলবল নিয়ে আখাউড়ায় ইপিআর ক্যাম্প দখল করি। এরপর অংশ নিয়েছি একাধিক সম্মুখযুদ্ধে। প্রশিক্ষণ নিয়ে নাম লেখাই সুইসাইডাল স্কোয়াডে। মাইন ফাটিয়ে হানাদার বাহিনীর  সাতটি জাহাজ ধ্বংসের অভিযানে ছিলাম। ’

স্বাধীনতার মাসে কালের কণ্ঠ’র নিয়মিত আয়োজন ‘যুদ্ধদিনের অম্লান স্মৃতি’ কলামের জন্য কথা বলতে মুক্তিযোদ্ধা মো. ফজলুল হক ভূঁইয়ার কাছে গিয়েছিলাম শুক্রবার সকালে। সাক্ষাৎকারের জন্য সময় চেয়ে রেখেছিলাম। বাড়িতে ঢোকার সময় ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে এলো একটি কুকুর।

কুকুরের ডাক শুনে তাঁর স্বজনরা এগিয়ে এলেন। সহকর্মী মামুন ও আমাকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেলেন তাঁরা। ফজলুল হক বললেন, কুকুরটি তাঁর রক্ষাকবচ। ‘শত্রুপক্ষ’ একাধিকবার হানা দিয়েও এর কারণে কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। মাদক ব্যবসায় বাধা দিয়ে তিনি অনেকের চক্ষুশূল। তাঁর বাড়িতে চুরির চেষ্টাও হয়েছে অনেকবার।

মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল হক ভূঁইয়া আখাউড়া পৌরসভার বড়বাজার এলাকায় থাকেন। জায়গাটি সরকারের। যে ঘরটিতে তিনি থাকেন সেটি খুবই সাধারণ, মাথা নুইয়ে ভেতরে ঢুকতে হয়। ঘরের ভেতর দুটি চৌকি, কিছু থালাবাসন ও আসবাব। জীবনের সম্বল বলতে এসবই। ঠেলাগাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। বয়স হয়েছে, এখন আর রোজগারের জন্য বের হন না। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকার থেকে যে ভাতা পান তা দিয়েই চলে তাঁর সংসার। তিনি দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জনক। তাঁর বাবার নাম একিন আলী।

কুশল বিনিময়ের পর আলাপচারিতা শুরু হয়। প্রথমেই তিনি ইপিআর ক্যাম্পে হামলার ঘটনার বিবরণ দেন। তিনি বলেন, ‘২৫ মার্চ রাতে কোড্ডার বাড়িতে ছিলাম। খবর শুনতে পাই, পাক হানাদার বাহিনী ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় হামলা করেছে। খবর শুনে আর বাড়িতে বসে থাকতে পারিনি। ২৬ মার্চ সকালেই আখাউড়ায় ছুটে যাই। হাবিলদার মন্তাজসহ জিআরপি সদস্য ও এলাকার লোকজন মিলে আমরা ৫০-৬০ জন ইপিআর ক্যাম্পে হামলা করি। ক্যাম্পে ৩০ জন পাকিস্তানি সৈন্য ছিল। সারা দিন যুদ্ধ হয়। গভীর রাতে তাদের পক্ষ থেকে গুলিবর্ষণ হচ্ছে না দেখে আমি ক্যাম্পের কাছে যাই। ভেতরে কেউ নেই—চিৎকার করে জানাই। আমাদের লোকজন ক্যাম্প দখলে নেয়। তখন রাত প্রায় ৩টা। ওই যুদ্ধে শ্যামনগর এলাকার জিতু দাসের স্ত্রী মারা যায়। ’

‘এপ্রিল মাসের ৭ বা ৮ তারিখে আখাউড়ার এ এম মো. ইসহাক (পরে বীরপ্রতীক খেতাবে ভূষিত) আমাকে ডেকে পাঠান। তিনি আমাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ক্যাপ্টেন আইনুদ্দিনের কাছে যেতে বলেন। নৌবাহিনীতে চাকরি করতাম জেনে আমাকে ৩০ জনের একটি প্লাটুনের কমান্ডার বানিয়ে দেওয়া হয়। হবিগঞ্জের চুনারুঘাট হয়ে আমরা ভারতের ত্রিপুরার সিমনা ক্যাম্পে গিয়ে উঠি। মেজর মো. শফিউল্লাহ সেখানে সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর অধীনে আমরা বেশ কিছুদিন ট্রেনিং নিই। ট্রেনিং চলাকালে আমাদের কয়েকজনকে বাছাই করে হবিগঞ্জের সাতছড়ি এলাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এপ্রিলের শেষ দিকে সেখানে ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়। টানা ১৬ দিন আমরা যুদ্ধ করি। আমরা চার প্লাটুন যোদ্ধা—অস্ত্র ছিল রাইফেল ও এলএমজি। কম লোকবল আর সাধারণ অস্ত্র দিয়ে পাকবাহিনীর সঙ্গে আমরা পেরে উঠতে পারিনি। তাদের শেলে অনেকে শহীদ হন। একপর্যায়ে আমরা সেখান থেকে সরে যেতে বাধ্য হই। আবার আমরা ভারতে চলে যাই। ’

