kalerkantho


আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় প্রস্তাবও গৃহীত

২৫ মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’ ঘোষণা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



২৫ মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’ ঘোষণা

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যার একটি দৃশ্য। ছবি : সংগৃহীত

জাতীয় সংসদের অধিবেশনকক্ষে পিনপতন নীরবতা। কক্ষের বড় পর্দায় একের পর এক ভেসে উঠছে একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার ছবি।

পানিতে ভাসছে অসংখ্য নারী-পুরুষের লাশ। আবেগাপ্লুত বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে চোখ মুছতে দেখা গেল। অধিবেশনকক্ষের ভারী বাতাস কাতর করে তুলেছে সবাকেই। অনেকেই বারবার চোখ মুছছেন, আবার বর্বরতার চিত্র দেখছেন, আবার কাঁদছেন। মাত্র ১৮ মিনিটের এই প্রামাণ্যচিত্রে সংসদ ভবনে এক শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

এটা ছিল গতকাল শনিবার বিকেলে জাতীয় সংসদ অধিবেশনের চিত্র। অধিবেশনে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা নিয়ে সাধারণ আলোচনার আগে একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম বর্বতার ‘সচিত্র প্রতিবেদন’ দেখানো হয়। ১৪৭ বিধিতে জাসদের সংসদ সদস্য শিরীন আখতার পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মমতায় নিহতদের স্মরণে প্রতিবছর ২৫ মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’ পালনের প্রস্তাব উত্থাপন করার পর একাত্তরের ওই ভয়াল চিত্র সংসদে উপস্থাপনের জন্য স্পিকারের অনুমতি চান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ২৫ মার্চই শুধু নয়, এর পথ ধরেই দেশে যে গণহত্যা শুরু হয়েছিল...অনেক সংসদ সদস্য আছেন এখানে যাঁরা যুবক, একাত্তরের সেই ভয়াল চিত্র তাঁরা দেখেননি।

এখানে আলোচনা হবে। মাননীয় স্পিকার, আপনার অনুমতি নিয়ে আমি ওই সময়কার কিছু ছবি-ভিডিও দেখাতে চাই, যেগুলো ওই সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছিল। এরপর সংসদ কক্ষে রাখা বড় পর্দায় একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মমতার বিভিন্ন চিত্র, ভিডিও দেখানো হয়।

এরপর দীর্ঘ আলোচনা শেষে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যার দিনটি জাতীয়ভাবে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের প্রস্তাব পাস হয়। একই সঙ্গে এই দিবসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করার প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রস্তাবটির ওপর দীর্ঘ চার ঘণ্টার সাধারণ আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ প্রায় অর্ধশত সংসদ সদস্য অংশ নেন। তবে শিরীন আখতারের প্রস্তাবের ওপর সামান্য সংশোধনী আনেন সরকারদলীয় চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ। সংশোধনীতে তিনি বলেন, ‘মূল প্রস্তাবের দ্বিতীয় পঙিক্ততে অবস্থিত আন্তর্জাতিকভাবে শব্দটির পূর্বে জাতিসংঘসহ শব্দটি সন্নিবেশ করা হউক। ’ আলোচনায় ১ ডিসেম্বরকে মুক্তিযোদ্ধা দিবস ঘোষণা এবং সিমলা চুক্তি অনুযায়ী আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে পাকিস্তানি ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবিও জানানো হয়।

প্রমাণ্যচিত্রে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ, ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা, বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার, ভয়াল গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড, ২৫ মার্চ গণহত্যা নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন রিপোর্ট, গণহত্যা নিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের বক্তব্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল ও ইপিআরে গণহত্যার চিত্র স্থান পায়।

বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাটা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দিয়েছেন। এটা নিয়ে কেন বারবার বিতর্ক হবে। ’

সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার জীবনের বড় দুঃখ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারিনি। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস পালন করে যেতে পারিনি। ’ আলোচনায় অংশ নিয়ে শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, ২৫ মার্চ কালরাতেই পাকিস্তানি বাহিনী প্রায় এক লাখ বাঙালির ওপর গুলি চালায় বলে ওই সময় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এখানেই শেষ নয়, পরাজিত অপশক্তি পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিয়েছে। খালেদা জিয়া মনেপ্রাণে পাকিস্তানি, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের তিনি অবমাননা করেছেন। এখনো উনি দেশের স্বাধীনতা মেনে নিতে পারেননি। শেখ হাসিনা সাহসের সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছেন। সিমলা চুক্তি অনুযায়ী তিনি আন্তর্জাতিক আদালতে ১৯৫ পাকিস্তানি সেনা যুদ্ধাপরাধীরও বিচারের দাবি জানান।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, খালেদা জিয়ার দল বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী একাধিকবার ক্ষমতায় এসেছে। তারা সংসদকে কলুষিত করেছে। খালেদা জিয়া ও অপশক্তিকে চিরতরে অপসারণ করতে হবে।

জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, বাঙালিদের জীবনে দুটি কালরাত এসেছে। একটি ২৫ মার্চ গণহত্যা, অন্যটি ১৫ আগস্ট জাতির জনকের হত্যাকাণ্ড। ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদাররা নির্বিচারে গণহত্যা চালায়। এক রাতেই লাখো বাঙালিকে তারা হত্যা করে। সারা দেশকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে চেয়েছিল। স্বাধীনতার জন্য ৩০ লাখ মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে। তাই ২৫ মার্চ জাতীয়ভাবে গণহত্যা দিবস হিসেবে ঘোষণার পাশাপাশি ওই দিনে সরকারি ছুটির দাবি জানান তিনি।

ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর প্রস্তাব তুলে ধরে বলেন, ‘এরই মধ্যে জাতিসংঘ ২০১৫ সালের ৯ ডিসেম্বরকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আমরা ২৫ মার্চকে গণহত্যা স্মরণ দিবস হিসেবে পালন করতে পারি। ’

সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, ‘বাংলাদেশে গণহত্যা বিংশ শতাব্দীর পাঁচটি গণহত্যার মধ্যে অন্যতম। ২৫ মার্চ জাতীয় গণহত্যা দিবস পালনের মাধ্যমে আমরা মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করব। ’

নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, ‘আন্তর্জাতিকভাবে এই গণহত্যা দিবসের স্বীকৃতি পাব বলে আমরা আশা করি। পাকিস্তানিরা এখনো আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। পাকিস্তানের কাছে আমাদের পাওনা ৩৫ হাজার কোটি টাকা আদায়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। ’

জাসদের মইন উদ্দীন খান বাদল বলেন, সারা বিশ্বকে জানাতে হবে এত দাম দিয়ে কোনো জাতি স্বাধীনতা কেনেনি। তাই পাকিস্তানিদের দোসরদের বিষয়ে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জেনারেল জিয়া ২৬ মার্চ পাকিস্তানিদের পক্ষে সারা দিন বোয়ালখালীতে ছিলেন, আক্রান্ত সৈনিক বা মুক্তিযোদ্ধাদের বাঁচাতে একচুলও সাহায্য করেননি।

ওয়ার্কার্স পার্টির ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, পাকিস্তানের আইএসআইয়ের টাকায় এখনো দেশের ভেতরে অনেক ষড়যন্ত্র চলছে। স্বাধীনতার জন্য ৩০ লাখ মানুষ জীবন দিতে পারে—এই ইতিহাস পৃথিবীতে বিরল। এই ইতিহাস কেউ মুছে ফেলতে পারবে না।

আবদুল মান্নান বলেন, পাকিস্তান আগেও একটি বর্বর জাতি ছিল, এখনো আছে। প্রধানমন্ত্রী যে স্থির ও ভিডিও চিত্র দেখিয়েছেন তাতে পাকিস্তান বর্বর ছিল, তা আরো শক্তভাবে প্রমাণিত হলো। খালেদা জিয়া শহীদের সংখ্যা নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে প্রমাণ হয় তারা এখনো পাকিস্তানি প্রেতাত্মা হিসেবে এ দেশে টিকে থাকতে চায়।