ফজলুল হক বলেন, ‘থেমে থেমে যুদ্ধ হতো। খেয়ে না-খেয়ে যুদ্ধ করেছি। ভারত থেকে যেসব খাবার আসত সময় পেলে তা খেতাম। খাওয়ার কথা মাথায় আসত না। শুধু ভাবতাম, দেশ স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধ করছি। দেশকে মুক্ত করতে হবে। ’

‘সাতছড়ি থেকে ভারতে ফিরে গেলে ট্রেনিং ক্যাম্পে মেজর শফিউল্লাহ জানতে চান, নৌবাহিনীর লোক কে কে আছে। আব্দুল খালেক, আরজ আলী ও আমি হাত উঠাই। আমাদের আলাদা করে বিএসএফ ক্যাম্পে পাঠানো হয়, সেখান থেকে মুর্শিদাবাদে। প্রায় তিন মাস সেখানে আমাদের ট্রেনিং দেওয়া হয়। ট্রেনিং দিতেন ভারতের জি এস মার্টিস। ট্র্রনিংয়ে থাকার সময় আমার ও আরো অনেকের নাম লেখানো হয় সুইসাইডাল স্কোয়াডে। নৌবন্দর ধ্বংস করতে খুলনা, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জের জন্য চারটি টিম তৈরি করা হয়। আমাকে রাখা হয় ৩০ সদস্যের নারায়ণগঞ্জের টিমে। আব্দুর রহমান ছিলেন টিমের কমান্ডার। আব্দুস সোবাহানকে আমাদের গাইড হিসেবে দেওয়া হয়। আগস্টের ১ তারিখে আমাদের মুর্শিদাবাদ থেকে বিদায় দেওয়া হয়। আব্দুস সোবাহান আমাদের নিয়ে যান নারায়ণগঞ্জের উত্তর মোদ্দার মাসুম ঠিকাদারের বাড়িতে। ওই বাড়িতে তিন-চার দিন থেকে আমরা রেকি করি। কোথায় কোথায় জাহাজ আছে নিশ্চিত হই। ’

“১৪ আগস্ট রাতে আমাদের চারটি পোর্ট দখলের নির্দেশ দেওয়া হয়। ওয়াকিটকিতে যখন ‘আমার পুতুল আজ যাবে শ্বশুরবাড়ি’ গানটি বেজে উঠবে তখনই হামলা করতে হবে বলে নির্দেশ দেওয়া হয়। অভিযানে অংশ নিতে আমরা শরীরে গামছা দিয়ে লিমপেট মাইন বেঁধে নিই। লিমপেট মাইনের ক্যাপ খুলে দিলে ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে বিস্ফোরণ হয়। আমাদের সঙ্গে ছিল কাফনের কাপড়; সহযোদ্ধা কেউ অভিযানে শহীদ হলে তাঁকে যাতে দাফন করা যায়। সাঁতরে জাহাজের কাছে গিয়ে মাইন ফিট করে রেখে আসতাম আমরা। ”

অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন জ্যাকপট’, তিনি জানান। ‘আমরা সাতটি জাহাজ উড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলাম। এ অভিযানে যাওয়া ৩০ জনের মধ্যে মাত্র ৯ জন ফিরে আসতে পেরেছি। সময়মতো ফিরে না আসতে পারায় বিস্ফোরণে বা পাকবাহিনীর হামলায় অন্যরা শহীদ হন। পরে ৯ জনের পাঁচজন জামালপুর ফেরিঘাটে একই কায়দায় অভিযান চালাই। সেখানে দুজন শহীদ হন। ’

মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল হক বলেন, ‘জাহাজ দিয়ে পাকবাহিনী মালামাল আনত। আমাদের জাহাজ ধ্বংসের অভিযানের কারণে পাকবাহিনীর ভিত নড়বড়ে হয়ে যায়। তারা বেশ ঘাবড়ে যায়। বিশ্বজুড়ে মুক্তিবাহিনীর বীরত্বের কথা ছড়িয়ে পড়ে। অভিযান শেষ করে আমরা আবার ভারতে ফিরে যাই। আমাদের ফুলের মালা দিয়ে বরণ করা হয়। তখন অনেক আনন্দ পেয়েছি। অভিযানের গুরুত্বের বিষয়টি আমরা বুঝতে পারি। ভারতে গিয়ে আমরা বিজনা ক্যাম্পে উঠি। এরই মধ্যে হোসেনপুর এলাকায় এসে একটি ব্রিজ ধ্বংস করি। একসময় খবর পাই, দেশ স্বাধীন হয়েছে। আমরা উল্লাসে ফেটে পড়ি। ’

‘দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সবাই অস্ত্র জমা দিতে শুরু করে। কিন্তু আমার কাছে থাকা একটি লিমপেট মাইন নিয়ে সমস্যায় পড়ি। কেউ এটি জমা রাখতে চাইছিল না। বেশ কয়েকজনের পরামর্শে আমি মাইন নিয়ে কুমিল্লায় চলে যাই। সেখানে গিয়ে মেজর জিয়ার কাছে মাইনটি জমা দিতে চাই। তিনি জানতে চান, এটি কী! এটি লিমপেট মাইন জানালে তিনি বলেন, এটা তিনি চেনেন না। পরে আমাকে দিয়েই এক জায়গায় মাইনটি রেখে দেওয়া হয়। ’


মন্তব্য