১ ডিসেম্বর ‘মুক্তিযোদ্ধা দিবস’ পালনের প্রস্তাব : বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ১ ডিসেম্বরকে মুক্তিযোদ্ধা দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব করে বলেন, ‘আমাদের সশস্ত্র বাহিনী দিবস আছে, অনান্য দিবস আছে। ডিসেম্বর বিজয়ের মাস। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস পালন করি। তাই ১ ডিসেম্বরকে আমরা মুক্তিযোদ্ধা দিবস হিসেবে পালন করতে পারি কি না, এটা বিবেচনা করার জন্য জাতীয় সংসদে উত্থাপন করছি। প্রস্তাবটি সংশোধিত আকারে সংসদে গৃহীত হলে খুব সুন্দর হবে। ’ এ সময় তিনি সংশোধিত প্রস্তাব তুলে ধরেন।

সংশোধিত প্রস্তাবে বলা হয়, ‘যেহেতু একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এবং তাদের এ দেশীয় সহযোগীরা বাংলাদেশের ৩০ লাখ নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে, যা আমাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ৭৩-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী গণহত্যা এবং যেহেতু গণহত্যার শিকার বিভিন্ন দেশ গণহত্যায় নিহতদের স্মরণ ও শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি গণহত্যার বিরুদ্ধে গণসচেতনতা সৃষ্টির জন্য জাতীয় পর্যায়ে গণহত্যা দিবস পালন করে, সেহেতু আমরা ২৫ মার্চকে জাতীয় গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব করছি। ’ এরপর তিনি প্রস্তাবে উল্লেখ করেন, ‘যেহেতু বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে সংঘটিত গণহত্যায় নিহতদের স্মরণ ও শ্রদ্ধা জানানোর জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০১৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী ৯ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক গণহত্যা স্মরণ দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যেহেতু বাংলাদেশসহ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ১৯৩টি দেশ এই প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে অনুমোদন করেছে, যেহেতু জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো ২০১৫ সাল থেকে ৯ ডিসেম্বর দিবসটি যথাযথ

মর্যাদায় পালন করছে, সেহেতু বাংলাদেশে ৯ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক গণহত্যা স্মরণ দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব করছি। ’

শেষ হলো দশম সংসদের চতুর্দশ অধিবেশন : দশম জাতীয় সংসদের চতুর্দশ অধিবেশন গতকাল শেষ হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের অধিবেশন সমাপ্তি সম্পর্কিত ঘোষণা পাঠ করেন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। এর মধ্য দিয়ে অধিবেশনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।

এর আগে সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ সমাপনী ভাষণ দেন। সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে পাকিস্তানসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর অপপ্রচারের কঠোর সমালোচনা করেন।

সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী যা বললেন : সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে পাকিস্তানসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর অপপ্রচারের সমালোচনা করে বলেন, ‘যত অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রই হোক না কেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আরো উন্নত হচ্ছে। কোনো অপশক্তির কাছে আমরা মাথানত করব না। ’

জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের গঠনমূলক ভূমিকার প্রশংসা করে সংসদ নেতা বলেন, জাতীয় সংসদে একসময় থাকার কোনো পরিবেশ ছিল না। এখন যাঁরা বিরোধী দলে আছেন, তাঁদের বক্তব্যও গঠনমূলক। এ জন্য তাঁদের ধন্যবাদ জানাই।

সংবাদপত্রকর্মীদের জন্য নবম ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়নের দাবি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অধিকাংশ সংবাদপত্রের মালিকই বেসরকারি। বেসরকারি মালিকরা কী করবেন, সেটি তাঁদের বিষয়। এর পরও আমরা ওয়েজ বোর্ড করে দিচ্ছি। ব্যবস্থা নিচ্ছি। ’


মন্তব্য